পরিকল্পনার অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। পরিকল্পনার সুবিধা ও গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক কথা বলা হও এটি অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এ কথা বলা যায় না । পরিকল্পনা যথার্থ না হলে যেমনি কার্যক্ষেত্রে তা সমস্যার কারণ হয় তেমনি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকালেও নানান সমস্যা দেখা দেয়। পরিকল্পনার এরূপ সীমাবদ্ধতাসমূহ নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :
Table of Contents
পরিকল্পনার অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা

১. পটভূমি নির্ধারণে সমস্যা (Problems in premising) :
পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ বিষয়ক। কিন্তু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত । Terry ও Franklin-এর মতে, “No manager can predict completely and accurately the events of the future.”28 অর্থাৎ কোনো ব্যবস্থাপকই সম্পূর্ণ ও সঠিকভাবে ভবিষ্যত ঘটনা সম্পর্কে পূর্ব ধারণা করতে পারে না । তাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওপর পরিকল্পনা প্রণয়ন কষ্টসাধ্য।
এ কারণে পরিকল্পনা প্রণয়নে ভবিষ্যতে কর্মসূচিকে প্রভাবিত করতে পারে এমন সব তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ এবং তদনুযায়ী প্রয়োজনীয় পূর্ব প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু অনেক সময় পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রাপ্ত তথ্যাদি নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। না । সে কারণে সঠিক পটভূমি নির্ধারণ করাও কঠিন হয়। আর এরূপ পটভূমির ওপর ভিত্তি করে কোনে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলে তা কার্যক্ষেত্রে অধিক জটিলতার সৃষ্টি করে ।
২. সময়কাল নির্ধারণে সমস্যা (Problem in determining time period) :
প্রতিষ্ঠানে যে পরিকল্পন প্রণীত হয় তার কোন্টা কত সময়ের জন্য প্রণীত হবে তা নির্ধারণও একটা বড় সমস্যা। পরিকল্পনা যতো দীর্ঘ সময়ের জন্য হয় ততোই তা সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। আবার তা যতো স্বল্প সময়ের জন্য হয় ততোই বিশদ বর্ণিত হয় । দীর্ঘ সময়কে সামনে রেখে পরিকল্পনার পটভূমি তৈরি কষ্টসাধ্য ।
আবার স্বল্প সময়ের পরিকল্পনায় পূর্বানুমান অনেকটা সঠিক হয় । তাই প্রতিষ্ঠানের কোন্ পর্যায়ে কত সময়ের জন্য কী ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হবে তা নির্ধারণে পরিকল্পনাবিদরা সমস্যায় পড়েন। Dennison এ সম্পর্কে বলেন, “The problem is to determine how far an advance, and in what detail, it is profitable for each manager to plan. “অর্থাৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে যেয়ে কতটা অগ্রিম সময়ের জন্য এবং কতটা বিস্তৃতভাবে পরিকল্পনা নিলে তা ব্যবস্থাপনার জন্য লাভজনক হবে তা নির্ধারণে সমস্যা দেখা দেয়।
৩. সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ (Time consuming and costly) :
সাধারণত বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে ব্যবসায়িক জটিলতা ও কার্যকলাপের আধিক্যহেতু পরিকল্পনা প্রণয়নে অত্যধিক সময় বিনষ্ট হয়। এ ছাড়া তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ, বিকল্প নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সময় বেশি লাগে। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে আলাদা পরিকল্পনা বিভাগ পরিচালনা করা হয়। এতে পরিকল্পনা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে থাকে। অনেক সময় অর্জিত ফলাফল অপেক্ষা পরিকল্পনার খরচ বেশি হয়। আর এরূপ হলে সেই পরিকল্পনা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অর্জনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না । যা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতির কারণ হয়।
৪. মানসিক সমস্যা (Mental hazard) :
সংগঠনের কর্মীরা সহজাতভাবে প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, রীতি- নীতিতে বিশ্বাসী । তাদের অনেকে ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমানকেই উত্তম বলে মনে করে। তাই নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে এরূপ জনশক্তির মধ্যে নিরুৎসাহের ভাব লক্ষ করা যায়। পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যে মনস্তাত্ত্বিক বাধা রয়েছে Terry ও Franklin এ সম্পর্কে বলেন, “A prevalent barrier is that people have more regard for the present than for the future. ” অর্থাৎ (পরিকল্পনার) একটি শক্তিশালী বাধা হলো জনশক্তি ভবিষ্যৎ থেকে বর্তমানকেই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান মনে করে । ফলে ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তন লক্ষ করলে তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগে । যা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ।
৫. উদ্যোগ গ্রহণে বাধাদান (Obstacle to initiative) :
পরিকল্পনাকে সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকেই মন্তব্য করেন যে, পরিকল্পনা ব্যক্তির প্রতিভা বিকাশের অন্তরায়স্বরূপ এবং এটি ব্যক্তিকে স্বাধীনভাবে নিজস্ব মননশীলতায় ও ব্যক্তিগত চিন্তার পরিসরে কাজ করতে দেয় না । ফলে তা কর্মীকে উদ্যমহীন করে তুলতে পারে। প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতনদের কর্তৃক এর সকল পর্যায়ের জন্য বিশদ পরিকল্পনা তৈরি করে দেয়া হলে তা অধস্তন নির্বাহীদের নিজস্ব চিন্তাধারার বিকাশে আরো প্রতিবন্ধক হয়ে পড়ে । ফলে অধস্তনদের মনোবলে ও দক্ষতায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে ।
৬. দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা (Obstacle to quick decision) :
যেখানে ঘটনা দ্রুত পরিবর্তনশীল সে সব ক্ষেত্রে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা কার্যকরি করা অত্যন্ত দুরূহ হয়। অনেক সময় দেখা যায় প্রণীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাঝপথেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ফলে ঐ পরিকল্পনা নিয়ে আর এগুনো যায় না। পরিকল্পনার এরূপ সমস্যা সম্পর্কে Bartol ও Martin বলেন, “One barrier is rapidly changing environment, whick makes planning more difficult because plans must be altered frequently. -31 আর সেক্ষেত্রে পরিকল্পনার চেয়ে “অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা” নেয়াই অধিক লাভজনক বিবেচিত হয়।
৭. জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় সমস্যা (Problem in facing emergency) :
পরিকল্পনার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় অনেক সময়ই ব্যর্থ হয়। পরিকল্পনা নিতে গিয়ে ন্যূনতম যেই পরিমাণ সময় দেয়ার প্রয়োজন পড়ে পরিস্থিতি অনেক সময় এমন দাঁড়ায় যে তা দেয়া সম্ভব হয় না। Terry ও Franklin এ সম্পর্কেই বলেছেন, “Emergencies and sudden uprisings of unusual situations demand on-the-spot decisions. Valuable time cannot be spent thinking over the situation and designing a অর্থাৎ জরুরি অবস্থায় এবং হঠাৎ করে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক, উপস্থিত মতো plan. সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়ে । সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মূল্যবান সময় চিন্তায় মগ্ন থেকে বা উত্তম পরিকল্পনা তৈরির মানসে সময় ব্যয় করা যায় না ।
৮. সংশোধনে সমস্যা (Problem in correction) :
সঠিকভাবে ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে ব্যর্থতা বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যাওয়ার কারণেই শুধু পরিকল্পনা কার্যকারিতা হারায় না অনেক সময় পরিকল্পনাবিদদের ব্যক্তিগত অদক্ষতা, অবহেলা ও ত্রুটির কারণেও বাস্তবায়নে গিয়ে গৃহীত পরিকল্পনাতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন দেখা দেয় । এরূপ ক্ষেত্রে গৃহীত পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা আরো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। প্রথমত পরিকল্পনার ত্রুটি ধরতে সময় লাগে। অনেক সময় ব্যবস্থাপকগণ পরিকল্পনায় ভুল রয়েছে এটা স্বীকার করতে চান না । আবার কাজ বন্ধ করেও পরিকল্পনার সংশোধন করা সমস্যা হয়ে দেখা দেয় । ফলে প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার পরিবেশ সৃষ্টি হয় ।
৯. আতিশয্যের প্রতি ঝোঁক (Tendency toward excessiveness) :
পরিকল্পনা প্রণয়নকালে পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে আতিশয্যের প্রতি বা বাড়তি কিছু করা যাবে এমন আশাবাদের প্রতি স্বাভাবিক ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অতীতে কী হয়েছে তার বিবেচনার চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতিরিক্ত আশাবাদ উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা গ্রহণে পরিকল্পনাবিদদের অনেক সময়ই উৎসাহিত করে। এ জন্য প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হলেও কার্যক্ষেত্রে তা সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয় ।
১০. পরিকল্পনায় নিজস্ব প্রভাব সৃষ্টির প্রয়াস (Tendency to influence planning) :
পরিকল্পনা প্রণয়নে নিজস্ব ভূমিকা রাখতে পারাকে নির্বাহীগণ অনেক সময় কর্তৃত্বের পরিচায়ক মনে করেন। Weinrich ও Koontz. বলেছেন, -“If managers are not allowed a certain degree of discretion and planning responsibility, they are not truly manager, “33 যে কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অনেক সময় পরিকল্পনা প্রণয়ন কার্যকে যথাসম্ভব নিজ কর্তৃত্বাধীনে রাখতে চান। ফলে অধস্তনদের ওপর পরিকল্পনা চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয় । এতে পরিকল্পনা মানসম্মত হয় না। অন্যদিকে এর বাস্তবায়নেও অধস্তনদের সক্রিয় সহযোগিতা লাভে সমস্যা হয়।
১১. বাহ্যিক সমস্যা সমাধানে অক্ষমতা (Inability to resolve external problems) :
পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ বিষয়ক । কিন্তু এই ভবিষৎ সব সময়ই অনিশ্চিত । পরিকল্পনা গ্রহণ ও এর বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানের ভিতর ও বাইরের বিভিন্ন বিষয় প্রভাব সৃষ্টি করে বিধায় এ অনিশ্চয়তা আরো বৃদ্ধি পায়। অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবেলা কিছুটা সহজসাধ্য হলেও বাহ্যিক সমস্যা বা অনিশ্চয়তা সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ফলে পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এটাও একটা বড় সমস্যা হিসেবে গণ্য হয় । নিশ্চয়তা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কীভাবে ঝুঁকি সহযোগে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় তা নিম্নের রেখাচিত্রের সাহায্যে তুলে ধরো হলো :

উপসংহারে বলা যায়, পরিকল্পনা নিলেই তা থেকে ভালো ফল পাওয়া যাবে তা প্রত্যাশা করা যায় না। পরিকল্পনা গ্রহণকালে নানান সীমাবদ্ধতা যেমনি এর কার্যকারিতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে তেমনি পরিকল্পনাবিদ ও এর বাস্তবায়নকারীদের নানান সীমাবদ্ধতা ও অযোগ্যতাও পরিকল্পনাকে অকার্যকর করে তোলে । আর যে কারণেই হোক পরিকল্পনা সুষ্ঠু না হলে বা এর প্রয়োগে ভুল হলে পরিকল্পনা নিজেই কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে পড়ে।
