পরিকল্পনা প্রণয়নের পদ্ধতি এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। পরিকল্পনা কেমন হবে তার মান পরিকল্পনা প্রণয়নের পদ্ধতির ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করে । প্রতিষ্ঠানের ধরন, সামর্থ্য, অবস্থা, নির্বাহীদের মান ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিকল্পনা প্রণয়নের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো :
Table of Contents
পরিকল্পনা প্রণয়নের পদ্ধতি

১. স্বীয় অভিজ্ঞতাভিত্তিক পরিকল্পনা পদ্ধতি (Planning method based on personal experience):
এরূপ পদ্ধতিতে নির্বাহী তার স্বীয় অভিজ্ঞতার আলোকে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা যোগ করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিচার-বিশ্লেষণের ওপর এক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করা হয় না। বিকল্প কর্মপন্থা অনুসন্ধান ও মূল্যায়নের কোনো প্রয়োজনও এক্ষেত্রে অনুভূত হয় না। নির্বাহী হয়তো বিকল্প চিন্তা করেন কিন্তু স্বীয় অভিজ্ঞতার বলে তিনি উত্তম কর্মপন্থা ঠিক করেন ও তা কাজে রূপায়িত করার প্রয়াস চালান ।
ছোট ছোট অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই এভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এতে পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য কোনো ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না । কোনো বাড়তি পরিশ্রমও আবশ্যক বিবেচিত হয় না। একজন সফল নির্বাহী প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সমস্যা পূর্বে যেভাবে সমাধান করেছেন সেই অভিজ্ঞতায় এখানে প্রয়োগ করেন।
পূর্ব পরিকল্পনা হতে তিনি যে সাফল্য পেয়েছেন সেই অভিজ্ঞতাতেই নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেন। পূর্ব পরিকল্পনায় কার্যক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতি ঘটে থাকলে তা সমাধানের পন্থা বা কর্মসূচি কী হতে পারে তাও তিনি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানার চেষ্টা করেন । বৃহদায়তন ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ কর্ম পরিবেশে এরূপ পরিকল্পনা পদ্ধতি তেমন কার্যকর নয় ।
২. অনুকরণীয় পরিকল্পনা পদ্ধতি (Imitative planning method):
সমজাতীয় সফল কোনো প্রতিষ্ঠান কোন্ বিষয়ে কী ধরনের পরিকল্পনা নিচ্ছে তা দেখে সে ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণকে অনুকরণীয় পরিকল্পনা পদ্ধতি বলে । সমজাতীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অন্য কোনো সফল নির্বাহীর গৃহীত পরিকল্পনা দেখেও এরূপ পরিকল্পনা নেয়া হতে পারে । সে কারণেই বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় জগতে অন্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান কোন্ বিষয়ে কী ধরনের পরিকল্পনা নিচ্ছে সেটা জানার জন্য প্রয়াস-প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়।
অনেক প্রতিষ্ঠান তা জানার পর তার অনুকরণে নিজস্ব পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরূপ পরিকল্পনা পদ্ধতির সুবিধা হলো এতে তেমন কোনো ব্যয় করতে হয় না । অন্যদিকে একাধিক সফল প্রতিষ্ঠান বা নির্বাহীর পরিকল্পনা দেখে সবচেয়ে ভালো পরিকল্পনা ব্যবহারের এক্ষেত্রে সুযোগ থাকে ।
তবে এর বড় অসুবিধা হলো প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা ও বাস্তবতা এক ধরনের নয় । তাই একটি পরিকল্পনা এক প্রতিষ্ঠানে সফল বিবেচিত হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানে তা সফল হবে এমন বলা যায় না । এ ছাড়া একটা প্রতিষ্ঠান তার পরিকল্পনা কখনই অন্য প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করতে চায় না । প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের বেলায় এটি সর্বাংশে সত্য । তাই হুবহু অনুকরণ করার কার্যত তেমন সুযোগ থাকে না।
৩. পরিকল্পনার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Scientific method of planning) :
যুক্তি ও বিচার-বিশ্লেষণ সহযোগে কোনো পরিকল্পনা তৈরি করা হলে তাকে পরিকল্পনা প্রণয়নের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বলে । এরূপ পদ্ধতিতে উদ্দেশ্য অর্জনে বিভিন্ন বিকল্প কর্মপন্থা কী হতে পারে তা নির্ণয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয় । কোনো একটা কর্মসূচি গ্রহণ করলে প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন উপায়-উপকরণের ওপর তার প্রভাব কী হবে এক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তা পরিমাপ করা হয়ে থাকে । এভাবে বিকল্পসমূহের মধ্য হতে উত্তম বিকল্পকে পরিকল্পনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
ধরা যাক, একটা প্রতিষ্ঠান পূর্ব বছরের তুলনায় ১০% মুনাফা বৃদ্ধি করতে চায়। এখন এটা নানানভাবে হতে পারে । বিক্রীত পণ্যের মূল্য ১০% বাড়ানো হতে পারে, Cost-Volume-Profit বিশ্লেষণ করে বিক্রয়ের পরিমাণ একটা নির্দিষ্ট হারে বৃদ্ধি করা যেতে পারে বা উৎপাদিত পণ্যের ব্যয় একটা নির্দিষ্ট হারে কমিয়ে ফেলা যেতে পারে ।
এখন এই প্রতিটা বিকল্পের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন বিষয় বা চলক (Variables) সম্পর্কিত। যেমন-দ্রব্যমূল্য বাড়াতে গেলে বাজার হারানোর সম্ভাবনা আছে, বিক্রয়ের পরিমাণ বাড়াতে গেলে পণ্যের দাম কমাতে হবে বা বিজ্ঞাপন ব্যয় বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া মেশিন ও অন্যান্য উপকরণ উৎপাদন
বাড়ানোর পরিকল্পনায় কতটুকু ইতিবাচক সাড়া দিবে তাও দেখার বিষয় । পণ্যের উৎপাদন ও অন্যান্য ব্যয় (cost) কমাতে চাইলে তা পূর্বের মান বজায় রেখে সম্ভব কিনা সেটাও খুবই সতর্ক হিসাব-নিকাশের বিষয়। এ সকল বিষয় চিন্তা-ভাবনা করতে গিয়েই প্রয়োজন পড়ে তথ্য সংগ্রহ ও তার সতর্ক বিচার-বিশ্লেষণের । প্রতিটা বিষয়ে বিভিন্ন অঙ্ক কষে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন পড়ে ।

এরূপ পরিকল্পনার অসুবিধা হলো এতে পরিকল্পনার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সময়ও অনেক বেশি লাগে । কিন্তু সুবিধা হলো এতে ঝুঁকির পরিমাণ অনেকাংশে হ্রাস পায়। বড় ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেহেতু সহজেই গৃহীত পরিকল্পনা বাদ দেয়া বা সংশোধনের সুযোগ থাকে না তাই সেখানে ‘Trial & Error’ পদ্ধতির ব্যবহারও প্রত্যাশিত নয় । তাই তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ, বিকল্প নির্ধারণ, বিকল্প মূল্যায়ন, প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থা ও সমস্যাদির চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যতে কী হতে পারে সেই সম্পর্কে সাধ্যানুযায়ী নিশ্চিত হওয়ার প্রয়াস চালানো হয় ।
এ ছাড়া বড় ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে যে সকল বিষয় ধরে নেয়, তার কোনো ব্যত্যয় ঘটলে কী করা হবে সেটাও পরিকল্পনার আকারে ঠিক করে রাখে। যাকে Contingency plan বলে । এভাবে ঝুঁকির পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলে । কার্যত দেখা যায় বড়ো প্রতিষ্ঠানে এত কিছু করার পরও পরিকল্পনার পিছনে যে ব্যয় হয় সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের ফলাফলের ওপর তার প্রভাব তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু হয় না ।
