পরিকল্পনা প্রণয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পরিকল্পনা। এটি চিন্তন-মনন প্রক্রিয়া । এটি অন্যান্য ব্যবস্থাপকীয় কাজের ভিত্তি। তাই বর্তমানকালে যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই পরিকল্পনার ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয় । গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় আবেগ ও শুধুমাত্র অনুমানের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা নেয়া হলে তা কখনই প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকাণ্ডের দিকনির্দেশ (Guidelines) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তাই বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা রচিত হয় ।
Table of Contents
পরিকল্পনা প্রণয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ
একটা বড় ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন মেয়াদের পরিকল্পনা গৃহীত হতে দেখা যায় । প্রতিষ্ঠানের মূখ্য পরিকল্পনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃক গ্রহণ করা হলেও তা নিচের দিকে গিয়ে প্রত্যেক বিভাগ ও উপ-বিভাগে ছোট ছোট কর্মসূচির আকারে গৃহীত হয় ।

তাই নিচের স্তরে পরিকল্পনা গ্রহণ অনেকটা সহজ হলেও উচ্চ স্তরে পরিকল্পনা গ্রহণে পরিকল্পনা প্রণয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণের প্রয়োজন পড়ে । ফলে পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ব্যয়িত সময়ের পরিমাণও অধিক হয় । একটি বড় ধরনের প্রতিষ্ঠানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নির্বাহীগণ যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. বর্তমানের আলোকে ভবিষ্যৎ সুযোগ-সুবিধা মূল্যায়ন (Evaluating future situations in light of the present) :
পরিকল্পনা একটি চিন্তনীয় কাজ। অইরিক ও কুঞ্জ পরিকল্পনাকে একটি বুদ্ধিসম্পন্ন প্রক্রিয়া (Intellectual process) হিসেবে গণ্য করেছেন। তাই পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পরিকল্পনাবিদকে বিদ্যমান পরিকল্পনার কার্যকারিতা, সুবিধা-অসুবিধা এবং ভবিষ্যৎ অবস্থা ও সমস্যাদি সম্পর্কে পূর্বেই পরিষ্কার ধারণা অর্জন করতে হয়। এজন্য ব্যবস্থাপকগণ প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকগুলোকে সুস্পষ্ট ও সম্পূর্ণরূপে জানার চেষ্টা করে।
সুবিধা ও সমস্যার মধ্যে বর্তমানে তারা কোন্ অবস্থায় রয়েছে তা বুঝতে চেষ্টা করে এবং কোন্ কোন্ সমস্যা সমাধান করলে প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে তাও নির্ধারণের প্রয়াস পায়। এর প্রতি আলোকপাত করেই Weinrich ও Koontz বলেছেন “Planning requires a realistic diagnosis of the opportunity sitauation. ” অর্থাৎ পরিকল্পনা প্রণয়নে সুযোগ-সুবিধা যা রয়েছে তার বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে ।
২. সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নির্ধারণ (Establishing clear objectives) :
বাস্তব অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সুবিধা- অসুবিধা সম্পর্কে ধারণা গ্রহণপূর্বক তার আলোকে প্রতিষ্ঠানের মৌলিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী বিভাগ ও উপ-বিভাগের উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা পরিকল্পনার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ । ধরা যাক, একটা প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন বিগত বছরের তুলনায় ১০% ভাগ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তার আলোকে বিভিন্ন বিভাগের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হবে ।
এ সকল উদ্দেশ্যাবলি অবশ্যই সুস্পষ্ট হওয়া উচিত । টেরি ও ফ্রাংকলিন উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, “A managerial objective is the intended goal that prescribe definite scope and suggests direction of the planning efforts of a manager. “অর্থাৎ ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্য হলো প্রত্যাশিত লক্ষ্য যা একজন ব্যবস্থাপককে তার পরিকল্পনা প্রণয়ন কার্যের আওতা কত দূর বিস্তৃত হবে তা নির্দেশ করে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশিকাগুলো কী হতে পারে সেই সম্পর্কে পরামর্শ দেয় ।
৩. প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ (Collection and analysis of necessary information) :
উদ্দেশ্য অর্জনের নিমিত্তে কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য এ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হয় । পরিকল্পনাকে শুধুমাত্র অনুমান নির্ভর না করে তথ্যনির্ভর ও বাস্তবমুখী করার জন্য এ পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এজন্য প্রতিষ্ঠানের বিগত বছরগুলোর প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ের তথ্যচিত্র বিশ্লেষণ এবং প্রতিযোগী, বিক্রেতা, ভোক্তা ইত্যাদি পক্ষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন পড়ে । বাস্তবায়ন কাজে জড়িত অধস্তনদের কাছ থেকেও এ পর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য ও পরামর্শ সংগ্রহ করা যেতে পারে । পরিকল্পনা
৪. ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান (Assumptions regarding future) :
প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণপূর্বক পরিকল্পনা প্রণেতাগণকে এ পর্যায়ে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বানুমান করতে হয়। এ পর্যায়ে শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অবস্থায় নয় এর বাইরের বিভিন্ন পক্ষ; যেমন- প্রতিযোগী, ভোক্তা, সরকারসহ বিভিন্ন পক্ষের অবস্থা ও তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা কী হতে পারে এ সম্পর্কে অনুমান করার প্রয়োজন পড়ে। এরূপ অনুমানের আলোকে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা গ্রহণের চেষ্টা করা হয় । অনেক লেখক পরিকল্পনার এ পদক্ষেপকে পরিকল্পনার পটভূমি নির্ধারণ বা পরিকল্পনা অঙ্গন স্থাপন (Establishing planning premise) হিসেবে গণ্য করেছেন।
৫. বিকল্প কার্যপদ্ধতি স্থিরকরণ (Determining the alternative courses of actions)
অনুমিত অবস্থার মধ্য দিয়ে কীভাবে লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে এ জন্য বিভিন্ন বিকল্প কার্যপদ্ধতি এ পর্যায়ে নির্দিষ্ট করা হয়। ধরা যাক, ভবিষ্যতে কোনো বিশেষ দ্রব্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন এই বর্ধিত বাজারে কীভাবে একটা প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিক্রয় বাড়াবে এজন্য বিভিন্ন বিকল্প; যেমন-মূল্য কমানো, বিজ্ঞাপন বাড়ানো, পণ্যের মানোন্নয়ন ইত্যাদি যেকোনো বিষয় বিবেচনা করতে পারে । বিকল্পের সংখ্যা বেশি হলে তার মধ্য থেকে একেবারে দুর্বল বিকল্প বাদ দিয়ে শক্তিশালী বিকল্পসমূহ নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে ।
৬. বিকল্পসমূহ মূল্যায়ন (Evaluating alternatives) :
এক্ষেত্রে বাছাইকৃত বিকল্পসমূহ অনুমিত অবস্থা ও লক্ষ্যের আলোকে বিবেচনা করতে হয়। সাধারণ বিচারে কোনো বিকল্প সর্বোত্তম মনে হলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় ঐ বিকল্প গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। প্রয়োজনে একেকটি বিকল্পকে প্রজেক্ট হিসেবে বিবেচনা করে তাতে সম্ভাব্য ব্যয়, প্রাপ্ত সুবিধা ও অসুবিধা পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হয় ।
বিকল্পসমূহ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে টেরি ও ফ্রাংকলিন নিম্নোক্ত তিনটা বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন :
ক) কোনো নির্দিষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে কীভাবে তার সমন্বয় করা হবে;
খ) ব্যয়, কাজের গতি এবং দ্রব্য ও সেবার মানের বিষয়ে বিকল্প পরিকল্পনাটি কতটুকু সন্তোষজনক এবং
গ) নতুন যন্ত্র সংগ্রহ প্রতিষ্ঠানের কাজকে কী আরো অধিক সম্প্রসারণে সহায়তা করবে হবে
৭. সর্বোত্তম বিকল্প গ্রহণ (Selecting the best alternative) :
বিকল্পসমূহ মূল্যায়নের পর এ পর্যায়ে সর্বোত্তম বিকল্প বাছাই করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থাকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার একাধিক বিকল্প পথ রয়েছে। এখন কোনো ব্যক্তি কোন্ পথে সেখানে যাবে তা তার প্রয়োজন, সময় ও বাস্তব অবস্থার আলোকেই নির্ধারণ করতে হয়। বাছাইকৃত বিকল্পটি কার্যকর মৌলিক পরিকল্পনা হিসেবে গৃহীত হয় ।
টেরি ও ফ্রাংকলিন সর্বোত্তম বিকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত তিনটি বিষয় বিবেচনার কথা বলেছেন:
ক) বিকল্পটি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি বিধানের মতো যথেষ্ট নমনীয় কিনা;
খ) উক্ত বিকল্পটি কার্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা ও
গ) বিকল্প পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে কী ধরনের নতুন যন্ত্রপাতি, জায়গা, কর্মী, প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন হবে।
৮. সহায়ক পরিকল্পনা প্রণয়ন (Preparing derivative plans )
মৌলিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সহায়ক পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। ধরা যাক, একটা বিমান কোম্পানি কয়েকটা নতুন বিমান ক্রয়ের পরিকল্পনা নিচ্ছে। এখন এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কতকগুলো সহায়ক পরিকল্পনা নিতে হবে; যেমন-ক্রু সংগ্রহ, তাদের প্রশিক্ষণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা সৃষ্টি ইত্যাদি ।
৯. কার্যারম্ভের সময় ও কার্যক্রম নির্ধারণ (Determining the time and programmes of commencement) :
পরিকল্পনা প্রণেতাগণ এ পর্যায়ে গৃহীত মৌলিক পরিকল্পনাকে সামনে রেখে ভবিষ্য কার্যক্রম নির্ধারণ করেন এবং এগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সাজান। অতঃপর প্রত্যেক কাজের শুরু ও সমাপনের সময় নির্দিষ্ট করা হয় । এটি পরিকল্পনাকে বিশদ রূপ প্রদান করে। অবশ্য এরূপ কার্যক্রম ও সময় নির্ধার অধস্তনরা সহজে গ্রহণ করবে কিনা তা বিবেচনা করতে হয়, অতঃপর তা লিখিতভাবে ধারাবাহিক ও সময়ানুক্রমিক সাজানো হয় । যা একটি কার্যকর পরিকল্পনার রূপ পরিগ্রহ করে ।
১০. প্রণীত পরিকল্পনার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ (Pilot runing of the plans formulated) :
কখনও কখনও গৃহীত পরিকল্পনা স্থায়ীরূপে প্রয়োগ না করে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়। অনুমিত অবস্থার আলোকে যথাযথভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা দেখা দেয় কিনা তা বিচার করাই এরূপ পদক্ষেপের লক্ষ্য। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা; যেমন-উৎপাদন প্রক্রিয়া নির্ধারণের পরিকল্পনা গ্রহণে এরূপ পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হতে পারে ।

১১. কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও সংশোধনী ব্যবস্থা গ্রহণ (Evaluation of effectiveness and taking corrective action) :
এ পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগকৃত পরিকল্পনার কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংশোধনীমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হয়। অতঃপর পরিকল্পনাকে স্থায়ীভাবে প্রয়োগযোগ্য হিসেবে ধরা হয়। যদিও ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকে ।
