প্রেষণা প্রক্রিয়া বা প্রেষণা চক্র

আজকের আলোচনার বিযয় প্রেষণা প্রক্রিয়া বা প্রেষণা চক্র  – যা প্রেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, প্রক্রিয়া বলতে পরস্পর নির্ভরশীল কতিপয় ধারাবাহিক কাজের সমষ্টিকে বুঝায়-যার উপর লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করে। কার্যকর প্রেষণা দানের ক্ষেত্রে এরূপ কতিপয় ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়ে। ফলে কার্য পদক্ষেপসমূহকে একত্রে প্রেষণা প্রক্রিয়া নামে অভিহিত করা হয়।

কর্মীদের অভাব শনাক্তকরণ, অভাবের অংশবিশেষকে চাহিদা (Wants) হিসেবে স্বীকৃতিদান এবং চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে কর্মী সন্তুষ্টি বিধান (Satisfaction) এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ । প্রেষণা মানুষের মনের সাথে সম্পর্কিত। মানুষের অভিপ্রায় (Motive) অর্থাৎ তাড়না, আগ্রহ, ইচ্ছা ও আকাঙক্ষা পূরণ করে মানুষের আচরণকে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে কাজে লাগানোই প্রেষণা প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ।

প্রেষণা প্রক্রিয়া বা প্রেষণা চক্র

 

প্রেষণা প্রক্রিয়া বা প্রেষণা চক্র

 

এজন্য দরকার হয় মানুষের প্রয়োজন ও অভিপ্রায় সম্পর্কে ধারণা লাভের । কারণ প্রয়োজন বা অভাববোধ হতেই মানুষের মাঝে উদ্বিগ্নতার সৃষ্টি হয়। প্রয়োজন পূরণ না হলে জন্ম নেয় নেতিবাচক মনোভাব ও অসন্তুষ্টি । অন্যদিকে যদি প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা নেয়া হয় তবেই তার মাঝে কাজ করার স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ ও সন্তুষ্টির সৃষ্টি হয় । এরূপ আগ্রহ ও সন্তুষ্টি সৃষ্টির কাজকেই প্রকৃত অর্থে প্রেষণা বলে এবং এ লক্ষ্যে গৃহীত কর্মপ্রচেষ্টার সমষ্টিকেই প্রেষণা প্রক্রিয়া নামে অভিহিত করা হয় । 

ব্যবস্থাপনা নীতিমালা নিম্নে প্রেষণা প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরা হলো : 

১. কর্মীদের প্রয়োজন অনুসন্ধান (Enquiring the needs of employees) :

কর্মীদের প্রয়োজন পূরণ করে তাদেরকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত করাই প্রেষণা প্রক্রিয়ার লক্ষ্য । তাই কর্মীদের প্রয়োজন বা প্রত্যাশা কী প্রেষণা প্রক্রিয়ার প্রথমেই তা অনুসন্ধান করতে হয় । কর্মীরা কী ভাবছে, কী পাওয়ার তারা প্রত্যাশা করে-এগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেই তাদের মনের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ সম্ভব ।

২. অভাবের স্বীকৃতিদান (Recognizing needs) :

কর্মীদের সকল অভাব কেই চাহিদা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না । বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োজিত কর্মীদের প্রত্যাশায় পার্থক্য থাকায় ব্যক্তিক ও সামষ্টিক পর্যায়ের প্রয়োজনগুলোকে বিবেচনায় এনে সাধারণ প্রত্যাশাসমূহকে এ  পর্যায়ে চাহিদা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় ।

৩. উদ্দীপক শনাক্তকরণ (Identification of motivators) :

কর্মীদের চাহিদাগুলোকে স্বীকৃতি দেয়ার পর তা পূরণের প্রয়োজনীয় উপায় বা পদ্ধতি কী হতে পারে সেগুলো শনাক্তকরণের প্রয়োজন পড়ে । এজন্য আর্থিক ও অনার্থিক বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপকের প্রয়োজন হয় । আর্থিক প্রণোদনার ক্ষেত্রে নানান বিষয় বিবেচনা করা হয়ে থাকে । অনার্থিক প্রেষণাদানের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ও পরিবেশগত উন্নয়নে নানান কর্ম ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে ।

 

৪. প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বিবেচনা (Considering organizational ability) :

উদ্দীপকগুলো নির্দিষ্ট করার পর তা দেয়া সম্ভব কিনা বা প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যের বিচারে কর্মীদের সব দাবি-দাওয়া পূরণ করা যাবে কি না তা বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হয়। প্রয়োজনে চাহিদা বা দাবি-দাওয়ার গুরুত্ব বিবেচনা করে একটা অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করা হয় এবং কখন থেকে কোন কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়ে থাকে ।

৫. উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি গ্রহণ (Taking inspirational programme) :

সাধারণত লক্ষনীয় যে, কর্মীদের সকল চাহিদা পূরণ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই যতটুকু সুযোগ-সুবিধা দেয়া সম্ভব হচ্ছে তা পেয়েই যাতে কর্মীরা সন্তুষ্ট থাকে বা নেতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন না করে এজন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে প্রয়োজনীয় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় । এজন্য বিভিন্ন পক্ষের সাথে মত বিনিময় ও প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয় ।

৬. উদ্দীপকের প্রয়োগ (Application of motivators) :

এ পর্যায়ে এসে উদ্দীপক বা সুযোগ-সুবিধাগুলো কর্মীদেরকে প্রদান করা হয় । ক্ষেত্রবিশেষে পর্যায়ক্রমে সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে । এক্ষেত্রে সবসময়ই স্মরণে রাখা হয় যে অভাব কখনই সম্পূর্ণভাবে মিটে না । একটা অভাব পূরণ হলে সন্তুষ্টি অর্জিত হয় বটে কিন্তু পরবর্তীতে আবার নতুন অভাববোধের সৃষ্টি হয় । তাই পরবর্তী অভাব যাতে দ্রুত সৃষ্টি না হতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা হয় ।

৭. কর্মী সন্তুষ্টি বিধান (Acquiring job satisfaction) :

প্রেষণা প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ বা উদ্দেশ্যই হলো কর্মী সন্তুষ্টি বিধান করা । অনেক সময় দেখা যায় দাবি-দাওয়া যথেষ্ট পূরণ করা হলেও কার্যকর যোগাযোগ ও প্রচারণার অভাবে তা পূর্ণতা পায় না । তাই সুযোগ-সুবিধা প্রদানের সাথে সাথে কর্মীদের মাঝে যাতে তা কার্যকর সন্তুষ্টি বিধান করতে পারে এজন্য প্রয়োজনীয় অনুসরণ (Follow-up) করা হয়ে থাকে ।

কর্মী সন্তুষ্টি অর্জিত হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে । অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের সাথে সাথে কর্মীদের মাঝে নতুন সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশা জন্মে। এর বাইরেও নানা কারণে নতুন প্রত্যাশা ও অভাববোধের জন্ম নেয় । ফলে আবার এক পর্যায়ে গিয়ে নতুন করে প্রেষণা প্রক্রিয়ার অনুসরণ করা হয় এবং কর্মীসন্তুষ্টি বৃদ্ধি করে মনোবল উন্নয়নের প্রয়াস ধরে রাখা হয় । এভাবেই তা চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে । নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্য প্রেষণা প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক রূপ তুলে ধরা হলো :

 

প্রেষণা প্রক্রিয়া বা প্রেষণা চক্র
প্রেষণা প্রক্রিয়া বা প্রেষণা চক্র

Leave a Comment