ব্যবসায় সংগঠন ব্যবস্থাপনার ওপর পরিবেশের প্রভাব

ব্যবসায় সংগঠন ব্যবস্থাপনার ওপর পরিবেশের প্রভাব এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিবেশ” বিষয়ক পাঠের অংশ। সৃষ্টির সবকিছুই তার পারিপার্শ্বিকতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। ব্যবসায় সংগঠন ও এর ব্যবস্থাপনাও এর ঊর্ধ্বে নয়। বরং ব্যবসায়ের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানান ধরনের পরিবেশগত উপাদান একে সার্বক্ষণিক প্রভাবিত করে । তাই Terry ও Franklin বলেছেন, “ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সকল কাজ এর পরিবেশগত উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয় । ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রমে এ সকল উপাদান শর্ত আরোপ, বাধা সৃষ্টি ও প্রভাব বিস্তার করে ।” নিম্নে বিভিন্ন দিক হতে এ প্রভাব তুলে ধরা হলো:

Table of Contents

ব্যবসায় সংগঠন ব্যবস্থাপনার ওপর পরিবেশের প্রভাব

 

ব্যবসায় সংগঠন / ব্যবস্থাপনার ওপর পরিবেশের প্রভাব | পরিবেশ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১. সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব (Influence on taking correct decision):

ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলায় প্রতিনিয়তই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবস্থাপনা ভাল-মন্দ নানান দিক বিবেচনা করে। এ সকল দিক মূলত ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদানের সাথে সম্পর্কিত । উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে গেলে আভ্যন্তরীণ সমর্থ, বাজারের অবস্থা, প্রতিযোগীদের প্রভাব ইত্যাদি নানান বিষয় ভাবতে হয়। অর্থাৎ পরিবেশের বিভিন্ন ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে । এক্ষেত্রে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান থেকে নিম্নোক্ত সহায়তা পাওয়া যায় :

ক) পরিবেশগত নানান তথ্য দিয়ে সহায়তা;

খ) বাস্তব অবস্থা উপলব্ধিতে সহায়তা এবং গ) ভবিষ্যৎ বুঝতে ও অনুমান করতে সহায়তা ।

 

২. ফলপ্রদ স্ট্র্যাটিজি গ্রহণের উপর প্রভাব (Influence on taking effective strategy):

প্রতিযোগীদের মোকাবেলা করে সঠিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবসায় ব্যবস্থাপকদের বিভিন্ন মেয়াদে স্ট্র্যাটিজি গ্রহণ করছে। হয় । এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমর্থ, প্রযুক্তিগত মান, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধরন, ভবিষ্যৎ প্রাকৃতির অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, আইনগত, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি নানান পরিবর্তনের সম্ভাবনার বিষয় বিবেচনায় আনতে হয় । অন্যথায় ফলপ্রদ স্ট্র্যাটিজি গ্রহণ করে ব্যবসায়কে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না ।

 

৩. কার্যদক্ষতার উন্নয়নের উপর প্রভাব (Effect on developing working efficiency):

একটা ব্যবসায় সংগঠনের কার্যদক্ষতা এর মালিক, ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক-কর্মী, যন্ত্রপাতি, মুলধন, বাজার, প্রতিযোগী ইত্যাদি পরিবেশের নানান উপাদানের উপর নির্ভরশীল । কম ব্যয়ে অধিক উৎপাদন, সঠিক সময়ে সঠিক কাজ ইত্যাদি এই পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয় । যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যবস্থাপক, উন্নত যন্ত্রপাতি ইত্যাদি বিষয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে। আবার ব্যবসায়ের দীর্ঘদিনের বাজে সংস্কৃতিও দক্ষতার উন্নয়নের অন্তরায়। তাই প্রতিষ্ঠানের কার্যদক্ষতার উন্নয়নে পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য ।

 

৪. কার্য অবস্থার উপর প্রভাব (Effect on working condition):

একটা প্রতিষ্ঠানের কাজের অবস্থা, মান, দক্ষতা-অদক্ষতা ভাল-মন্দ ইত্যাদি পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের উপর নির্ভরশীল । আমাদের দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যাবস্থা দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা নেতিবাচক পরিবেশের ফল। আবার বিদেশী বহুজাতির কোম্পানিগুলোর কার্যাবস্থা বা কার্য পরিবেশ সেটাও তাদের পরিবেশগত বিভিন্ন ইতিবাচক দিকের ফল। একই মানুষ এক জায়গায় মন দিয়ে কাজ করে কিন্তু অন্যত্র গেলে কাজ করে না -এর কারণ উদঘাটনে পরিবেশের বিভিন্ন প্রভাবকেই যুক্তিযুক্তভাবে বিবেচনা করা উচিত ।

 

৫. প্রতিযোগিতার সামর্থ্যের উপর প্রভাব (Effect on the ability of competition):

বিশ্বায়নের এ যুগে প্রতিযোগিতা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, কোনো কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে সবসময় এক ধরনের সার্বক্ষণিক যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এগুতে হয়। এই প্রতিযোগিতার খেলায় টিকে থেকে এগিয়ে যেতে হলে ব্যবস্থাপনার উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সৃষ্টিকারী পরিবেশের বিভিন্ন উপাদনসমূহকে বিবেচনা না করে চলা সম্ভব নয় । ক্রেতা বা ভোক্তাদের পছন্দ ও আর্থিক সামর্থ্য কোন দিকে যাচ্ছে, প্রতিযোগীদের অবস্থা ও তাদের বিভিন্ন কৌশল, আভ্যন্তরীণ পরিবেশের প্রভাব ইত্যাদি বিবেচনা করেই প্রতিযোগিতার সামর্থ্য বৃদ্ধিতে ব্যবস্থাপনাকে চেষ্টা চালাতে হয় ।

 

৬. প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের উপর প্রভাব (Effect on the growth and developemnt) :

ব্যবসায় একটি গতিশীল সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এর টিকে থাকা ও উদ্দেশ্যার্জন এর প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের উপর নির্ভরশীল। ব্যবস্থাপনাকে সেজন্য সবসময় পরিবেশের বিভিন্ন উপাদনের নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে হয়। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের উপাদানগুলোর উন্নয়ন সম্ভব হলেও বাহ্যিক বিভিন্ন উপাদান; যেমন- প্রতিযোগী সরকার, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক অবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায় না। তাই প্রতিষ্ঠানের কাক্সিখত প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন পরিবেশের উপর নির্ভরশীল ।

 

৭. শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উপর প্রভাব (Influence on labour management relationship):

যে কোন প্রতিষ্ঠানের শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয় । প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপকদের শ্রমিক-কর্মী সম্পর্কে ধারণা, তাদের মন-মানসিকতা, আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা ইত্যাদি দ্বারা যেমনি শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রভাবিত হয় তেমনি কর্মীদের মালিক ও ব্যবস্থাপকদের সম্পর্কে ধারণা, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের প্রতি আগ্রহ ও আনুগত্য, শ্রমিক সংঘের অবস্থা ইত্যাদিও এক্ষেত্রে বিবেচ্য। দেশের সামগ্রীক শিল্প সম্পর্ক পরিস্থিতি, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থা ইত্যাদির প্রভাবও এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিনে গড়ে উঠা এরূপ সম্পর্কের সংস্কৃতিও এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে।

 

৮. অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রভাব (Influence on other sectors) :

ব্যবসায় সংগঠন ও এর ব্যবস্থাপনার উপর পরিবেশের উপরোক্ত প্রভাবের বাইরেও এ সংক্রান্ত ভাবনা নিম্নোক্ত বিশেষ রকমের প্রভাব সৃষ্টি করে :

 

ক) পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলার সামর্থ্য সৃষ্টি (Creating ability to manage changing situation):

ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে নানান ধরনের পরিবেশের প্রভাব যেমনি লক্ষণীয় তেমনি এ সকল পরিবেশের অবস্থা ও মিথষ্ক্রিয়া (Interaction) সতত পরিবর্তনশীল । এ ধরনের পরিবেশের বিপদ মোকাবেলা ও উদ্ভুত সমস্যার সমাধান করে এবং প্রাপ্ত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবস্থাপনাকে এগিয়ে যেতে হয় । তাই পরিবেশের উপাদানসমূহ ব্যবস্থাপনার এরূপ সামর্থ্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে ।

 

খ) সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহ দান (Encouraging for taking unified program) :

পরিবেশের বিভিন্নমুখী প্রভাব ব্যবসায়ীদের সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহিত করে। দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনগত পরিবেশ মোকাবেলায় ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে । আন্তর্জাতিক পরিবেশও এক্ষেত্রে উৎসাহ দেয় । অর্থাৎ ব্যবসায়ের পরিসর বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতা ব্যবসায়ীদেরকে যেমনি পরিবেশ সচেতন করে তেমনি তা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ ও সহযোগী হতেও উৎসাহ দেয় ।

 

ব্যবসায় সংগঠন / ব্যবস্থাপনার ওপর পরিবেশের প্রভাব | পরিবেশ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

গ) সচেতনতা বৃদ্ধি (Increasing awarness) :

পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের প্রভাব ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবেশের চ্যালেঞ্জসমূহ সনাক্তকরণ ও তা কাটিয়ে ব্যবসায়কে এগিয়ে নেয়ার জন্য ব্যবস্থাপকগণ নানা ধরনের গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণে সদা ব্যস্ত। অন্যথায় কোনভাবেই প্রতিযোগিতার খেলায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। অর্থাৎ পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান ব্যবস্থাপকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Leave a Comment