ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি বা ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি বা ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনার পরিচিতি” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি বা ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনের জন্য এতে নিয়োজিত উপকরণাদির কার্যকর ব্যবহারের প্রচেষ্টা বা কৌশলই হলো ব্যবস্থাপনা । ব্যবস্থাপনার এরূপ প্রচেষ্টা কতকগুলো ধারাবাহিক ও পরস্পর নির্ভরশীল কাজের সমষ্টি। যা ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া নামেও অভিহিত । Stoner ও অন্যদের মতে, “Process means a systematic method of handling activities”14 অর্থাৎ প্রক্রিয়া হলো কর্ম সম্পাদন বা কর্ম পরিচালনার প্রণালীবদ্ধ (ধারাবাহিক) পদ্ধতি বিশেষ ।

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি বা ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলিও ধারাবাহিক বিধায় নিঃসন্দেহে একে ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া বলা যায়। ব্যবস্থাপনা বিশারদগণ ব্যবস্থাপনার এ কাজ বা কর্ম প্রক্রিয়াকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। তার কতিপয় ছকের সাহায্যে নিম্নে তুলে ধরা হলো :

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি বা ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া | ব্যবস্থাপনার পরিচিতি | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

 

ছকে উল্লেখ ব্যবস্থাপনার প্রধান কার্যাবলি নিম্নে আলোচনা করা হলো :

১. পরিকল্পনা (Planning) :

পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ । Newman বলেন, “ভবিষ্যতে কী করতে হবে তার অগ্রিম সিদ্ধান্তকেই পরিকল্পনা বলে।” (Planning is deciding in advance what is to be done.) 15 প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অর্জনে কী করতে হবে, কীভাবে ও কার দ্বারা করতে হবে, কখন ও কত সময়ে করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে পূর্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণকেই পরিকল্পনা বলা হয়ে থাকে। পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজের ভিত্তিস্বরূপ । ধরা যাক, একটি কলেজের কতিপয় মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা সফরে পাঠানো হচ্ছে । তাহলে কোথায় যাওয়া হবে, কখন যাওয়া হবে, কীভাবে যাওয়া হবে, কত সময় থাকা হবে, কোথায় থাকা হবে ইত্যাদি বিষয় পূর্বেই নির্ধারণ করতে হয় । এর সবটাই পরিকল্পনা ।

২. সংগঠন (Organizing) :

পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্য বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম কাজ হলো প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত জনশক্তি ও অন্যান্য উপায়-উপাদানকে সংগঠিত করে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা। এরূপ সংগঠিতকরণ ও কার্যোপযোগীকরণকে সংগঠন বলে। Bartol ও Martin-এর মতে, “Organizing is the process of allocating and arranging human and non-human resources so that plans can be carried out successfully.”16 অর্থাৎ মানবীয় ও বস্তুগত সম্পদরাজির বন্টন ও বিন্যাস প্রক্রিয়াই হলো সংগঠন। যাতে করে সফলতার সাথে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় । এ জন্য বিভাগীয়করণ, কর্তৃত্বার্পণ, বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভাগের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি সংগঠন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিবেচিত হয় ।

৩. কর্মীসংস্থান (Staffing) :

(প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী জোগাড় করার কাজকেই সাধারণ অর্থে কর্মীসংস্থান বলে । তবে ব্যাপক অর্থে, বিভিন্ন বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী নির্বাচন, মানোন্নয়ন ও সংরক্ষণ করার কাজকে কর্মীসংস্থান বলা হয়ে থাকে । J. L. Massie বলেন, “Staffing is the process by which managers select, train, promote and retire subordintes. ” 17 অর্থাৎ কর্মীসংস্থান হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যবস্থাপকগণ তাদের অধস্তন কর্মীদের নির্বাচন করেন, প্রশিক্ষণ দেন, পদোন্নতি প্রদান করেন এবং পরিশেষে অবসর গ্রহণ করান ।

৪ নেতৃত্ব প্রদান (Leading) :

নেতৃত্ব বলতে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষার্জনের জন্য অধীনস্থ জনশক্তিকে পরিচালনা করার এমন কৌশলকে বুঝায় যাতে দলীয় সদস্যরা তাদের সর্বাধিক সামর্থ্য অনুযায়ী কর্মসম্পাদনে তৎপর হয়। Theo Haimann, “Leadership can be defined as the process by which an executive imaginatively directs, guides and influences the work of others in choosing and attaining specific gools…” অর্থাৎ নেতৃত্ব হলো উদ্দেশ্য নির্ধারণ ও তা অর্জনে নিয়োজিত জনশক্তির কার্যাবলিকে সুষ্ঠুভাবে নির্দেশনা দান, পরিচালনা ও প্রভাবিত করার প্রক্রিয়া। তাই নির্দেশনা, প্রেষণা, সমন্বয় ইত্যাদি নেতৃত্ব প্রদান কার্যের অন্তর্ভুক্ত । নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

ক) নির্দেশনা (Directing) :

সাধারণভাবে নির্দেশনা বলতে শুধুমাত্র অধীনস্থদের নির্দেশ দেয়াকে বুঝালেও প্রকৃত অর্থে নির্দেশ প্রদান, কর্মীদের কাজ পর্যবেক্ষণ, তত্ত্বাবধান ও অনুসরণ কার্যকে নির্দেশনা বলে Prof. Newman বলেন, “Direction is concerned with the way an executive issues instructions to his subordinates and otherwise indicates what should be done. “18 অর্থাৎ (যে পন্থায় একজন নির্বাহী তার অধস্তন কর্মীদের নির্দেশ প্রদান করেন বা কর্মপন্থার ইঙ্গিত করেন তাকে নির্দেশনা বলে । 

 

খ) প্রেষণা (Motivating) :

কর্মীবৃন্দের কার্যক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে তাদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার প্রক্রিয়াকে প্রেষণা বলে । কথায় আছে ‘ঘোড়াকে জোর করে পানিতে নামানো যায় কিন্তু পানি পান করানো যায় না ।’ তাই কর্মীদের শুধুমাত্র নির্দেশ দিলেই চলে না, কর্মীরা যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে কাজ করে এ জন্য তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে হয়। এরূপ আগ্রহ সৃষ্টির প্রচেষ্টাই প্রেষণা নামে অভিহিত । Michael Jucius-এর মতে, “Motivation is the act of stimulating someone or oneself to take a desired course of action. অর্থাৎ প্রেষণা হলো কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে উৎসাহিত করা যাতে সে বা তারা প্রত্যাশিত কর্ম সম্পাদনে আগ্রহী হয় |

গ) সমন্বয় (Co-ordinating) :

সমন্বয় হলো মূলত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভাগের কার্যাবলিকে একসূত্রে গ্রথিত, সংযুক্ত ও সুসংবদ্ধ করার প্রক্রিয়া। Prof. Newman বলেন, “Co- ordination deals with synchronzing and unifying the actions of a group of people” 20 অর্থাৎ সমন্বয় দলবদ্ধ কাজকে একসূত্রে গ্রথিত ও একীভূত করার সাথে সম্পৃক্ত। খেলার মাঠে যদি নিজ দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয় বা পারস্পরিক সমঝোতা না থাকে তবে কখনও দল জয়লাভ করতে পারে না । এরূপ সমন্বয় সাধনের বিষয়টি নিশ্চিত করা ব্যবস্থাপনার অন্যতম কাজ।

৫. নিয়ন্ত্রণ (Controlling) :

নিয়ন্ত্রণ হলো ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ। পরিকল্পনার আলোকে প্রতিষ্ঠানের কার্যাদি সম্পন্ন হয়েছে কি না তা পরিমাপ, বিচ্যুতি ঘটলে তার কারণ নির্ণয়, বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ বলে । H. Fayol-এর মতে, “Controls involves whether anything occurs conformity of the plan, the instructions issued and principles established. “21 অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ হলো গৃহীত পরিকল্পনা, জারিকৃত নির্দেশনা ও প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী কার্য পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করা। উদাহরণস্বরূপ- কোনো প্রতিষ্ঠান বছরে ১০০০ একক পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ

করেছিল । কিন্তু বছর শেষে দেখা গেল ৮০০ একক পণ্য উৎপাদিত হয়েছে । অর্থাৎ কতটুকু পণ্য কম উৎপাদিত হলো তার পরিমাণ নির্ণয়, এর কারণ উদঘাটন ও উক্ত কারণ সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ নামে অভিহিত করা হয় । উপরোক্ত কার্যাবলি প্রকৃতিগতভাবে একে অন্যের অপেক্ষা ভিন্নতর হলেও মূল কাজসমূহ প্রত্যেকেই একে অপরের সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত একটি অবিরাম কার্য প্রক্রিয়া বা চক্রের নির্দেশ করে, যা নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্য প্রদর্শিত হলো :

 

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি বা ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া | ব্যবস্থাপনার পরিচিতি | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

উপসংহারে বলা যায়, বর্তমান বৃহদায়তন ব্যবসায় কর্মকাণ্ডের জগতে ব্যবস্থাপনার আওতা ও পর্যায় যেমনি বেড়েছে তেমনি এর কাজও বিস্তৃত হয়েছে। তাই ব্যবস্থাপনা বিশারদদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা মতভিন্নতা লক্ষ করা যায়। কর্মীসংস্থান কেউ কেউ সংগঠন কাজের মধ্যে দেখালেও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা গুরুত্ববহ হওয়ায় তা পৃথক কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে । একইভাবে প্রেষণাকে অনেকেই নির্দেশনা কাজের অন্তর্ভুক্ত করলেও তা পৃথক কাজ বিবেচিত হচ্ছে। তারপরও পরিকল্পনা, সংগঠন, নেতৃত্বদান ও নিয়ন্ত্রণ যে ব্যবস্থাপনার মুখ্য কাজ তা বলার অপেক্ষা রাখে না ।

Leave a Comment