আজকের আলোচনার বিযয় ব্যবস্থাপনায় মানবীয় উপাদান – যা প্রেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, ‘Management is getting things done through others’ – Rue ও Byars নামক লেখকদ্বয়ের এই বক্তব্য থেকেই ব্যবস্থাপনায় মানবীয় উপাদানের গুরুত্ব অনুমেয়। ব্যবস্থাপনার উপকরণসমূহ (6M) এর মধ্যে মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । কারণ সকল বস্তুগত উপাদানকে কাজে লাগায় মানুষ।
আবার মানবীয় উপাদানকেও মানুষই পরিচালনা করে । তাই আধুনিক ব্যবস্থাপনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মানুষ বা মানব সম্পদ । এই সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে ব্যবস্থাপকদের মানব প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা আবশ্যক ।
Table of Contents
ব্যবস্থাপনায় মানবীয় উপাদান

সেই সাথে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশ, সংগঠনের নিয়ম-নীতি ও সুযোগ-সুবিধা ব্যক্তিমনের ওপর কী প্রভাব বিস্তার করে সেই সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন । তার আলোকেই মানবীয় উপাদানের কার্যকর ব্যবহার করে একজন ব্যবস্থাপককে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয় । নিম্নে মানব প্রকৃতির কতিপয় ধারণা নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য (Differences between individuals):
প্রতিটা ব্যক্তি একে অন্য থেকে ভিন্ন । এই ভিন্নতা তার চেহারায়, চিন্তায় ও আচরণের সর্বত্রই । পূর্ববর্তী ধারণা-বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি মনোবল ও আচরণে এই পার্থক্য সৃষ্টি করে। কিছু বিষয়ে মিল লক্ষ করা গেলেও কোনো না কোনো পর্যায়ে যেয়ে মানব প্রকৃতিতে এই ভিন্নতা পরিস্ফুটিত হবেই।
মানুষের প্রত্যক্ষণ বা উপলব্ধিগত ভিন্নতা তার আচরণে পার্থক্য এনে দেয় । কেউ কাজকে, তার বকে, সহকর্মীকে একভাবে দেখে এবং অন্যজন ভিন্নভাবে দেখে । কেউ অল্পে তুষ্ট কেউ অনেক পেতে চায় । তাই এ পার্থক্যকে ভিন্নভাবে না নিয়ে সহজভাবে নেয়া এবং একে একটা সহনীয় মাত্রায় নিয়ে এসে চিন্তায় ও আচরণে সাযুজ্য (Unification) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সবাইকে লক্ষার্জনে কাজে লাগাতে পারার মধ্যেই ব্যবস্থাপকের কাজের স্বার্থকতা নিহিত ।
২. প্রতিটা মানুষ মর্যাদাবান (Every person is dignified) :
মানষ সৃষ্টির সেরা জীব। তাই সৃষ্টিগত কারণেই সে মর্যাদা প্রত্যাশী । কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রতিটা মানুষই নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবে । অন্যের নিকট থেকে সে তার অবস্থানে মর্যাদার প্রত্যাশা করে। অবজ্ঞা, অবহেলা, অন্যায়, অবিচার ইত্যাদিতে সে আহত হয়। অন্যদিকে কেউ তাকে সম্মান করলে, মর্যাদা দিলে সে উৎসাহিত হয় ।
মানুষ তার এই মর্যাদা উত্তরোত্তর বাড়ুক এটাও প্রত্যাশা করে । এ জন্য সে তার জ্ঞান, ক্ষমতা, সামর্থ্য ও আচরণগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতেও আগ্রহী থাকে। তাই ব্যবস্থাপকগণ যদি মানুষ চালাতে যেয়ে ভিতরে ও বাইরের প্রত্যেকের সাথে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করেন তবে সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট থেকে কাঙ্ক্ষিত আচরণ প্রত্যাশা করা যায় ।
৩. ব্যক্তিকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা (Consider an individual as a whole person) :
ব্যবস্থাপনায় মানবীয় উপাদান বিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ব্যক্তির কোনো একটা চিন্তা, কাজ, গুণ বা দক্ষতা, দোষ বা অযোগ্যতা বা জীবনের কোনো একটা দিক বিবেচনা না করে জীবনের সকল দিককে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা উচিত।
ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া, যোগ্যতা-অযোগ্যতা, ভালো-মন্দ, সংগঠন, পরিবার সবমিলিয়েই একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ । প্রতিষ্ঠানে একজন মানুষকে তার যোগ্যতা-অযোগ্যতা, সুবিধা-অসুবিধাসমেত নিয়োগ দেয়া হয়েছে-এটাই ব্যবস্থাপকদেরকে বুঝতে হবে । ব্যবস্থাপকদের কর্তব্য হলো ব্যক্তির ভালো গুণকে বিকশিত করা এবং দূর্বল দিকগুলো যথাসম্ভব দূর করে তাকে প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্য সম্পদে পরিণত করা ।
৪. ‘গড়-পড়তা মানুষ’ ধারণা যথার্থ নয় (‘Average person’ concept is not accurate) :
প্রতিটা জনশক্তির প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে একটা প্রতিষ্ঠানে পৃথক পৃথক নিয়ম-রীতি, পদ্ধতি, কর্মসূচি ও কার্যব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব নয় । একইভাবে সব মানুষকে একটা গড়-পড়তা হিসাবে ফেলে একই ধরনের মনে করাও সমর্থনযোগ্য হতে পারে না । অথচ দেখা যায় প্রতিষ্ঠানসমূহে যখন পদসংশ্লিষ্ট কাজ, দক্ষতা, যোগ্যতা, কর্তৃত্ব ইত্যাদি ডিজাইন করা হয় বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণ করা হয় তখন এই গড়-পড়তা ধারণা কাজ করে। অথচ ব্যবস্থাপকদের করণীয় হলো ‘সর্বোত্তম’কে টার্গেট বা উৎসাহিত করা। যাতে প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সবাই সেই টার্গেট অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে ।
৫. আচরণ প্রেষণানির্ভর (Behavior guided by motivation) :
মানুষ বস্তুগত কোনো উপকরণ নয় । তার মন আছে, সে ভাবে; বিবেক আছে সে বোধ করে। ধারণা, বিশ্বাস ও পারিপার্শ্বিকতা তার চিন্তা ও আচরণের একটা প্যার্টান তৈরি করলেও সে সচেতন । সম্ভাবনা দেখলে, নিজের জন্য ভালো কিছু প্রত্যক্ষ করলে, লাভ হবে বুঝতে পারলে সে তার প্রতি আকর্ষিত হয় ।
মনোজগতে এর প্রভাব তার আচরণেও প্রভাব ফেলে । সে অনিচ্ছাকে ইচ্ছায় পরিণত করে, নিরুৎসাহ কাটিয়ে উৎসাহের সাথে এগিয়ে যাওয়াকেই পছন্দ করে । তাই মানুষকে বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত করা গেলে তার আচরণেও ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি সম্ভব । ব্যবস্থাপকদেরকে মানব প্রকৃতির এ বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে নেয়া আবশ্যক ।
৬. অংশগ্রহণে ব্যক্তির আগ্রহ (Eagerness of individual for involvement) :
ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য থাকলেও ব্যক্তি কখনই একলা চলে না বা চলতে পারে না । এক সাথে মিলে-মিশে চলাই তার প্রকৃতি । পরিবারে, সমাজে, প্রতিষ্ঠানে সর্বত্রই সে নিজেকে এর সদস্য ভাবে। সবার সাথে একত্রে, যৌথ প্রচেষ্টায় সে অংশগ্রহণ করতে চায়, ভূমিকা রাখতে চায় ।
একটা প্রতিষ্ঠানে যেই পদমর্যাদায় সে কাজ করুক না কেন তার অবস্থানে থেকে সে প্রতিষ্ঠানের জন্য ভাবতে, পরামর্শ দিতে, নিজের তৎপরতা প্রদর্শন করতে আগ্রহী। সেজন্য সে ঊর্ধ্বতনের আগ্রহ ও উৎসাহের আশা করে। পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে সে সকল কাজে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের ভাব-মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চায়। তাই ব্যবস্থাপককে এ ধরনের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বারোপ করা উচিত।

৭. মানুষ উন্নয়ন প্রত্যাশী (Men deserved for development) :
প্রতিটা মানুষ উন্নয়ন প্রত্যাশী । সে তার বৈষয়িক ও মানসিক উন্নয়ন প্রত্যাশা করে। এ জন্য সে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতার উন্নয়ন ঘটাতে চায় । কার্যক্ষেত্রে সে সফলতার প্রত্যাশা করে। সে শিখতে চায়, অন্যের সাথে জ্ঞান ও যোগ্যতার আদান-প্রদান করতে চায় এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে সামর্থ্য বৃদ্ধির প্রত্যাশা করে। জনশক্তির এই প্রত্যাশা পূরণে যদি প্রতিষ্ঠান সুযোগ করে দেয় তবে জনশক্তির চিন্তা ও আচরণে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ।
