লক্ষ্যের প্রকৃতি বা প্রকারভেদ

লক্ষ্যের প্রকৃতি বা প্রকারভেদ নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই এর সকল কার্যাকার্য একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে সম্পাদিত হয় । প্রতিষ্ঠানের যেমনি একটি সার্বিক লক্ষ্য থাকে তেমনি তার আলোকে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অবস্থা অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে । তাই অবস্থানুযায়ী লক্ষ্যের প্রকৃতিতে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় । নিম্নে বিভিন্ন ধরনের লক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

লক্ষ্যের প্রকৃতি বা প্রকারভেদ

 

লক্ষ্যের প্রকৃতি বা প্রকারভেদ | পরিকল্পনা | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

১. উদ্দেশ্য (Objectives) :

যেকোনো কার্য সম্পাদনের পিছনে সম্পাদনকারীর একটা উদ্দেশ্য ক্রিয়াশীল থাকে । একটা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে কারও ইচ্ছা থাকে এর মাধ্যমে নিজের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করা । আবার কেউ এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে চায়। সমাজে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে। সমাজে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে। এই উদ্দেশ্যের আলোকেই সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।

ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্য বলতে কী বুঝাবে এ সম্পর্কে Terry ও Franklin বলেছেন, “A managerial objective is the intended goal that prescribes definite scope and suggests direction to the planning efforts of a manager. ” অর্থাৎ একটি ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্য হলো এর অভিপ্রেত লক্ষ্য যা একে নির্দিষ্ট কার্যপরিধি বলে দেয় এবং পরিকল্পনা কার্যক্রম কেমন হবে সে সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করে । Weinrich ও Koontz সহ অনেক লেখক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সমার্থক গণ্য করেছেন। আবার কেউ কেউ উদ্দেশ্যকে ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করেছেন এবং লক্ষ্যকে উদ্দেশ্যের সুস্পষ্ট অভিব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন ।

২. মিশন (Mission) :

মিশন লক্ষ্যের আরেকটি রূপ। মিশন ইংরেজি শব্দ । এর বাংলা অর্থ হলো ব্রত । একজন ধর্মপ্রচারক তার জীবনের একটি মিশন নিয়ে কাজ করে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানদানের মহান ব্রত বা মিশন নিয়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে খুবই সংকটাপন্ন অবস্থাতে ‘সুইসাইড মিশন’ পাঠানো হয় একটি বিশেষ লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে।

তাই মিশন শব্দটি লক্ষ্যের একটি সুস্পষ্ট রূপ। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মিশন হিসেবে গণ্য করা যায় । Weinrich ও Koontz তাদের লেখনীতে ব্রত (Mission) ও অভিপ্রায় (Purpose)-কে একই অর্থে ব্যবহার করেছে । লেখকদ্বয় বলেছেন, “The mission or purpose identifies the basic funciton or task of an enterprise or agency or any part of it. “66 অর্থাৎ মিশন বা অভিপ্রায় একটা প্রতিষ্ঠানের বা এর কোনো অংশের মৌল কাজকে চিহ্নিত করে ।

৩. সময় লক্ষ্য বা সময়সীমা (Deadline or time goals) :

সময় পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান । একটি কাজ কখন শুরু হবে এবং কখন শেষ হবে এটি নির্ধারণ করা না হলে পরিকল্পনা তৈরি করা যায় না বা ঐ পরিকল্পনার কোনো কার্যকারিতা থাকে না । জবাবদিহিতা করাও সম্ভব হয় না । তাই যেকোনো পরিকল্পনাতেই একটি সময়সীমা বা সময় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় । লক্ষ্য কতদিনে অর্জিত হবে পরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বে তা ঠিক করাকেই সময় লক্ষ্য বলা হয়ে থাকে । এরূপ সময় লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের স্তরভেদে, পরিকল্পনাভেদে বিভিন্ন রকমের হতে পারে।

 

৪, বাজেট (Budget) :

প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশিত ফলাফল যখন সংখ্যায় প্রকাশ করা হয় তখন তাকে বাজে বলে । Weihrich ও Koontz বলেছেন, “A budget is a statement of expected results expressed in numerical terms.”67অর্থাৎ বাজেট হলো প্রত্যাশিত ফলাফলের সংখ্যাত্মক প্রকাশ।

বাজেট বলতে সাধারণভাবে একটা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য আয়-ব্যয় বা প্রাপ্তি-প্রদানের আর্থিক অংককে বুঝানো হলেও অভিপ্রেত ফল যা আমরা ভবিষ্যতে অর্জন করতে চাই তার সংখ্যাত্মক যেকোনো প্রকাশকেই বাজেট নামে অভিহিত হয়। টীকা দান সম্প্রসারণ কর্মসূচির আওতায় এক বছরে কোন্ কোন্ এলাকায় সম্ভাব্য কতজন ছেলেমেয়েকে টীকা দেয়া হবে এর অগ্রিম প্রকাশকেও বাজেট বলা যায়।

একটা প্রতিষ্ঠানে বাজেট কেমন হতে পারে Terry ও Franklin বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন এভাবে-“A budget is a plan for income or outgo, or both of money, personnel, purchased items, sales items, or any other entity about which the manager believes determining the future course of action will assist in managerial effort. ” Bartol ও Martin সংগঠনের ওপর থেকে নিচের পর্যায়ে বিভিন্ন স্তরে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় তাকে নিম্নোক্ত তিন ভাগে ভাগ করেছেন :

১. স্ট্র্যাটীজিক লক্ষ্য (Strategic goal) :

প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন নির্বাহীগণ প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করে তাকে স্ট্র্যাটাজিক লক্ষ্য বলে। Bartol ও Martin বলেছেন, “ Strategic goals are broadly defined targets or future end results set by top management. “69 অর্থাৎ স্ট্র্যাটিজিক লক্ষ্য হলো বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত লক্ষ্যবস্তু বা ভবিষ্যৎ ফল যা ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করে। এরূপ লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটাকে স্ট্র্যাটাজিক লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা যায় ।

২. কৌশলগত লক্ষ্য (Tactical goal) :

প্রতিষ্ঠানের মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকগণ স্ট্র্যাটীজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করে তাকে কৌশলগত লক্ষ্য বলে । Bartol ও Martin বলেছেন, Tactical goals are target or future end results usually set by middle management for specific departments or units. “

অর্থাৎ কৌশলগত লক্ষ্য হলো সেই লক্ষ্যবস্তু বা ভবিষ্যত কর্মফল যা নির্দিষ্ট বিভাগ বা ব্যবসায় ইউনিটের জন্য মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকগণ নির্ধারণ করে। এরূপ লক্ষ্য অনেকটা পরিমাপযোগ্য প্রকৃতির হয় । যেমন উৎপাদন বিভাগ তিন বছরের মধ্যে শ্রম ঘণ্টার অপচয় শতকরা ৫০ ভাগ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে । এটা কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে গণ্য ।

 

লক্ষ্যের প্রকৃতি বা প্রকারভেদ | পরিকল্পনা | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

৩. কার্যসম্বন্ধীয় লক্ষ্য (Operational goal):

প্রতিষ্ঠানের নিচের পর্যায়ের উপ-বিভাগ বা কর্মকেন্দ্রগুলোতে কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যে সকল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় তাদেরকে কার্যসম্বন্ধীয় লক্ষ্য বলে । Bartol Martin, “Operational goals are targets or future end results set by lower management that address specific measurable outcomes required from the lower levels. “7অর্থাৎ কাৰ্যসম্বন্ধীয় লক্ষ্য হলো সেই লক্ষ্যবস্তু বা ভবিষ্যত কর্মফল যা নিম্ন পর্যায়ের ব্যবস্থাপকগণ তাদের পর্যায়ে থেকে যেই পরিমাণ নির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য ফলাফলের প্রত্যাশা করে ।

শ্রম ঘণ্টা অপচয় রোধ করার জন্য যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যেকোনো যন্ত্রপাতিতে ত্রুটি ধরা পড়ার সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টার মধ্যে তা মেরামত করা হবে। এটি কার্যসম্বন্ধীয় লক্ষ্যের একটি উদাহরণ ।

Leave a Comment