লক্ষ্যের সুবিধাসমূহ নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। সাগরবক্ষে লক্ষ্যহীন তরী যেমনি এক সময় হারিয়ে যায়, উদ্দেশ্যহীন জীবনের যেমন কোনো সার্থকতা নেই, লক্ষ্য ছাড়া কাজও তেমনি কখনও ভালো কিছু অর্জন করতে পারে না। লক্ষ্য ছাড়া পরিকল্পনা যেমনি নিরর্থক তেমনি পরিকল্পনা ছাড়া কাজ কার্যত কোনো ফল দিতে অক্ষম। তাই যেকোনো কাজ শুরুর পূর্বে লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । লক্ষ্য নির্ধারণ কার্যক্ষেত্রে একজন ব্যবস্থাপককে যে সকল সুবিধা প্রদান করতে পারে তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
লক্ষ্যের সুবিধাসমূহ

১. পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা (Assistance to planning) :
পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় । লক্ষ্য নির্ধারণের পর তা অর্জনের উপায় খুঁজতে গিয়েই তথ্য অনুসন্ধান, তথ্য বিশ্লেষণ, বিকল্প নির্ধারণ, বিকল্প মূল্যায়ন ইত্যাদি পদক্ষেপ গৃহীত হয় । তাই Ricky W. Griffin বলেন, “Effective goal setting promotes good planning.”76 অর্থাৎ ফলদায়ক লক্ষ্য নির্ধারণ উত্তম পরিকল্পনা প্রণয়নকে নিশ্চিত করে ।
২. কার্যক্ষেত্রে সংহতি প্রতিষ্ঠা (Integration in work) :
প্রতিষ্ঠানে যে দীর্ঘমেয়াদি রণনৈতিক পরিকল্পনা গৃহীত হয় তার আলোকে বিভাগীয় পর্যায়ে এবং আরো নিচের পর্যায়ে অধিলক্ষ্যসমূহ (Sub-goals) নির্ধারণ করে সেভাবে পরিকল্পনা প্রণীত হয় । এতে প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকাণ্ড মূল লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে। এতে কার্যক্ষেত্রে অধিক সংহতি অর্জন সম্ভব হয় ।
৩. সমরূপ দিক-নির্দেশনা দান (Provide uniform dirction) :
অধস্তন জনশক্তি যখন প্রতিষ্ঠানের বা বিভাগের লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে পারে তখন এরূপ জ্ঞান স্বাভাবিকভাবেই তাদের চিন্তা ও দৃষ্টিকে লক্ষ্যাভিমুখী করে তোলে । সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালনেও তারা মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করে । M. D. Richards বলেছেন, “Goal provide guidance and a unified direction for people in the organization. “77 অর্থাৎ লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের জনশক্তিকে চলতে শেখায় ও একক পথ নির্দেশনা প্রদান করে ।
৪. বিশৃঙ্খলা দূরীকরণ (Overcoming indiscipline) :
লক্ষ্যের আলোকে কাজ পরিচালনা করলে ঐ কাজ এককেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় । লক্ষ্য অর্জনের উপায় কী হতে পারে সেই চিন্তা ও কর্মই তখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় । সামগ্রিক লক্ষ্যের আলোকে বিভাগ ও উপ-বিভাগের লক্ষ্য নির্ণীত হওয়ায় কার্যক্ষেত্রে ভিন্নরূপ চিন্তা ও কর্মের কোনো অবকাশ থাকে না, সবাই লক্ষ্য অর্জনে তৎপর হওয়ায় কার্যক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দূরীভূত হয় ও উপায়-উপকরণের অপচয় হ্রাস পায়।
৫. প্রেষণা বৃদ্ধি (Increase motivation) :
লক্ষ্য নির্বাহী ও কর্মীদের মাঝে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে । নির্ধারিত লক্ষ্য যদি প্রতিষ্ঠানের ও সেই সঙ্গে সবার জন্য অধিক কল্যাণকর হবে বলে অধস্তনরা বুঝতে পারে বা লক্ষ্য যদি বাহ্যিক ক্ষেত্রে ও অভ্যন্তরীণভাবে প্রতিযোগিতামূলক (Challenging) হিসেবে দাঁড় করানো যায় তবে স্বাভাবিকভাবেই অধস্তনরা কার্যক্ষেত্রে উৎসাহ বোধ করে। এ ছাড়া লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে যদি পুরস্কার ও তিরস্কার (Reward)-এর বিষয় সংযুক্ত থাকে তবে তাও প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। S. Tully বলেছেন, “Goals that are specific and moderately difficult can motivate people to work harder. especially if attaining the goal is likely to result in rewards “78
৬. নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যায়নে সহায়তা (Assist in evaluation and control) :
লক্ষ্য কর্মফল মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও কার্যকর সহায়তা প্রদান করে । প্রতিষ্ঠানের সকল পরিকল্পনার মূলে একটি লক্ষ্য থাকে । তাই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা অর্জিত হচ্ছে, লক্ষ্যের আলোকেই তা মূল্যায়ন করা যায়। প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মপ্রচেষ্টাও লক্ষ্যকে ঘিরে আবর্তিত হয় । তাই এ প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রার অর্জনকে বিবেচনায় আনলে তা সহজেই ধরা পড়ে । ফলে বিচ্যুতি নিরূপণ করে সংশোধনীমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হয় ।

৭. অঙ্গীকার প্রতিষ্ঠা (Creation of commitment) :
যদি ঊর্ধ্বতনসহ প্রতিষ্ঠানে কার্যরত প্রত্যেকের মাঝে কোনো লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ে একটা দৃঢ় অঙ্গীকার (Commitment) গড়ে ওঠে তবে সবাই তা অর্জনকে তাদের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করে। তখন সেই লক্ষ্য অর্জনে যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতেও তারা কুণ্ঠাবো করে না । প্রতিষ্ঠানের যদি একটা লক্ষ্য বা আদর্শ নির্দিষ্ট থাকে এবং প্রতিষ্ঠানের সবাই যদি ঐ লক্ষ্য বা আদর্শকে নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করে তবে তাদের চিন্তা ও মন-মগজে এর প্রভাব পড়ে। দলীয় সবার মাঝে দলীয় প্রয়াস জোরদার হয় ও কর্ম পরিবেশের মান উন্নীত হয়।
