ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্টে শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় 

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় । এই পাঠটি “ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্টে” বিষয়ের “শ্রম ও শিল্প আইন” বিভাগের একটি পাঠ।

 

 শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উপায়

 

 শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় 

 

শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দুটি পথ আছে। তাদের মধ্যে একটি হল স্বেচ্ছামূলক পদ্ধতি এবং অপরটি হল বাধ্যতামূলক পদ্ধতি ।

 

১। স্বেচ্ছামূলক পদ্ধতি :

শিল্প-বিরোধের সাথে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যখন স্বেচ্ছায় বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী হয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন তাকে স্বেচ্ছামূলক বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি স্বেচ্ছামূলক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিম্নলিখিত উপায়গুলো অবলম্বন করা হয়ে থাকে।

(ক) যৌথ দরকষাকষি পদ্ধতি :

যৌথ দরকষাকষি পদ্ধতি একটি আইনসিদ্ধ সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এ পদ্ধতি অনুযায়ী বলে লে।বিরোধের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করে। উজ্জ পক্ষই খোলাখুলিভাবে একে অপরের সুবিধা-অসুবিধা ও সমস্যাবলি নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হয় । যৌথ দরকষাকষি পদ্ধতির মাধ্যমে একটি সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করে ।

(খ) আপস-রফা ও সন্ধি :

আপস-রফা ও সন্ধির পদ্ধতি হল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কোন তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বা সাহায্য ছাড়াই নিজেদের সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করে। এতে তৃতীয় হস্তক্ষেপ না থাকায় একে আপস-রফা বলা হয়ে থাকে।

(গ) মধ্যস্থতা :

এ পদ্ধতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কোন তৃতীয় পক্ষের সাহায্য গ্রহণ করে। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষই একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে আলোচনার সভাপতি নির্বাচনা করে। নিরপেক্ষ ব্যক্তি উভয় পক্ষের সমস্যাবলি বিষদভাবে আলাপ-আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখেন এবং পরিশেষে একটা গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করেন।

 

(ঘ) সালিশি :

সালিশি ব্যবস্থা প্রায় মধ্যস্থতা পদ্ধতির মতো। এ পদ্ধতির মাধ্যমেও একজন তৃতীয় ব্যক্তির সহায়তা গ্রহণ করা হয়। এখানে পার্থক্য হল তৃতীয় ব্যক্তি সালিশদার হিসেবে উপস্থিত থাকে এবং সালিশি রায়কে উভয় পক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে মেনে নিতে বাধ্য থাকে ।

 

২। বাধ্যতামূলক নিষ্পত্তি :

স্বেচ্ছামূলক নিষ্পত্তির চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার পর যখন বিরোধ নিষ্পত্তির আর কোন পন্থা থাকে না সেক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্দেশিত পন্থায় বিরোধ নিষ্পত্তির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। নিম্নে বাধ্যতামূলক নিষ্পত্তির পদ্ধতিগুলো সংক্ষেপে অলোচনা করা হল-

 

(ক) বাধ্যতামূলক সালিশি :

বাধ্যতামূলক সালিশি অনেকটা স্বেচ্ছামূলক সালিশি পদ্ধতির অনুরূপ। তবে এক্ষেত্রে পার্থক্য হল এ পর্যায়ে বিরোধের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সালিশির রায় মেনে নিতে বাধ্য করা হয়।

 

(খ) বাধ্যতামূলক তদন্ত :

সরকার প্রয়োজন মনে করলে কখনও কখনও শিল্প- বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক তদন্ত কমিশন নিয়োগ করতে পারে। সরকার কমিশনের রিপোর্টের বিরোধ নিষ্পত্তির ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করে ।

 

(গ) বাধ্যতামূলক দ্বিপক্ষীয় কমিটি :

সরকার পক্ষ থেকে যখন মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধির সমন্বয়ে দ্বিপক্ষীয় কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রদান করা হয় তখন তাকে বাধ্যতামূলক দ্বিপক্ষীয় কমিটি বলা হয়। এ কমিটিকে উভয় পক্ষের বিরোধ মীমাংসার ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

 

(ঘ) বিচার বিভাগীয় তদন্ত :

শিল্প- বিরোধের ক্ষেত্রে অনেক সময় শান্তিপূর্ণ সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পক্ষগুলো পরস্পরের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হয়। এ সংঘাত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। এ ধরনের জরুরি এবং জটিল অবস্থা নিরসনের নিমিত্তে সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি নিয়োগ করে । বিচার বিভাগীয় তদন্তের উপর ভিত্তি করে সরকার বা আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে ।

 

(ঙ) শ্রম আদালত :

শ্রম বিরোধ আইনের ধারা মতে শ্রম আদালত গঠন করা হয়ে থাকে। এটি শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ এবং সর্বশেষ পর্যায়। শ্রম আদালত প্রদত্ত রায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো মেনে নিতে বাধ্য থাকে। শ্রম আদালত বস্তুত একটি ত্রিপক্ষীয় বিচার পদ্ধতি। এতে একজন নিরপেক্ষ চেয়ারম্যান, মালিকপক্ষের একজন প্রতিনিধি ও একজন প্রতিনিধি থাকে।

(চ)শ্রম আদালত :

শ্রম আদালত সাবরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সূত্র বাধ্যতামূলক পদ্ধতিবিশেষ। ১৯৬৫ সালের শিল্প -বিরোধ আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী শ্রম আদালত গঠিত হয়।

 

(ছ) শ্রম আদালতের গঠনপ্রণালি (Formation of Labour Court)ঃ

১৯৬৯ সালের শিল্পসম্পর্ক অধ্যাদেশের ৩৬ ধারায় শ্রম আদালত গঠন সম্পর্কে বিধান প্রদত্ত হয়েছে। এ বিধান অনুযায়ী শ্রম আদালত গঠনে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা হয়ে থাকে-

১।সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রদানের মাধ্যমে শিল্পসংখ্যা বিবেচনায় যত সংখ্যক প্রয়োজন ততগুলো শ্রম আদালত গঠন করা যাবে।

২।কোথাও একাধিক শ্রম আদালত গঠিত হলে এই অধ্যাদেশের অধীনে এদের প্রত্যেকের ক্ষমতাভুক্ত এলাকা সরকারি গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশিত হবে। (ধারা ৩৫(১)]

৩।সরকার কর্তৃক নিযুক্ত একজন সভাপতি এবং তাদের পরামর্শ দানের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী দু’জন সদস্য নিযুক্ত হবেন। সদস্য দু’জনের মধ্যে একজন মালিকপক্ষের এবং অপরজন শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি থাকবে। [ধারা ৩৫(২)]

 

৪। সভাপতির যোগ্যতা :

কেবল হাইকোর্টের জজ বা অতিরিক্ত জজ বর্তমানে কর্মরত আছেন বা ছিলেন এ ধরনের লোকই শ্রম আদালতের সভাপতি হতে পারেন। [৩৫(৩) ধারা]

 

৫। সদস্য নিয়োগ :

নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুযায়ী মালিক পক্ষের ও শ্রমিক পক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সদস্যস্বয় 8 নিয়োগ করতে হবে। [ ধারা ৩৫(৪)]
শ্রম আদালত অস্ত্র অধ্যাদেশের ৩৫(৫) ধারায় বর্ণনা অনুযায়ী আদালতের নিকট আনীত বা প্রেরিত শিল্প-বিরোধের বিচার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

 

 শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় 

Leave a Comment