সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি বা সহায়তাকারী উপাদান এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” সিদ্ধান্ত গ্রহণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত- গ্রহণ হলো একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া-যে প্রক্রিয়াতে সিদ্ধান্তকারী অনেকগুলো অনুক্রমিক পর্যায়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্নভাবে অগ্রসর হন এবং কোনো সিদ্ধান্ত- গ্রহণ করেন ।
Table of Contents
সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি বা সহায়তাকারী উপাদান

এক্ষেত্রে কতকগুলো উপাদান সিদ্ধান্ত- গ্রহণকারীকে কার্যকর ও যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত- গ্রহণে সহায়তা করে । এসব উপাদানকে সিদ্ধান্ত -গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয় । নিম্নে সিদ্ধান্ত- গ্রহণের প্রধান ভিত্তি বা সহায়তাকারী উপাদানগুলো আলোচনা করা হলো:
১. বিচার ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা (Judgement and intuition)
: নির্বাহীকে অনেকগুলো কর্মপন্থা বা বিকল্প থেকে একটি সর্বোত্তম বা কাম্য কার্যধারা বাছাই করতে হয়। এরূপ বিকল্প নির্ধারণ ও উত্তম বিকল্প বাছাইয়ে একজন সিদ্ধান্তকারী তার বিচার ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করেন । W.D. Guth & R. Tagiuri-এর ভাষায়, “Judgement must be made regarding how current management values fit with the decision, the
Methics of dicision, and organization politics. ” 9 এ জন্যই বলা হয়ে থাকে যে, বিকল্পসমূহ মূল্যায়ন ও নির্বাচনে বিচার ক্ষমতাই হলো সিদ্ধান্ত -গ্রহণের প্রাথমিক ভিত্তি । অন্তদৃষ্টি দিয়ে কোনো বিষয়ে আগাম চিন্তা করার সামর্থ্যকেই মূলত প্রজ্ঞা বলে। একজন নির্বাহীর প্রজ্ঞা বা দূরদৃষ্টি সমস্যাটিকে সামগ্রিকভাবে দেখতে তাকে সহায়তা করে এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে সমস্যাটির সমাধান সম্ভব হবে সে ব্যাপারে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে সুন্দরতম সমাধানের পথ প্রশস্ত করে । ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতেও প্রজ্ঞা প্রত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। Carl R. Anderson-এর ভাষায়, “The most effective managers seem to be more intuitive. “
৩. সুসংবদ্ধ চিন্তা (Systematic thought) :
সিদ্ধান্ত- গ্রহণকারীর যুক্তিনির্ভর চিন্তা-ভাবনার ভিত্তি হলো সুসংবদ্ধ চিন্তা (Systematic thought)। এই গুণসম্পন্ন ব্যবস্থাপক প্রথমত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন এবং সে মোতাবেক সমস্যাটি সমাধানের প্রচেষ্টা চালান। নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সমাধানের জন্য সমস্যার বিশ্লেষণ করে একটি সমাধানের পন্থা নির্বাচন করাই সুসংবদ্ধ চিন্তাবিদ নির্বাহীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ।
৪. অভিজ্ঞতা (Experience) :
একজন নির্বাহীর বিচারক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা কিংবা সুসংবদ্ধ চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি। সবকিছু নির্ভর করে তার অভিজ্ঞতার ওপর। অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত -গ্রহণকারী তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোরে সমস্যাটিকে সুনির্দিষ্ট করে তার বাস্তবসম্মত সমাধান করতে সমর্থ হন । বিশেষত যেক্ষেত্রে সংখ্যাত্মক বিশ্লেষণ প্রায় অসম্ভব বা কষ্টসাধ্য সেক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানে নির্বাহীর অভিজ্ঞতাই বড় পুঁজি ।
৫. তথ্য (Information) :
সিদ্ধান্ত হলো ভবিষ্যৎ কার্যধারা নির্ধারণ। ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মোকাবিলায় পর্যাপ্ত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ কার্যধারা নির্ধারণ করতে হয়। এ কারণেই সিদ্ধান্ত নির্ভরযোগ্য ও তথ্যনির্ভর করার জন্য প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে সেভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন পড়ে ।
৬. ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব (Power and authority) :
সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একজন নির্বাহীর প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকা চাই । ক্ষমতা ও কর্তৃত্বহীন নির্বাহীর পক্ষে শুধুমাত্র সমস্যার চিহ্নিতকরণ পর্যন্তই সম্ভব, পরবর্তী কার্যধারা গ্রহণ সম্ভব হয় না। দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব দু’জন আলাদা নির্বাহীর হাতে ন্যস্ত থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জটিল আবর্তে পড়ে এবং পরিণতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি শ্লথ হয় ।
৭. অংশগ্রহণ ও কর্তৃত্বার্পণ (Participation and delegation) :
প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধস্তনদের অংশগ্রহণ এবং তাদের ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব অর্পণ করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যকর হয় । এতে অধীনস্থদের কাছ থেকে উত্তম কর্মপন্থার সন্ধান পাওয়া যায়। তাদের স্বীকৃতি ও কাজের প্রতি অঙ্গীকার (Commitment) বাড়ে এবং সর্বোপরি সমস্যার সহজতর সমাধান সম্ভব হয় ।
৮. সাংগঠনিক সংস্কৃতি (Organizational culture) :
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মীদের পারস্পরিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ, কর্মদর্শন ইত্যাদির সমষ্টিই হলো সাংগঠনিক সংস্কৃতি । সাংগঠনিক সংস্কৃতির প্রভাবে কর্মীদের মাঝে উচ্চমাত্রার কার্যমনোবল বিরাজ করে । এর দরুন প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানকল্পে গৃহীত কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সম্ভব হয় ।
৯. সিদ্ধান্ত গ্রহণ নৈপুণ্য (Decision skill) :
উচ্চমাত্রার কার্যফলাফল ও সাফল্যার্জনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তগ্রহণে নৈপুণ্য অর্জন করতে সমর্থ হয় যেগুলো তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কার্যকর ও সফল করে । সিদ্ধান্ত গ্রহণে নৈপুণ্যগুলো হলো-
ক) সহজ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ইস্যুতে সকলের দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ করা;
খ) ব্যবস্থাপনা দল (Team) যতদূর সম্ভব ছোট রাখা যাতে করে সবাই দায়িত্ব আঁকড়ে পড়ে থাকার চেয়ে বেশি বেশি কাজে মনোযোগী হতে বাধ্য হয়; এবং
গ) সংগঠনের প্রতিটি স্তরে কর্মীদের মাঝে শিল্প উদ্যোগী আচরণ সৃষ্টি করা যাতে করে সিদ্ধান্ত- গ্রহণে সবাই সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে পারে।

১০. সহযোগিতা (Cooperation) :
ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় অধস্তনদের ওপর। তাই ঊর্ধ্বতন ও অধস্তনের মাঝে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক না থাকলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। এজন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নির্বাহীকে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করার সচেষ্ট হয় ।
পরিশেষে বলা যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যেমন অনেকগুলো পদক্ষেপ জড়িত, তেমনি প্রতিটি পদক্ষেপে। যৌক্তিকতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার জন্য সহায়তাকারী এসব উপাদানকে ভিত্তি হিসেবে অবশ্যই গণ্য করতে হয়। তবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সাফল্যার্জন নিশ্চিত হতে পারে ।
