সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিবেচ্য বিষয়/ উপাদান এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” সিদ্ধান্ত গ্রহণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। সঠিক সিদ্ধান্ত- গ্রহণের ওপর প্রতিষ্ঠানের কার্যফলপ্রদতা ও লক্ষ্যার্জন নির্ভর করে । একজন ব্যবস্থাপক কতটা গ্রন্থ তাও এর দ্বারা প্রমাণিত হয়। তাই ব্যবস্থাপকগণ সিদ্ধান্ত -গ্রহণে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন এবং প্রয়োজনীয় বিবেচ্যসমূহ সতর্কভাবে বিবেচনার প্রয়াস পান । নিম্নে সিদ্ধান্ত -গ্রহণে প্রধান প্রধান বিবেচ্য বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো:
Table of Contents
সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিবেচ্য বিষয়/ উপাদান

১. সমস্যার প্রকৃতি (Nature of problem) :
সিদ্ধান্ত- গ্রহণ মানেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার বা প্রয়োজনের সর্বোত্তম সমাধানের পন্থা নির্বাচন করা । সমস্যার প্রকৃতির ওপর সমাধানের পন্থা নির্ভরশীল । এ কারণে সমস্যা কী ধরনের তা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয় । পিটার এফ. ড্রাকার প্রতিষ্ঠানের নিম্নোক্ত চার ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করেছেন : 10
ক) পৌনঃপুনিক সমস্যা (Recurring problems) :
যেসব সমস্যা নিয়মিত দেখা দেয় (Those that occur regularly) সেগুলো এ ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়ে। মজুত পণ্য সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত, কর্মী নিয়োগ, ছুটি বা অবকাশকালীন কারখানা বন্ধ, গ্রাহকদের অভিযোগ ইত্যাদি সমস্যা এর উদাহরণ ।
খ) ব্যবস্থাপকের জন্য ভিন্ন ধরনের কিন্তু পৌনঃপুনিক প্রকৃতি (Unique for the manager but recurring in nature) :
চাকরি পরিবর্তন, অন্য কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হওয়া, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মজুত ব্যবস্থাপনা চালু করা ইত্যাদি এ ধরনের সমস্যার উদাহরণ ।
গ) অনন্য বা ভিন্নধর্মী সমস্যা (Unique problem) :
কারখানা গৃহে অগ্নিকাণ্ড, ব্যাংকের দেউলিয়াত্ব, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ইত্যাদি সমস্যা এর আওতাধীন ।
ঘ) ভিন্নধর্মী সমস্যা যা পৌনঃপুনিক হতে পারে (A unique problem that will become recurring):
কোনো নতুন ব্যবস্থাপক সম্পর্কে কর্মচারীদের অভিযোগ, কারখানার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় ত্রুটি ইত্যাদি এ ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়ে । উল্লিখিত বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধানও ভিন্নরূপ হয়। তাই সমস্যার প্রকৃতি সর্বপ্রথম বিবেচনা করার প্রয়োজন পড়ে ।
২. ভবিষ্যৎ অবস্থা (Future condition) :
সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই ভবিষ্যৎ অবস্থা কিরূপ হবে তা বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হয় । সাধারণত তিন ধরনের ভবিষ্যৎ অবস্থা দেখা যায় যা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে । যা হলো নিশ্চয়তা (Certainty), ঝুঁকি (Risk) ও অনিশ্চয়তা (Uncertainty) । সীমাবদ্ধতা বা বেষ্টনী রয়েছে। সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে তার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান বা তথ্য থাকা সর্বাবস্থায় সম্ভব নয় ।
৩. সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা (Limitation of capacity) :
সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর যৌক্তিক আচরণের একটি তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে এটি মেনেই বিদ্যমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
৪. সুসংবদ্ধ চিন্তা ও পদ্ধতি (Systematic thought and practice) :
নির্বাহী বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে L McKensy & P. G. W. Keen এর মতে, “সুসংবদ্ধ চিত্তাকারী পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন, সমস্যা সমাধানে সুসংবদ্ধ ( Systematic) চিন্তা-ভাবনাকারী হিসেবে সমস্যাটিকে অত্যন্ত নিয়মসিদ্ধ পন্থায় বিশ্লেষণ করতে হয় । J. পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, ব্যবহৃত পদ্ধতিতে সমাধানের পন্থা ব্যাখ্যা করেন এবং সঠিকভাবে তা বিশ্লেষণ করেন “
৫. সিদ্ধান্তের লক্ষ্য নির্দিষ্টকরণ (Specifying the goal of decision) :
কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কতিপয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কিত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেসব লক্ষ্যের প্রতিফলন যাতে ঘটে তার ব্যবস্থা করতে হয় । এরূপ লক্ষ্য নির্ধারণে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ বিবেচ্য:
ক) সিদ্ধান্ত আলোকে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যার্জনকারী উপাদানের ওপর আলোকপাত;
খ) সকল স্তরের কর্মীরা যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারে তার ব্যবস্থাকরণ;
গ) প্রত্যেকটি স্তরে বড় ধরনের কোন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে অন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও
ঘ) সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থাকে সহজকরণ এবং ব্যবস্থাপকদের মাঝে পারস্পরিক আস্থা সৃষ্টি ।
৬. সহযোগিতা (Cooperation) :
সিদ্ধান্তের সফল বাস্তবায়নের জন্য অধীনস্থদের সহযোগিতা একান্ত আবশ্যক। তাই সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সহযোগিতা অর্জন করার জন্য ঐকমত্যভিত্তিক ও বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রধান্য দেয়া আবশ্যক।
৭. গ্রহণযোগ্যতা (Acceptability) :
সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট সিদ্ধান্ত -গ্রহণযোগ্য না হলে সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না । তাই বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ।
৮. পর্যাপ্ত সময় (Adequate time) :
ক্ষেত্রবিশেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তাই সিদ্ধান্ত -গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া দরকার। বিশেষত কর্মসূচিভিত্তিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া না গেলে সঠিক ও নির্ভুলভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় না ।
৯. নমনীয়তা (Flexibility) :
বর্তমান ব্যবসায় পরিস্থিতি অত্যন্ত গতিময় ও পরিবর্তনশীল । পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য সিদ্ধান্ত কর্মসূচি এমনভাবে নিতে হবে যাতে প্রয়োজনে তা পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা সম্ভব হয় ।

১০. আবেগ ও মানসিক চাপ (Emotion and stress) :
অধিকাংশ সিদ্ধান্ত পরিস্থিতির সঙ্গে ঝুঁকি বা অনিশ্চয়তা জড়িত থাকে । যা থেকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারীর মনে ভীতি বা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় আবেগ বা মানসিক চাপ বেড়ে গেলে স্বাভাবিক কার্যধারা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এ কারণে সিদ্ধান্তের ওপর আবেগ ও মানসিক চাপের প্রভাব কিরূপ হবে পূর্ব থেকেই তা বিবেচনা করা প্রয়োজন ।
উপরোক্ত উপাদানগুলো ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্ত -গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে । তাই সিদ্ধান্ত -গ্রহণকালে এসব বিষয়কে বিশেষভাবে বিবেচনায় আনতে হয় ।
