বাংলাদেশে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমস্যা বিষয়টি আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনার পরিচিতি” বিষয়ক পাঠের অংশ। মানব সভ্যতার উন্মেষের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা বিষয়ের উৎপত্তি ঘটলেও আধুনিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে অর্থাৎ শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় হতে শুরু হয় । উন্নত বিশ্বে ব্যবস্থাপনার তত্ত্বগত ও প্রায়োগিক উভয় দিকে যথেষ্ট উন্নতি ঘটলেও উন্নয়নকামী দেশসমূহে বিশেষত বাংলাদেশে ব্যবস্থাপনার কোনো দিকেরই বিশেষ কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। ফলে ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখানে এ পর্যন্ত বাস্তব অর্থে উপেক্ষিত। বাংলাদেশে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে সকল সমস্যা লক্ষণীয় তা নিম্নে তুলে ধরা হলো :
Table of Contents
বাংলাদেশে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমস্যা

১. প্রতিযোগীশীল উন্নত ব্যবসায় পরিবেশের অভাব (Lack of competitive business environment) :
আমাদের দেশের ব্যবসায় জগতে উন্নতির ছোঁয়া তেমন না লাগার কারণে এক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসায় পরিবেশ বিরাজ করে । ফলে ব্যবস্থাপনা তেমন দক্ষ না হওয়ার পরও এখানে স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসায় পরিচালনা করতে পারে। নতুন নতুন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠার কারণেই পুরাতন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যই এখানে বিরাজ করে। ফলে ব্যবস্থাপনা শাস্ত্রের বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি এখানে উপেক্ষিত ।
২. পেশা হিসেবে ব্যবস্থাপকের মর্যাদা দানের অভাব (Non-professionalisation of managers) :
উন্নত বিশ্বে ব্যবস্থাপনা পেশা হিসেবে অনেকটা মর্যাদা লাভ করলেও আমাদের দেশে এটি এখনও পেশা হিসেবে। স্বীকৃতি পায়নি । ফলে এ পেশায় এমন লোকেরা সহজেই প্রবেশ করে যাদের এ বিষয়ে কোনো প্রাথমিক জ্ঞানও নেই। তাদের পরিচালিত ব্যবস্থাপনা প্রায় ক্ষেত্রেই ‘হাতুড়ে’ বিষয়ে পরিণত হয়। যেটাও এ দেশে ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়নে একটি বড় সমস্যা।
৩. সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অভাব (Lack of associate institution) :
আমাদের দেশে ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে যে ধরনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা প্রয়োজন ছিল তারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (IBA) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (BIM) (পূর্বের BMDC), বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (BPTAC), কর্মী ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট (IPM), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM)-এর মতো কয়েকটা প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে এখানে ব্যবস্থাপক গড়ার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই । অবশ্য এ সকল প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও তেমন বিস্তৃত নয় । বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানদানের যে পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে তাও যথেষ্ট বলা যায় না ।
৪. দক্ষ ব্যবস্থাপকের অভাব (Lack of efficient managers) :
বাংলাদেশে দক্ষ ব্যবস্থাপকের তীব্র অভাব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয় । ফলে এক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি ও লোকদের উদ্বুদ্ধ করার মতো কিছু নজরে না পড়ার কারণেও জনগণ এ বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হয় । যাও বা ভালো উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপক রয়েছেন তাদের ভালো দিকগুলো মূলত তুলে ধরা হয় না । বরং বিরূপ প্রচারণা হয় বেশি। তাই দোষ-ত্রুটিমুক্ত একদল সৎ ও দক্ষ ব্যবস্থাপক যদি জনসমক্ষে প্রচারণা লাভের সুযোগ পেত তাহলে অনেকেই তা দেখে উদ্বুদ্ধ ও দক্ষতা অর্জনে তৎপর হতো।
৫. ব্যবস্থাপনা সম্পর্কীয় আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব (Absence of modern approaches toward management) :
আমাদের দেশের মালিক, ব্যবস্থাপক, শ্রমিক-কর্মচারী সবাই পুরাতন ও গতানুগতিক মানসিকতার অধিকারী । আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের অধিকাংশ ব্যবস্থাপকগণই সচেতন নন । যে কারণে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উদ্যম, উৎসাহ, দলীয় প্রচেষ্টা, নতুন চিন্তা-গবেষণা বাস্তব অর্থেই অনুপস্থিত । ফলে স্থবিরতা ও অদক্ষতা এ দেশের ব্যবস্থাপনার সর্বস্তরে বিরাজমান ।
৬. প্রশিক্ষণের অভাব (Lack of training facilities) :
আমাদের ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নের জন্য কোনো কার্যকর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। ক্ষেত্রবিশেষে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলেও তা কার্যত তেমন ফলপ্রদ নয় । তাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে উন্নতির কথা কেউ কেউ ভাবলেও প্রশিক্ষণের অভাবে তাদের পক্ষে এর সুষ্ঠু প্রয়োগ সম্ভব হয় না।
৭. যোগাযোগ ও তথ্য বিষয়ক সমস্যা (Communication and informational problem) :
আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠানের ভিতরে ও বাইরে যোগাযোগ ব্যবস্থা কাম্য মানের নয়। ভিতরে আমলাতান্ত্রিকতা বা অতিমাত্রায় আনুষ্ঠানিকতা চালু থাকায় কোনো বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না । বাইরের সঙ্গে যোগাযোগেও তেমন উন্নত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্য সংগ্রহ সে এক জটিল বিষয় । তথ্য ও পরিসংখ্যান যাও বা রয়েছে তাও নির্ভরযোগ্য নয় । তাই সবকিছু মিলিয়ে এখানে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ব্যবস্থাপকদের যোগাযোগ সংক্রান্ত নানান সমস্যায় পড়তে হয়।
৮. শ্রমিক-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের অভাব (Lack of labour management relations) :
আমাদের দেশের শিল্প কারখানাতে শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক কাম্য মানের নয়। অদক্ষ ও অশিক্ষিত শ্রমিক-কর্মচারী নিজের কল্যাণ সম্বন্ধে অসচেতন হওয়ার কারণে সস্তা রাজনৈতিক প্রলোভনে এবং তুচ্ছ ব্যাপারেই বিবাদে লিপ্ত হয়। ট্রেড ইউনিয়নের নামে আমাদের দেশে যা চলছে তাকে কোনোভাবেই ভালো কিছু বলা যায় না । বেসরকারি অধিকাংশ ৰাব নীতি (বাৰ, মার্কে.) –৫(ক)-F-5 প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয় তা অত্যন্ত দুঃখজনক । তাই সবকিছু মিলিয়ে এরূপ সম্পর্কে অভাবও ভালো ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটা অন্তরায় ।
৯. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা (Political instability) :
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আমাদের দেশে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রয়োগে আরেকটি বড় বাধা। স্বাধীনতা লাভের পর হতে এ পর্যন্ত কার্যত বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর এরূপ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মূলকেন্দ্র হলো শিক্ষাঙ্গন ও শিল্প এলাকা । এ ধরনের অবস্থায় মূলত ব্যবস্থাপকদের করার তেমন কিছু থাকে না । ফলে ব্যবস্থাপনা উৎসাহ হারায় এবং স্থবির ও অদক্ষ হয়ে পড়ে । রাজনৈতিক হানাহানি, হরতাল, ধর্মঘট ইত্যাদি অনেকক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মে বাধার সৃষ্টি করে ।

১০. সরকারের সহযোগিতার অভাব (Non co-operation by Government) :
ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু প্রয়োগে সরকারেরও ভূমিকা রয়েছে। আমাদের দেশে ঘন ঘন সরকারের নীতি পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ে অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ ও অযাচিত হস্তক্ষেপ অনেক সময় ব্যবস্থাপনার কাজকে বাধাগ্রস্ত করে। সকল স্তরের ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নের বিষয়টি সরকারের কাছে যেভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল এ দেশে তা কখনও পায়নি । ফলে ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সরকারের ভূমিকাও বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী ।
উপসংহারে বলা যায়, ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি না হলে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয় । পার্শ্ববর্তী যে সকল দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে তাদের দিকে তাকালেই দেখা যাবে সেখানে দক্ষ উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপকগণ কীভাবে সেই উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন । তাই তাদের সেই অভিজ্ঞতা সামনে নিয়ে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা দূরীকরণে এ দেশের সংশ্লিষ্ট সবাইকে যথাযোগ্য ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে ।
