পরিকল্পনার সাধারণ প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। পরিকল্পনা হলো ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের পূর্বনির্ধারিত প্রতিচ্ছবি । ব্যবস্থাপনা কার্য প্রক্রিয়ায়, পরিকল্পনা প্রথম ও প্রধান গুরুত্বপূর্ণ কাজ । এর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যা ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজ থেকে একে স্বতন্ত্র রূপ প্রদান করেছে । নিম্নে এর বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করা হলো
Table of Contents
পরিকল্পনার সাধারণ প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য

১. পরিকল্পনার প্রাথমিকতা ও মুখ্যতা (Primacy of planning) :
পরিকল্পনা হলো ব্যবস্থাপনার প্রথম ও মৌলিক কাজ । এটি অন্যান্য সকল কাজের ভিত্তিস্বরূপ । Trewatha ও Newport বলেছেন, “Planning is the fundamental and primary management function. It is considered to be the foundation for performance of a manager’s job. “8 কী করা হবে শুধুমাত্র এতটুকু ঠিক করাই পরিকল্পনা নয় । বরং কখন, কীভাবে, কার দ্বারা, কত সময়ে, কোন্ কাজ করানো হবে ইত্যাদি বিষয়ও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত । তাই সংগঠন, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, প্রেষণা, নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সকল কাজেই পরিকল্পনার অনুসরণ করা হয় ।
২. চিন্তন-মনন প্রক্রিয়া (Mental-thinking process) :
পরিকল্পনার বিষয়টি চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। যদিও পরিকল্পনা নিতে যেয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয় তথাপিও তথ্য সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্যই থাকে চিন্তাকে অধিক কার্যকর করে তোলা । এজন্য বলা হয়, “পরিকল্পনা হলো কাজ শুরুর পূর্বে চিন্তা-ভাবনার প্রক্রিয়া* (Process of thinking before doing)। তাই পরিকল্পনা কোনো শারীরিক বা বাহ্যিক (Physical) কাজ নয়। এটি চিন্তন-মনন প্রক্রিয়া ।
৩. ভবিষ্যৎ কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে অনুমান (Assumptions regarding future course of action) :
পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য হলো এটি সব সময়ই ভবিষ্যৎ অনুমানের সঙ্গে জড়িত । এ অনুমান শুধুমাত্র কী করা উচিত বা কী করলে লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় । বরং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশ কেমন থাকবে এবং গৃহীত পরিকল্পনা সে সকল পরিবেশের মধ্য দিয়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তাও অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকে । এটি একদিকে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিরূপণ করে এবং কীভাবে তা সম্পাদিত হবে তার পছাও বলে দেয় ।
৪. পরিকল্পনার উদ্দেশ্যমুখিতা (Goal-orientation of planning) :
পরিকল্পনা সব সময়ই একটি উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিরূপিত হয়। প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যের আলোকে প্রত্যেক বিভাগ ও উপবিভাগের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয় এবং তদনুযায়ী সকল ক্ষেত্রে পরিকল্পনা রচিত হয়ে থাকে । যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ১০% উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় তবে উক্ত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিক্রয় বৃদ্ধি, মেশিনের শ্রমঘণ্টার অপচয় হ্রাস বা যন্ত্রপাতি উন্নয়ন, প্রয়োজনে নতুন শ্রমিক-কর্মী নিয়োগ, অতিরিক্ত কাঁচামাল সংগ্রহ ইত্যাদি সকল বিষয়ে অতিরিক্ত পরিকল্পনা নেয়ার প্রয়োজন পড়ে ।
৫. পরিকল্পনার তথ্য নির্ভরশীলতা (Dependency of facts and information) :
অতীতকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎ চিন্তা করা যায় না । তাই পরিকল্পনা প্রণয়নে সব সময়ই অতীতে কী ঘটেছে তার মূল্যায়ন করতে হয় । এজন্য বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও তা বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে। শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ই নয় বাইরের বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকেও পরিকল্পনা প্রণয়নকালে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করার প্রয়োজন পড়ে । এতে পরিকল্পনার মান বৃদ্ধি পায় ।
৬. উত্তম বিকল্প (Best alternative) :
পরিকল্পনা বলতে উত্তম বিকল্প গ্রহণকে বুঝায় । উদ্দেশ্যার্জনে, একাধিক বিকল্প পন্থা অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে সকল বিকল্প পন্থাই পরিকল্পনা হিসেবে গণ্য হয় না। বিকল্পসমূহের মধ্য থেকে সবদিক বিচারে উত্তম বিকল্প গ্রহণই পরিকল্পনা হিসেবে গৃহীত হয় । ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাওয়ার একাধিক বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে । কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে একজন ব্যক্তি যে রুট বা ব্যবস্থাকে উত্তম মনে করে তাই পরিকল্পনার আওতায় আসে।
৭. পরিকল্পনার ব্যাপ্তি (Pervassiveness of planning) :
পরিকল্পনার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত থাকে। প্রতিষ্ঠানের উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত সকল বিভাগ ও উপবিভাগ পরিকল্পনার অধীনে কাজ করে। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই পরিকল্পনার অধীনে চলতে হয়। কোনো ব্যক্তি বা বিভাগ পরিকল্পনার বাইরে চললে তা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা যায় না । অবশ্য বিভিন্ন পর্যায়ে গৃহীত পরিকল্পনার ধরনে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
Trewatha ও Newport বলেন, “Every manager within an organization must plan. For top level, planning is generally broad, long range and quite creative in nature. For middle and supervisory positions, planning is much more routine and specialised. “9অর্থাৎ সংগঠনের প্রত্যেক ব্যবস্থাপককেই অবশ্যই পরিকল্পনা করতে হয়। উচ্চস্তরে পরিকল্পনা সাধারণত বিস্তৃত, দীর্ঘমেয়াদি এবং সৃজনশীল প্রকৃতির হয় । মধ্যম ও তত্ত্বাবধানকারী পর্যায়ের পরিকল্পনা হয় অধিকতর নৈমিত্তিক ও বিশেষায়িত প্রকৃতির ।

৮. নিরবচ্ছিন্নতা (Continuity) :
পরিকল্পনা একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। একটি পরিকল্পনার কার্যকারিতা হারানোর পূর্বে নতুন পরিকল্পনা গৃহীত হয়। আমাদের দেশে সরকার জুন মাসে পরবর্তী আর্থিক বছরের যে বাজেট পরিকল্পনা গ্রহণ করে, পরবর্তী নতুন আর্থিক বছর শুরু হওয়ার পূর্বেই সংসদে আবার নতুন বাজেট পাস করা হয় । প্রতিষ্ঠান যতদিন চলে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া এভাবে চলতে থাকে ।
