পরিকল্পনার সুবিধা এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। পরিকল্পনা প্রণয়ন ব্যবস্থাপনার অন্যতম মৌলিক কাজ যা অন্যান্য সমগ্র কার্য পরিচালনা ও বাস্তবায়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে । তাই একটি আদর্শ পরিকল্পনা থেকে নানাবিধ সুফল অর্জন করা সম্ভব । নিম্নে এর প্রধান প্রধান সুবিধাসমূহ আলোচনা করা হলো :
Table of Contents
পরিকল্পনার সুবিধা

১. সঠিক পথ নির্দেশনা (Proper guidance) :
পরিকল্পনালো ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের পূর্বনির্ধারিত নক্শা বা চিত্র। একটি কার্যকর পরিকল্পনা শুধুমাত্র কে, কোথায়, কখন, কোনো কাজ, কত সময়ে, কীভাবে করবে তারই দিক নির্দেশ করে না ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কার্যক্রম; যেমন- সংগঠন, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, প্রেষণা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও কার্যকর নির্দেশনা প্রদান করে। Terry ও Franklin বলেছেন, “Planning helps the manager to visualize future possibilities and to appraise key fields for possible participation”. 22 অর্থাৎ পরিকল্পনা একজন ব্যবস্থাপককে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য কী ঘটতে পারে তা অগ্রিম হৃদয়ঙ্গম করতে এবং সম্ভাব্য অংশগ্রহণের উত্তম ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে সাহায্য করে ।
২. ঝুঁকি হ্রাস (Minimization of risk) :
ব্যবসায়ের সঙ্গে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত । এই ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তাকে যতোটা সম্ভব কমিয়ে বা সঠিকভাবে মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার ওপরই ব্যবস্থাপনার সফলতা নির্ভর করে । আর এ কাজে কার্যকর পরিকল্পনা সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতে পারে। পরিকল্পন প্রণয়নের সময় এর প্রণেতাগণ ভবিষ্যৎ সুবিধা, অসুবিধা এবং ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা ইত্যাদি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে । এ ছাড়াও পূর্বানুমানে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে কী করা হবে তাও অনেক ক্ষেত্রে ঠি করে রাখে । ফলে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা অনেকাংশে হ্রাস পায় ।
৩. মিতব্যয়িতা অর্জন (Achieving economy) :
পরিকল্পনা মিতব্যয়িতা অর্জনে প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করে । এর ফলে প্রয়োজনীয় উপকরণ সুবিধাজনক ব্যয়ে ও যথাসময়ে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া প্রতিটা ক্ষেত্রে কম খরচে কার্য সম্পাদনের চেষ্টা করা হয়। অপ্রয়োজনীয় প্রয়াস ও প্রচেষ্টা রোধ করা যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানে মিতব্যয়িতা অর্জন সহজ হয়। Terry ও Franklin তাই বলেছেন, “Planning reduces random activity, overlapping effects and irrelevant actions. “23 অর্থাৎ পরিকল্পনা এলোমেলো কাজ, ফলবিহীন অতিরিক্ত কর্ম ও অপ্রাসঙ্গিক প্রচেষ্টাকে হ্রাস করে ।
৪. প্রেরণা সৃষ্টি (Creating inspiration) :
পরিকল্পনার সাহায্যে পূর্ব হতে প্রতিটা কার্যের লক্ষ্যস্থল নিরূপণ করে দেয়ার ফলে নির্বাহী ও কর্মীগণ সেই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাবার চেষ্টা করে। এ ছাড়া সুষ্ঠু পরিকল্পনার আওতায় কাজ করতে কর্মীরা উৎসাহিত হয় । ফলে তাদের কর্মশক্তির বিকাশ ঘটে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। Terry ও Franklin পরিকল্পনার এরূপ সুবিধার প্রতি আলোকপাত করে বলেন, “Proper planning helps a manager to provide confident and aggressive leadership”.অর্থাৎ সঠিক পরিকল্পনা একজন ব্যবস্থাপককে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টিতে ও দৃঢ় নেতৃত্বদানে সহায়তা করে ।
৫. ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা (Establishment of equilibrium) :
প্রতিষ্ঠানের সকল বিভাগ ও উপ-বিভাগের কাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এর উন্নয়নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় প্রতিষ্ঠানের সকল বিভাগ ও উপ-বিভাগকে সামনে রেখেই তা তৈরি করা হয়। চেষ্টা করা হয় সকল বিভাগ যাতে তাদের সামর্থ্যমতো কাজ পায় । পরিকল্পনা ছাড়া কাজ শুরু করলে তা এলোমেলো, অগোছালো ও খামখেয়ালিপূর্ণ হয়। ফলে ঊর্ধ্বতন সকল ক্ষেত্রে সমান নজর দিতে পারে না । কোনো বিভাগ বা উপ-বিভাগ কাজে ফাঁকি দেয় আবার কারও কাজের চাপ হয় অত্যধিক । ফলে সামগ্রিক কাজে বিশৃঙ্খলা ও অদক্ষতা বিরাজ করে । পরিকল্পনা সকল কাজে ভারসাম্য স্থাপন করে এগুলো দূর করতে সহায়তা করে ।
৬. নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা (Restoring order and discipline) :
পরিকল্পনার অধীনে প্রতিষ্ঠানের সকল কাজ সম্পাদিত হলে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে পরিকল্পনার অনুসরণ করলে সেই প্রতিষ্ঠানে কখনই বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে না । পরিকল্পনানুযায়ী যদি উপকরণাদিকে সংহত করে ও ক্রমধারা বজায় রেখে কাজ সম্পাদিত হয় সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশিমতো কাজ বাস্তবায়নের সুযোগ থাকে না । এছাড়া প্রতিষ্ঠানের নীতি ও পরিকল্পনা সবাই পূর্ব হতে জ্ঞাত থাকায় পারস্পরিক সমঝোতা, সহযোগিতা ও কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে তা অর্জনে সকলেই সচেষ্ট হয় । ফলে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।
৭. সম্পদের সদ্ব্যবহার (Utilization of resources) :
সুষ্ঠু পরিকল্পনা সংগঠনের সম্পদসমূহের সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করে । আদর্শ পরিকল্পনা প্রণীত হলে প্রতিষ্ঠানের জন্য শক্তি, অর্থ ও অন্যান্য সম্পদের কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। আর সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যার্জন ও উন্নয়ন নিশ্চিত করে। Terry ও Franklin, “Planning provides for a greater utilization of the available facilities of an enterprise.” অর্থাৎ পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য সকল সুযোগ-সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে ।
৮. নিয়ন্ত্রণের সুবিধা (Aid to controlling) :
পরিকল্পনা ব্যতীত ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ কার্য সঠিকভাবে সম্পাদিত হতে পারে না । কারণ পরিকল্পনা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণ মান বা ভিত্তি নির্ধারণ করে । ফলে ব্যবস্থাপকের পক্ষে নির্ধারিত মান ও প্রতিষ্ঠিত লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না তা দেখা ও তদনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। টেরি ও ফ্রাংকলিন এ বিষয়টা সামনে রেখেই বলেছেন, ” By means of planning, deadlines are determined for the start and completion of each activity and standard of performance are set. These serve as bases for controlling.
৯. ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজে সহায়তা (Assistance to other managerial functions) :
পরিকল্পনা শুধু নিয়ন্ত্রণ কাজের ভিত্তি হিসেবেই গণ্য হয় না, অন্যান্য কাজ; যেমন- সংগঠন, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, প্রেষণা ও সমন্বয় কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Trewatha ও Newport এ প্রসঙ্গেই বলেছেন, “It (Planning) Is considered the foundation for performance of a manager’s job. “অর্থাৎ পরিকল্পনা একজন ব্যবস্থাপকের কাজের ভিত্তিমূল হিসেবে বিবেচিত হয়।
একজন ব্যবস্থাপক যদি কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে এজন্য অবশ্যই তাকে উদ্দেশ্য নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য কার্যাবলি কী হবে তা নির্ধারণ করতে হয়। উপায়- উপকরণ কী লাগবে তাও ঠিক করতে হয় । কর্মীসংস্থানের কাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া এ কাজ সম্ভব হয় না । নির্দেশনা পরিকল্পনার আলোকেই নির্দিষ্ট করা হয়। সমন্বয় কাজেও পরিকল্পনা অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে ।
১০. সমস্যাদির দ্রুত সমাধান (Prompt solution of problems ) :
পরিকল্পনা প্রণয়নকালে ভবিষ্যত সুবিধা-অসুবিধা সম্বন্ধে ব্যাপক চিন্তা-ভাবনা করা হয়। ফলে সমস্যা কী কী হতে পারে ব্যবস্থাপক তা পূর্ব থেকেই আঁচ করতে পারেন। এ ছাড়া লক্ষ্যার্জনে বিকল্প কর্মসূচি নিয়েও আগে-ভাগে চিন্তা করা হয়। গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালে কী ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং সেক্ষেত্রে করণীয় কী হবে তাও একজন যোগ্য ব্যবস্থাপক পূর্বেই চিন্তা-ভাবনা করেন। তাই ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে পূর্ব চিন্তার আলোকে ঐ সমস্যার দ্রুত সমাধান করা যায়।

উপসংহারে বলা যায়, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে একে বাদ দিয়ে ব্যবস্থাপনার অন্য কোনো কাজই যথার্থ অর্থে সম্পাদন সম্ভব নয়। এটি শুধু অন্যান্য কাজের ভিত্তি হিসেবেই ব্যবস্থাপনাকে সহায়তা করে না প্রতিষ্ঠানকে তার লক্ষ্য অর্জনে ও এর সম্পদের কার্যকর ব্যবহারেও সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করে ।
