পরিকল্পনায় ফলপ্রদতা বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। পরিকল্পনার ফলপ্রদতা নির্ভর করে এটা বাস্তবে লক্ষ্যার্জনে কতটা ফল প্রদানে সক্ষম তার ওপর । Weihrich ও Koontz বলেছেন, “পরিকল্পনা এর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কতটা অর্জন করতে সক্ষম তার সঙ্গে পরিকল্পনার ফলপ্রদতা সম্পর্কযুক্ত ।
অন্যভাবে বলা যায়, পরিকল্পনার দক্ষতা এর উদ্দেশ্য অর্জনে কতটা অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে তার প্রকাশ করে, এরূপ অবদানের সঙ্গে পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নে নিয়োজিত ব্যয় ও অন্যান্য উপকরণও সম্পর্কিত কার্যকর পরিকল্পনার ওপর যেহেতু ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজের ফলপ্রদতা নির্ভরশীল তাই পরিকল্পনাকে কীভাবে ফলপ্রদ করা যায় যেকোনো বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানেই তা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ৷ পরিকল্পনায় ফলপ্রদতার উপায় অথবা এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়সমূহ বা নীতিমালা নিম্নে আলোচিত হলো :
Table of Contents
পরিকল্পনায় ফলপ্রদতা বৃদ্ধির উপায়

১. উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সঠিকভাবে বুঝে নেয়া (Clear understanding of the purpose and goal) :
পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের যে পর্যায়েই গৃহীত হোক না কেন তার সামনে একটা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকে। এরূপ উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না হলে কখনই কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্ভব হয় না। অবশ্য প্রতিষ্ঠানের একটা মূল লক্ষ্যের আলোকে বিভিন্ন বিভাগ ও উপ-বিভাগে অধি-লক্ষ্য (Sub-goal) নির্ধারণ করা হয় এবং পরিকল্পনা প্রণীত হয়। তাই বিভাগের ও সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য সঠিকভাবে বুঝে নেয়া কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ।
২. পরিকল্পনা সংগঠনের উন্নয়ন (Developing organization for planning) :
পরিকল্পনা সংগঠনের উন্নয়ন বলতে প্রতিষ্ঠানের কোন্ ধরনের পরিকল্পনা কোন্ পর্যায়ে কার দ্বারা প্রণীত হবে তা কার্যকরভাবে ঠিক করে ফেলাকে বুঝায় । যাতে দায়িত্বশীল ব্যক্তি তা বুঝে সেমতে সচেষ্ট হতে পারে। অবশ্য প্রতিষ্ঠানে আলাদা পরিকল্পনা বিভাগও খোলা যেতে পারে। পূর্ব থেকে এরূপ ঠিক করার ফলে অধস্তনরাও যথাস্থানে যথাযথ পরামর্শ দিতে পারে। এ ছাড়া পরিকল্পনার ত্রুটির জন্য সহজে জবাবদিহিতাও করা যায়। সেজন্য কার্যকর পরিকল্পনা তৈরিতে পরিকল্পনা সংগঠনের উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ।
৩. উপযুক্ত পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নির্বাচন (Selecting appropriate method and process) :
প্রতিষ্ঠানের কোন্ পর্যায়ের পরিকল্পনা প্রণয়নে কোন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহৃত হবে তা আগাম নির্ধারণ করাও পরিকল্পনার ফলপ্রদতা বৃদ্ধির একটি অন্যতম উপায় । অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তথ্য কীভাবে কোন্ কোন্ উৎস হতে সংগৃহীত হবে, বিকল্প নির্ধারণ ও তা কীভাবে মূল্যায়িত হবে, সময়কাল কতটুকু হবে, ইত্যাদি আগাম ঠিক করা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই পরিকল্পনার মান বৃদ্ধি পায়।
৪. পরিকল্পনার সঠিক আঙ্গিনা স্থাপন (Establishment of correct planning premises):
যে ভবিষ্যৎ পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্য দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে সেই সম্পর্কে পূর্বেই সঠিক ধারণা বা অঙ্গিনা প্রতিষ্ঠা কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরূপ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই পরিকল্পনা প্রণীত হয় । তাই এরূপ ধারণা বা পটভূমি প্রণয়নে ভুল হলে পরিকল্পনার কোনো কার্যকারিতা থাকে না। বরং তা উল্টো জটিলতার সৃষ্টি করে । তাই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক আঙ্গিনা স্থাপন করে সেভাবেই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা উচিত ।
৫. সময়ের ওপর যথাযথ গুরুত্বারোপ করা (Emphasizing on proper timing) :
পরিকল্পনার সঙ্গে সময়কালের বিষয়টা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিষ্ঠানের উপরের দিকে সাধারণত দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা নেয়া হয় । প্রতিষ্ঠানের নিচের দিকে পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদি হয়ে থাকে । তাই প্রতিষ্ঠানের কোন্ পর্যায়ে পরিকল্পনা কোন্ মেয়াদি হবে এটা সঠিকভাবে নির্ধারণও পরিকল্পনার ফলপ্রদতা বৃদ্ধি করে । এ ছাড়া কোন্ পরিকল্পনা কখন নিতে হবে এবং তা নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম কখন শুরু করতে হবে তাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ।
৬. যোগাযোগ রক্ষা ও অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি (Maintaining communication and creating facilities of participation) :
একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অধস্তনদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও যথাসম্ভব তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। পরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বে যারা এর বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা রাখবে তাদের সঙ্গে যদি যথাসম্ভব যোগাযোগ ও মতবিনিময় করা হয় তবে ঊর্ধ্বতন অনেক বিষয়ে বাস্তব ধারণা ও পরামর্শ পেতে পারে । এতে পরিকল্পনার মান ও ফলপ্রদতা বৃদ্ধির সুযোগ ঘটে ।
৭. সমতা বা মিল রক্ষা (Maintaining consistency) :
প্রতিষ্ঠানের একটা মূল লক্ষ্য ও পরিকল্পনাকে সামনে রেখে এর বিভিন্ন বিভাগ ও উপ-বিভাগে পরিকল্পনা গৃহীত হয় । এখন বিভাগ ও উপ-বিভাগের পরিকল্পনার মধ্যে যদি একটা মিল বা সমতা না থাকে তবে তা কখনই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সহায়ক হতে পারে না । ধরা যাক, উৎপাদন বিভাগ পরিকল্পনা নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে তারা যদি বিক্রয় বিভাগ, ক্রয় বিভাগ, অর্থ বিভাগ ইত্যাদি সমান্তরাল বিভাগগুলোর সঙ্গে মিল রেখে পরিকল্পনা তৈরি না করে তবে কখনই তা ফলপ্রদ পরিকল্পনা নয় ।
৮. গৃহীত পরিকল্পনার পুনঃপরীক্ষা ও হাল নাগাদ করা (Revising and updating of existing plan):
পরিকল্পনায় ফলপ্রদতা আনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো, বাস্তব অবস্থার আলোকে গৃহীত পরিকল্পনার কার্যকারিতা পুনঃপরীক্ষা এবং এতে যদি কোনো সংশোধনী আনতে হয় তা এনে পরিকল্পনাকে যথাসম্ভব বাস্তবমুখী ও কার্যকর করে তোলার ব্যবস্থা করা ।
অনেক প্রতিষ্ঠানেই একবার কোনো পরিকল্পনা গৃহীত হলে এতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয় না। ফলে গৃহীত পরিকল্পনা যখন বাস্তব সমস্যার কারণে কার্যক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়ে তখন এতে পরিবর্তন আনার কথা ভাবতে ভাবতেই ইতোমধ্যে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে যায় ।
Griffin এর অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন এভাবে যে, “Planning is not a panacea that will solve all of an organizational problems; nor should planning be considered an iron-clad set of procedures to be followed at any cost. And effective goals and planning do not necessarily ensure success; adjustments and exceptions are to be expected as time passes.
৯. উপযুক্ত পারিতোষিকের ব্যবস্থা (Arranging effective reward system) :
পরিকল্পনা গ্রহণ একটা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ । এ কাজে নানান বিষয় বিবেচনার প্রয়োজন পড়ে । বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, পটভূমি নির্ধারণ এবং সঠিক পূর্বানুমান করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ, যথাসময়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ ইত্যাদি নানান বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক, সুবিবেচনাপ্রসুত ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন কাজ বিবেচিত হয়। তাই কাজে নিয়োজিত ঊর্ধ্বতনদের উপযুক্ত পরিত্রামিক ও সুযোগ সুবিধা প্রদান করা আবশ্যক । এতে পরিকল্পনার ফলপ্রদতা বৃদ্ধি পায়।

১০. কার্য পরিবেশের উন্নয়ন (Developing working condition) :
কার্য পরিবেশ ভালো না হলে প্রতিষ্ঠানে ভালো পরিকল্পনা নেয়া সম্ভব হয় না । অধস্তনরা যদি যোগ্য হয়, তাদের মনোবল যদি উন্নত থাকে, প্রতিষ্ঠানের শিল্প সম্পর্কের মান যদি ভালো হয় তবে পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নে অধস্তনদের কাছ থেকে উপযুক্ত সাড়া পাওয়া যায়। পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হলে তা তারা সাদরে গ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামো, যন্ত্রপাতিসহ উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ যদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নে কার্যকর সমর্থন যোগাতে পারে সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই পরিকল্পনার ফলপ্রদতা বাড়ে ।
