পরিকল্পনার প্রকারভেদ

পরিকল্পনার প্রকারভেদ নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। পরিকল্পনাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা প্রকৃতপক্ষেই একটা জটিল বিষয় । কারণ বর্তমানকালে প্রতিষ্ঠানভেদে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন অবস্থায় নানান ধরনের পরিকল্পনা প্রণীত হতে দেখা যায় ।

Table of Contents

পরিকল্পনার প্রকারভেদ

শুধু তাই নয় প্রতিষ্ঠানের ভিতরের ও বাইরের বিভিন্ন অবস্থাকে মোকাবিলা করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয় । পরিকল্পনার ওপর বিভিন্ন দিকের প্রভাব বলতে যেয়ে G. R. Terry বলেছেন, “Every segment, nook and corner of about every type of enterprise and environmental factor has been subjected to planning to some degree. ” ব্যবস্থাপনা বিশারদগণ তাঁদের চিন্তা অনুযায়ী প্রধান প্রধান পরিকল্পনাকে নানাভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন । নিম্নে তার কতিপয় তুলে ধরা হলো :

 

পরিকল্পনার প্রকারভেদ | পরিকল্পনা | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

পরিকল্পনার প্রকারভেদ | পরিকল্পনা | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

পরিকল্পনাকে সাধারণভাবে বিভিন্ন ভিত্তিতে যে সকল ভাগে ভাগ করা যায় তা নিম্নের রেখাচিত্রের সাহায্যে তুলে ধরা হলো :

 

পরিকল্পনার প্রকারভেদ | পরিকল্পনা | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

উপরের রেখাচিত্রে বর্ণিত বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা নিম্নে আলোচনা করা হলো : 

ক) প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রেণীবিন্যাস (Classification according to nature) :

১. লক্ষ্য (Goal) :

পরিকল্পনার অভিপ্রেত ফলকে লক্ষ্য বলে । এরূপ অভিপ্রেত ফল বা লক্ষ্যার্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানের সকল উপায়-উপাদান ও কর্মপ্রচেষ্টাকে কাজে লাগানো হয় । কোনো প্রতিষ্ঠানে ১০% উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা এরূপ লক্ষ্যের একট উদাহরণ। সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি লক্ষ্য ঠিক করা হয় এবং তার আলোকে বিভিন্ন বিভাগ বা স্তরে অধি-লক্ষ্য (Sub-Goal) নির্ধারণ করা হয়।

Stoner ও অন্যরা এ সম্পর্কে বলেছেন, “Goal means the purpose that an organization strives to achieve. ” অর্থাৎ লক্ষ্য হলো এমন অভিপ্রায় যা অর্জনের জন্য একটা প্রতিষ্ঠান প্রচেষ্টা চালায়। পরিধি ও প্রকৃতি অনুযায়ী লক্ষ্যকে উদ্দেশ্য, মিশন, বাজেট, কোটা, টার্গেট ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয় ।

২. স্থায়ী পরিকল্পনা (Standing plan) :

কোনো পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানে একবার গৃহীত হওয়ার পর নতুন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ বা নতুন কোনো অবস্থা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তা বারবার প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হলে তাকে স্থায়ী পরিকল্পনা বলে । Rue ও Holland-এর মতে, “Standing plans are plans that providing ongoing guidance for performing recurring activities. 52 অর্থাৎ স্থায়ী পরিকল্পনা হলো সেই সকল পরিকল্পনা একই ধরনের বারে বারে সম্পাদনযোগ্য কাজের ক্ষেত্রে একই ধরনের চালু থাকা নির্দেশনা প্রদান করে । এরূপ পরিকল্পনা নিম্নোক্ত কয়েক ধরনের হতে পারে :

i) নীতি (Policy) :

কোনো কার্য সম্পাদনের সাধারণ প্রক্রিয়াকে নীতি বলে। কোনো প্রতিষ্ঠানে নগন বিক্রয়ের প্রথা বা জ্যেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে পদোন্নতি প্রদান এরূপ নীতির উদাহরণ ।

ii) প্রক্রিয়া (Procedure) :

নীতি বা উদ্দেশ্যের আলোকে কার্য সম্পাদনের জন্য নির্ধারিত ধারাবাহিক কর্মসমষ্টিকে প্রক্রিয়া বলে । কর্মী নির্বাচনের জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ হতে শুরু করে নিয়োগ দান পর্যন্ত কর্মসমষ্টিকে প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে ।

iii) পদ্ধতি (Method) :

প্রক্রিয়ার অধীনে নির্ধারিত প্রত্যেকটি কার্য সম্পাদনের জন্য গৃহীত কার্যক্রমকে পদ্ধতি বলা হয় । কর্মী নির্বাচনের জন্য লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ কীভাবে করা হবে এ সম্পর্কিত নিয়মকে পদ্ধতি বলা যায় ।

iv) নিয়ম-বিধি (Rules and regulations ) :

প্রতিষ্ঠানে কোন্ অবস্থায় কী করতে হবে এবং কোন্ কাজ করা যাবে না এ সম্পর্কে পূর্ব হতেই যে নিয়ম-বিধি নির্ধারণ করে রাখা হয় তাও এক ধরনের স্থায়ী পরিকল্পনা হিসেবে গণ্য হয় ।

৩. একার্থক পরিকল্পনা (Single-use plan ) :

যে পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানে পুনঃ পুনঃ ব্যবহৃত না হয়ে শুধুমাত্র একবার ব্যবহারের জন্য বা একটি মাত্র উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রণয়ন করা হয় তাকে একার্থক পরিকল্পনা বলে । Bartol ও Martin-এর মতে, “Single-use plans are plans aimed at achieving a specific goal that, once reached, will most likely not recur in the future. “অর্থাৎ একার্থক পরিকল্পনা হলো সেই সকল পরিকল্পনা যা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রণীত হয় এবং যা অর্জিত হলে ঐ ধরনের উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে অর্জনের প্রয়োজন সহসা আর ঘটে না।

প্রতিষ্ঠানে কিছু যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন মেরামত না করার কারণে যথেষ্ট শ্রম ঘণ্টার অপচয় হচ্ছে । এরূপ অপচয় একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য গৃহীত কর্মসূচি এরূপ পরিকল্পনার উদাহরণ । পদ্মা সেতু পরিকল্পনা ও একটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা একই কারণে একার্থক পরিকল্পনা হিসেবে গণ্য । নিম্নে এরূপ পরিকল্পনার শ্রেণীবিভাগ সংক্ষেপে আলোচিত হলো :

i) কর্মসূচি (Program) :

কোনো বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য একাধিক কর্ম সম্পাদনের প্রয়োজনে যে বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তাকে কর্মসূচি বলা হয়ে থাকে। কর্মসূচি সাধারণত মধ্যম বা দীর্ঘমেয়াদি হয় । একাধিক পর্যায়ে এটি বিভক্ত হতে পারে । একাধিক ছোট ছোট প্রকল্প বা কর্মসূচিতে এটা অনেক সময় ভাগ করা হয়। একাধিক পর্যায় বা ভাগে বিভক্ত এ সকল কর্মকাণ্ডের মধ্যে যথাযথ সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেয় ।

ii) প্রকল্প (Project) :

প্রকল্প হলো কর্মসূচির অধীন একটি বিশেষ কার্য সম্পাদনের পরিকল্পনা। পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে প্রতিষ্ঠানে শ্রম ঘণ্টার অপচয় হচ্ছে বিধায় তা নিবারণ কর্মসূচি নিলে তার মধ্যে পুরোনো যন্ত্রপাতির স্থলে নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, কারখানা গৃহ ও যন্ত্রপাতির নতুন বিন্যাস, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান এভাবে আলাদা আলাদা ছোট ছোট কর্ম পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে । এদের প্রত্যেকটিকে একটি প্রকল্প হিসেবে গণ্য করা যায়। 

খ) মেয়াদভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস (Classification according to the time period) :

১. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (Long-range plan) :

প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য পাঁচ বছর বা তদূর্ধ্ব সময়ের জন্য যে পরিকল্পনা নেয়া হয় তাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বলে। এরূপ পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন নির্বাহী বা সংস্থা (Body) কর্তৃক গ্রহণ করা হয় । Strategic plan সাধারণত এ ধরনের হয়ে থাকে । Griffin বলেছেন, “Long-range plan is a plan that covers many years, perhaps even decades : common long-range plans are for five years or more. ” অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো এমন পরিকল্পনা যা বেশ কয়েক বছর এমনকি দশ বছরব্যাপী হতে পারে। সাধারণভাবে এরূপ পরিকল্পনা পাঁচ বছর বা এর বেশি সময়ের জন্য হয়ে থাকে । 

২. মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা (Intermediate plan) :

এক বছর থেকে পাঁচ বছরের মধ্যবর্তী কোনো সময়ের জন্য পরিকল্পনা নেয়া হলে তাকে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা বলে । বড় বড় প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে সুবিধামতো উক্ত সময়ের জন্য পরিকল্পনা নেয়া হয়। Tactical plan-গুলো সাধারণত এ ধরনের হয়ে থাকে । অবশ্য বড় প্রতিষ্ঠানেও অনেক বিষয়ে এরূপ সময়ের জন্য পৃথক পরিকল্পনা নেয়া হতে পারে।

অবশ্য অনেক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি না করে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। যা সকল পরিকল্পনা ও কাজের মুখ্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে 55 Griffin এরূপ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, “Intermediate plan is a plan, that generally covers from one to five years. “56 অর্থাৎ মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হলো এমন পরিকল্পনা যা সাধারণভাবে একবছর থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি হয় ।

৩. স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা (Short-range plan) :

এক বছর বা তার কম সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠানে যে বা যে সকল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তাকে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বলে। এরূপ পরিকল্পনায় কী করতে হবে বলার চেয়ে কখন, কোথায়, কোন্ কাজ, কত সময়ে, কীভাবে সম্পাদন করতে হবে মূলত তার উল্লেখ থাকে । এরূপ পরিকল্পনাকে মূলত Operative plan বলা যায় । Griffin বলেন, “Short-range plan is a plan which has a time frame of one year or less. Short-range plans greatly affect the manager’s day to day activities.” ” তিনি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাকে নিম্নোক্ত দু’ভাগে ভাগ করেছেন :

ক) কর্ম পরিকল্পনা (Action plan) :

কর্ম পরিকল্পনা হলো কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গৃহীত পরিকল্পনা বিশেষ । একটা কোম্পানি অন্য একটা কোম্পানি কিনতে চায় । এখন কী শর্তে কীভাবে এটা কেনা যেতে পারে এর একটা প্রস্তাবনা বা পরিকল্পনা তৈরি করা হলে তাকে বলা হবে কর্ম পরিকল্পনা । প্রতিষ্ঠানে কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সাধারণভাবে যে সকল স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করা হয় তার প্রায় পুরোটাই কর্ম পরিকল্পনা । এরূপ পরিকল্পনা বিশদভাবে বর্ণিত হয়ে থাকে ।

খ) প্রতিক্রিয়ামূলক পরিকল্পনা (Reaction plan) :

এরূপ পরিকল্পনা সম্পর্কে Griffin বলেন, “Reaction plan is a plan designed to allow the company to react to an unforeseen circumstance”.58 অর্থাৎ প্রতিক্রিয়ামূলক পরিকল্পনা হলো এমন পরিকল্পনা যা কোনো কোম্পানি আগে থেকে ভাবতে না পারা কোনো অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি করে।

কর্ম পরিকল্পনায় প্রদত্ত উদাহরণে কোম্পানি ক্রয়ের যে প্রস্তাব অন্য কোম্পানির ঊর্ধ্বতনের কাছে প্রেরণ করা হচ্ছে সেক্ষেত্রে তারা এর পরিপ্রেক্ষিতে যে বা যে সকল প্রস্তাব রাখতে পারে সেই প্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করা হলে তাকে প্রতিক্রিয়ামূলক পরিকল্পনা বলা যায় । গ) সংগঠন কাঠামোভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস (Classification according to organizational level):

১. স্ট্র্যাটাজিক পরিকল্পনা (Strategic plan ) :

তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তমূলক কোনো পরিকল্পনা গ্রহণকে স্টাটীজিক পরিকল্পনা বলে। এক সময়ে স্ট্র্যাটানিক পরিকল্পনা বলতে শুধুমাত্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে কীভাবে প্রতিযোগীদের মোকাবিলা করে উদ্দেশ্য অর্জন করা যাবে এর কৌশল নির্ধারণকে বুঝানো হলেও বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য নির্ধারণ ও বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কী কী কাজ সম্পাদন করতে হবে তা নিরূপণ, এক্ষেত্রে উপকরণ কী লাগবে এবং তা কীভাবে সংগৃহীত হবে তা আগাম ঠিক করে ফেলাকে স্ট্র্যাটাজিক পরিকল্পনা (Strategic plan) নামে অভিহিত করা হয় ।

স্বাভাবিকভাবেই এরূপ পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্বাহীদের কর্তৃক দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনা সহযোগে প্রণীত হয়। এরূপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সংগঠনের নিচের স্তরে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে । 

২. কৌশলমূলক পরিকল্পনা (Tactical plan) :

স্ট্র্যাটাজিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য উচ্চ-মধ্য ও মধ্যম পর্যায়ের নির্বাহীগণ যে কৌশলপূর্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা নেয় তাকে কৌশলগত পরিকল্পনা বলে। যেক্ষেত্রে স্ট্র্যাটিজিক দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ ও পরিকল্পনা নেয়া হয় সেক্ষেত্রে তার এক একটি দিক বাস্তবায়নের জন্য উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ের নির্বাহীরা মিলে কৌশল নির্ধারণ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ।

Griffin এ সম্পর্কে বলেছেন, “Tactical plan is a plan aimed at achieving tactical goals and is developed to implement parts of a strategic plan. This plans typically involve upper and middle management and compared with strategic plans, have a somewhat shorter time horizon, and more a specific and concrete focus. “ধরা যাক, কোনো প্রতিষ্ঠানের স্ট্র্যাটাজিক পরিকল্পনার একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দশটি নতুন পণ্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যসারির অন্তর্ভুক্ত করা ।

এখন উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ের নির্বাহীগণ উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আগামী দুই বছরে তিনটি নতুন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা নিচ্ছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন না এনে কোন্ কোন্ ধরনের পণ্য এ সময়ে উৎপাদন করা সম্ভব, কোন্ ধরনের আইটেম আগে উৎপাদন করলে বাজারে প্রবেশ সহজ হবে, কোন্ কোন্ পণ্য উৎপাদন করা হলে নতুন লাইনে অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি বাজারে পরিচিতি আসবে- এ সকল বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যানুসন্ধান, বিচার-বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা অঙ্গন তৈরি ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন বিকল্প দাঁড় করিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয় ।

এগুলো বাজারে একত্রে না পর্যায়ক্রমে ছাড়া হবে ঠিক করতে হয়। এক্ষেত্রে উৎপাদন, বিপণন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যয় বা Input কী হবে, নির্দিষ্ট সময়ে আয় কেমন আসবে, ব্রেক ইভেন বিন্দু কী হবে, ন্যূনতম একটা পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য ব্যয় কেমন পড়বে ইত্যাকার বিষয় চিন্তা করে একটা পরিকল্পনা দাঁড় করতে হয় । একেই কৌশলগত (Tactical) পরিকল্পনা নামে অভিহিত করা যায় ।

৩. কার্যভিত্তিক পরিকল্পনা (Operational plan) :

কার্যসম্বন্ধীয় পরিকল্পনা হলো প্রতিষ্ঠানের নিম্ন-মধ্য ও নিম্নপর্যায়ের নির্বাহীদের প্রণীত পরিকল্পনা । কৌশলগত (Tactical) যে পরিকল্পনা উচ্চ-মধ্য ও মধ্যম পর্যায়ের নির্বাহীগণ কর্তৃক গৃহীত হয় তা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে যে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয় তাকেই কার্যসম্বন্ধীয় পরিকল্পনা বলে ।

Bartol ও Martin-এর মতে, “Operational plans are the means devised to support implementation of tactical plans and achievement of operational goals. These plans generally consider time frames of less than 1 year, such as few months, eeks, or even days. Plans at the operational level are usually developed by lower-level managers in consultation with ” middle manager. | Stoner ও অন্যরা এরূপ পরিকল্পনার প্রকৃতি সম্পর্কে বলেন, “Operational plan provide the details needed to incorporate strategic plans into the organizations day to day operations. “

ধরা যাক, Tactical plan অনুযায়ী দু’ বছরের মধ্যে যে নতুন পাঁচটি পণ্য উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সে অনুযায়ী উৎপাদন ব্যবস্থাপক এজন্য যন্ত্রপাতি কী লাগবে, যন্ত্রপাতি বিন্যাস কী হবে এ সংক্রান্ত বিষয়ে দু’ মাসের মধ্যে একটি পরিকল্পনার খসড়া পেশ করার জন্য প্রকৌশল বিভাগকে নির্দেশ দিল।

এরূপ পরিকল্পনা গৃহীত হওয়ার পর প্লান্ট ম্যানেজারকে ছয় মাসের মধ্যে নতুন যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, সংস্থাপন ও এজন্য প্রয়োজনীয় সকল কার্যব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হলো। এখন এ কাজে বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার দায় অধস্তন নির্বাহীদের ওপর অর্পণ করতে হবে। এরূপ সকল পরিকল্পনা কার্যসম্বন্ধীয় পরিকল্পনার উদাহরণ।

 

(ঘ) অবস্থান বা পরিধিকেন্দ্রিক শ্রেণীবিন্যাস (Classification according to position or scope) :

১. কর্মকেন্দ্রিক পরিকল্পনা (Working centre oriented plan) :

প্রতিষ্ঠানের নিচের পর্যায়ের নির্বাহীগণ তার বিভাগ সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পাদনের জন্য স্বল্পমেয়াদি যে পরিকল্পনা নেয় তাকে কর্মকেন্দ্রিক পরিকল্পনা বলে । একজন ফোরম্যান তার ইউনিটের জন্য সপ্তাহ বা মাসের পরিকল্পনা নেয়। এটাকে কর্মকেন্দ্রিক পরিকল্পনা বলা যায় । উপ-আঞ্চলিক একজন বিক্রয় কর্মকর্তা তার অঞ্চলের জন্য সপ্তাহের বা মাসের যে পরিকল্পনা নেয় তাকেও কর্মকেন্দ্রিক পরিকল্পনা বলা যেতে পারে ।

২. বিভাগীয় পরিকল্পনা (Departmental plan) :

কোনো বিভাগ একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার বিভাগের জন্য যে পরিকল্পনা তৈরি করে তাকে বিভাগীয় পরিকল্পনা বলে । উৎপাদন বিভাগের জন্য বা একজন যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপক তার বিভাগের জন্য যে পরিকল্পনা তৈরি করে তাকে বিভাগীয় পরিকল্পনা বলে । এভাবে বিক্রয় বিভাগ, ক্রয় বিভাগ, শ্রমিক-কর্মী বিভাগ, অর্থ বিভাগ তাদের বিভাগের জন্য পরিকল্পনা নেয় । এরূপ পরিকল্পনা সাধারণত এক মাস হতে ছয় মাস বা এক বছরের জন্য হতে পারে। এরূপ পরিকল্পনার অধীনেই কর্মকেন্দ্র (Working centre)-তে নিয়োজিত নির্বাহীগণ পরিকল্পনা নেয় ।

৩. আঞ্চলিক পরিকল্পনা (Regional plan) :

যে সকল প্রতিষ্ঠানের কাজ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত থাকে সেক্ষেত্রে প্রতিটা অঞ্চলের ব্যবস্থাপকগণ তাদের অঞ্চলের জন্য যে পরিকল্পনা নেয় তাকে আঞ্চলিক পরিকল্পনা বলে ।

৪. মহাপরিকল্পনা (Master plan) :

সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানের জন্য যে পরিকল্পনা নেয়া হয় তাকে মহাপরিকল্পনা বলে । এরূপ পরিকল্পনা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয় । প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এরূপ পরিকল্পনা তৈরি করে । অধস্তন প্রতিষ্ঠানের বা বিভাগসমূহের পরিকল্পনাকে একত্রিত করেও মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয় । বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিভাগীয় বাজেট সমন্বয়ে ‘মাস্টার বাজেট’ তৈরি এরূপ মহাপরিকল্পনার উদাহরণ ।

Leave a Comment