উদ্দেশ্য নির্ধারণে আদর্শ বা নীতিমালা

উদ্দেশ্য নির্ধারণে আদর্শ বা নীতিমালা নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” উদ্দেশ্য” বিষয়ক পাঠের অংশ। কোনো কার্যক্রমের মূলে যে প্রত্যাশা থাকে তাকেই উদ্দেশ্য বলে । তাই উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় যাতে উদ্দেশ্যার্জনের দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য, দক্ষতা ও নৈপুণ্য অর্জিত হয় ।

উদ্দেশ্য নির্ধারণে আদর্শ বা নীতিমালা

 

উদ্দেশ্য নির্ধারণে আদর্শ বা নীতিমালা | উদ্দেশ্য | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

Weinrich ও Koontz-4, “Clear and verifiable objectives facilitate management of the surplus as well as the effectiveness and efficiency of managerial actions.” 28 অর্থাৎ সুস্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য উদ্দেশ্য- উদ্বৃত্ত বা মুনাফার পরিমাণ নির্ধারণ এবং ব্যবস্থাপকীয় কার্যক্রমের দক্ষতা ও কার্যকারিতা নিরূপণকে সহজতর করে । এ কারণে উদ্দেশ্য যাতে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হয় তা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপকগণকে কিছু নীতি বা আদর্শ অনুসরণ করেন । এসব নীতি বা আদর্শ নিম্নে আলোচিত হলো:

১. গ্রহণযোগ্যতার নীতি : (Principle of acceptance) :

উদ্দেশ্যকে কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে উদ্দেশ্যকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। উদ্দেশ্যকে গ্রহণযোগ্য করার উপায় হলো সকলকে উদ্দেশ্য নির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে । এ ছাড়াও ঊর্ধ্বতন-অধস্তন সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ানো এবং অবাধ ও স্বচ্ছতাসম্পন্ন যোগাযোগ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে উদ্দেশ্যকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় ।

২, সুনির্দিষ্টতার নীতি (Principle of certainty) :

সুনির্দিষ্ট নীতির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- কী অর্জন করা হবে তা সংখ্যাত্মক বা গুণবাচক বৈশিষ্ট্যে এবং সম্পন্ন করার সময় মেয়াদের উল্লেখপূর্বক তা সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করতে হবে । গবেষণার দ্বারা এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে যে, সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কর্মীদের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জধর্মী হলেও তাতে অধিকতর ফলাফল অর্জিত হয় 129

৩. গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যার্জনের উপাদান নীতি (Principle of critical success factors) :

প্রাতিষ্ঠানিক যে কাজ বা পর্যায়ের জন্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হয় তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুখ্য সাফল্যার্জনকারী উপাদানগুলোকে বিবেচনা করা উচিত । কাজের সাফল্য নির্ধারক মানদণ্ডসমূহ উদ্দেশ্য বিবরণীতে উল্লেখ থাকলে কর্মীরা সেদিকে বিশেষ মনোযোগী হয় । উদাহরণস্বরূপ, কারখানায় উৎপাদনকালে প্রতি একক উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান, ওজন, আদর্শায়িত আকার ইত্যাদির ওপর জোর দেয়া হলে কর্মীরা উৎপাদনকালে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগী হতে পারে । ফলে কার্যকারিতা ও দক্ষতার সাথে উদ্দেশ্য অর্জন সহজ হয় ।

৪. ফলাবর্তনের নীতি (Principle of feedback) :

উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠায় ফলাবর্তনের নীতি অনুসরণ করা আবশ্যক । এ প্রসঙ্গে Carl R. Anderson-এর মন্তব্য, “The more feedback and review are available. the more likely it is that the goals will be reached.” 30 অর্থাৎ ফলাবর্তন আর পর্যালোচনা যতবেশি হবে উদ্দেশ্য অর্জনের সম্ভাবনাও তত বাড়বে। ফলাবর্তন নীতি অনুসরণ করা হলে উদ্দেশ্যার্জনের অগ্রগতি পরিমাপ করা যায়।

 

৫. পরিমাপযোগ্যতার নীতি (Principle of measurability) :

উদ্দেশ্যকে যাচাইযোগ্য (Verifiable) করার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো লক্ষ্য পরিমাপযোগ্য হতে হবে। পরিমাপযোগ্য উদ্দেশ্যের বৈশিষ্ট্য হলো- সংখ্যাত্মক কিংবা গুণবাচক বৈশিষ্ট্যে তা প্রকাশিত এবং সুনির্দিষ্ট সময় মেয়াদের মধ্যে তা সম্পন্ন করার সুস্পষ্ট নির্দেশিকা এতে থাকা আবশ্যক।

৬. বাস্তবতার নীতি (Principle of reality) :

উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠায় বাস্তবতার নীতি অনুসরণ করতে হবে। বাস্তবতার নীতি অনুযায়ী উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কিছুটা চ্যালেঞ্জধর্মী । তবে তা অর্জন কখনই খুব কষ্টসাধ্য হওয়া উচিত নয়ড্ড “Goals should be challenging but not too difficult.” প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান শক্তি, সামর্থ্য ও সম্পদরাজির আলোকে অর্জনযোগ্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা উচিত ।

৭. মিলকরণ নীতি (Matching principle) :

প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্য, আত্মবিশ্বাসের স্তর, সামর্থ্য, অভিজ্ঞতা, অভিপ্রায় (Motives), প্রতিযোগিতার মনোভাব, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মানসিকতা ইত্যাদির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা করতে হয় । কারণ উদ্দেশ্য যাদের দ্বারা বাস্তবায়িত হবে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা আর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে কখনই উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না ।

৮. অগ্রাধিকার নীতি (Principle of priority) :

একাধিক লক্ষ্য নিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য গঠিত । এ কারণে ব্যবস্থাপকগণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। একাধিক উদ্দেশ্যের বেলায় অগ্রাধিকার বিবেচনায় তাকে সাজানো যেতে পারে ।

৯. প্রাসঙ্গিকতার নীতি (Principle of relevancy) :

উদ্দেশ্যের বিষয়বস্তু প্রাসঙ্গিক হতে হবে। বার্টল ও মার্টিন-এর মতে, “Goals are more likely to elicit support when they are clearly relevant to the major work of the organization and the particular department or work unit. “এজন্য প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কাজের সাথে সঙ্গতি রেখে উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন । 

 

উদ্দেশ্য নির্ধারণে আদর্শ বা নীতিমালা | উদ্দেশ্য | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১০. সমন্বয়ের নীতি (Principle of co-ordination) :

উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠার সময় দেখতে হবে উদ্দেশ্য  অর্জনের ক্ষেত্রে এক বিভাগের ওপর অন্য বিভাগের নির্ভরশীলতা ও সহযোগিতার মাত্রা কতটা বেশি । পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মাত্রা বেশি হলে আন্তঃবিভাগীয় সম্পর্ক জোরদার করার জন্য সমন্বয় ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন । উপরোক্ত নীতি বা আদর্শসমূহ সঠিকভাবে অনুসৃত হলে প্রতিষ্ঠানের যেকোনো পর্যায়ের উদ্দেশ্য কার্যকর ও তা সহজে বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে থাকে ।

Leave a Comment