উদ্দেশ্যের স্তর বিন্যাস/ উদ্দেশ্যের জলপ্রপাত রীতি

উদ্দেশ্যের স্তর বিন্যাস/ উদ্দেশ্যের জলপ্রপাত রীতি নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” উদ্দেশ্য” বিষয়ক পাঠের অংশ। উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য নিরুপণের পর তার আলোকে ক্রমান্বয়ে নিম্নস্তরের প্রতিটা পর্যায়ের এমনকি ব্যক্তির জন্য উদ্দেশ্যসমূহ প্রতিষ্ঠা করা হলে উদ্দেশ্যের যে স্তরের সৃষ্টি হয় তাকে উদ্দেশ্যের জলপ্রপাত রীতি বলে ।

উদ্দেশ্যের স্তর বিন্যাস/ উদ্দেশ্যের জলপ্রপাত রীতি

Weinrich ও Koontz এর মতে, “Objectives form a hierarchy, ranging from the broad aim to individual objectives.” 34 প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায় কর্তৃক মুখ্য উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয় এবং ক্রমান্বয়ে নিম্নস্তরের দিকে মুখ্য উদ্দেশ্যের আলোকে বিভাগ, ইউনিট, দল এবং ব্যক্তিক পর্যায়ের উদ্দেশ্যসমূহ নির্ধারিত হয় । এভাবে উদ্দেশ্যের ক্রমাগত নিম্নমুখী বিন্যাস বা স্তরের সৃষ্টি হয়ে থাকে । নিম্নের চিত্রে উদ্দেশ্যের স্তরসমূহ প্রদর্শিত হলো :

 

উদ্দেশ্যের স্তর বিন্যাস/ উদ্দেশ্যের জলপ্রপাত রীতি  | উদ্দেশ্য | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

উপরের চিত্রে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উদ্দেশ্যের বিভিন্ন স্তর নিম্নে আলোচিত হলো : 

১. আর্থ-সামাজিক উদ্দেশ্য (Socio-economic objectives) :

সংগঠনের শীর্ষস্তরের উদ্দেশ্য হলো আর্থ- সামাজিক উদ্দেশ্য । যেমন-প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো যুক্তিসংগত মূল্যে পণ্য বা সেবা সরবরাহের মাধ্যমে জনসাধারণের কল্যাণ সাধন করা । এটি প্রতিষ্ঠানের সামাজিক উদ্দেশ্য।

২. মিশন (Mission) :

আর্থ-সামাজিক উদ্দেশ্যের আলোকে প্রতিষ্ঠানের মিশন নির্ধারিত হয় । যেমন-যাত্রী পরিবহন ব্যবসায়ে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের মিশন হলো যাত্রীসাধারণের জন্য পরিবহন সেবার ব্যবস্থা করা । আর্থ সামাজিক উদ্দেশ্য ও মিশনের মধ্যেকার প্রভেদ অত্যন্ত সূক্ষ্ম । তাই অনেকে এ দুটোকে সমার্থক হিসেবে গণ্য করেন।

৩. সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য (Total organizational objectives) :

আর্থ-সামাজিক উদ্দেশ্য ও মিশনকে বাস্তবায়ন করার জন্য সামগ্রিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগার লক্ষ্যসমূহ এ জাতীয় উদ্দেশ্যের অন্তর্গত । যেমন – কোনো পরিবহন যান তৈরি কোম্পানির সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য হলো নির্ভরযোগ্য, স্বল্প ব্যয় সম্পন্ন এবং জ্বালানী সাশ্রয়ী পরিবহন যান উৎপাদন ও বাজারজাত করা ।

 

৪. অধিকতর সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য (More specific organizational objectives) :

উদ্দেশ্য স্তরের পরবর্তী পর্যায় হলো অধিকতর সুস্পষ্ট সাংগঠনিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা। মুখ্য ফলাফল ক্ষেত্রে (Key result areas) অর্জনীয় লক্ষ্যসমূহ এ পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়। Peter F. Drucker নিম্নোক্ত মুখ্য ফলাফল ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন

i) বাজার অবস্থান (Market standing );

ii) উদ্ভাবন (Innovation);

iii) উৎপাদনশীলতা (Productivity);

iv) বস্তুগত ও আর্থিক সম্পদ (Physical and financial resources);

v) মুনাফাযোগ্যতা (Profitability);

vi) ব্যবস্থাপকদের কার্যফল ও উন্নয়ন (Management performance and development);

vii) কর্মীদের কার্যফল ও মনোভাব (Worker performance and attitude);

viii) গণ দায়-দায়িত্ব (Public responsibility)

এছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ দু’টি মুখ্য ফলাফল ক্ষেত্র হলো সেবা (Service) ও গুণগতমান (Quality) । Weihrich Koontz 43, “These are the areas in which performance is essential for the success of the enterprise.” 36 অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের জন্য এই ক্ষেত্রগুলোতে কার্যফল অর্জন করা জরুরি। 

৫. বিভাগীয় উদ্দেশ্য (Division objectives) :

মুখ্য কার্য ফলাফলের আলোকে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, বৃহৎ অটোমোবাইল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বাস, ট্রাক, অটোরিক্সা, মোটর কার ইত্যাদি প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে। 

৬. শাখা ও ইউনিটভিত্তিক উদ্দেশ্য (Department and unit objectives) :

প্রতিটি বিভাগের শাখা ও ইউনিটের স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়।

 

উদ্দেশ্যের স্তর বিন্যাস/ উদ্দেশ্যের জলপ্রপাত রীতি  | উদ্দেশ্য | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

৭. ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য (Individual objectives) :

প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রতিটি কর্মীর ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য থাকে যা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কর্মীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত হয় । সুনির্দিষ্ট কার্যফলাফল সম্পাদন এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও কর্মপথের উন্নয়ন সাধন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যের অন্তর্গত ।

উপরোক্ত সাতটি স্তরের উদ্দেশ্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পর্ষদ, শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহী, মধ্যম স্তরের ব্যবস্থাপক ও নিম্ন পর্যায়ের কর্মীদের ওপর ন্যস্ত; যেমন – পরিচালক পর্ষদ ও শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহীগণ প্রতিষ্ঠানের আর্থ-সামাজিক উদ্দেশ্য, মিশন, সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য ও অধিকতর সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করেন। আবার মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপক; যেমন বিপণন ব্যবস্থাপক কিংবা উৎপাদন ব্যবস্থাপক মুখ্য ফলাফল ক্ষেত্রের উদ্দেশ্য এবং, বিভাগীয় ও শাখাভিত্তিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন । নিম্ন পর্যায়ের ব্যবস্থাপকগণ ইউনিট ও উপ-ইউনিটসমূহের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন ।

Leave a Comment