যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” সিদ্ধান্ত গ্রহণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবস্থাপনার মৌলিক কাজ হলো সিদ্ধান্ত -গ্রহণ । সিদ্ধান্ত -গ্রহণ প্রক্রিয়াকেই অনেক লেখক বা তাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন। সিদ্ধান্ত -গ্রহণ বিষয়ে এরূপ ধারণা-এর গুরুত্ব বা তাৎপর্যকে স্পষ্টরূপে প্রকাশ করে। Stoner, Freeman & Gilbert (স্টুনার, ফ্রিম্যান ও গিলবার্ট)-এর ভাষায়, “কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান কিংবা কোনো সম্ভাবনার সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কার্যধারা চিহ্নিতকরণ ও নির্বাচন করা হলো সিদ্ধান্ত -গ্রহণ, যা প্রত্যেক ব্যবস্থাপকের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
Table of Contents
যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা

“(Decision making indentifying and selecting a course of action to deal with a specific problem or take advantage of an opportunity-is an important part of every manager’s job. ‘ “8 তাই সামগ্রিকভাবে ব্যবস্থাপনার সাফল্যার্জন বহুলাংশে দক্ষতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত -গ্রহণের ওপর নির্ভর করে। সিদ্ধান্ত -গ্রহণের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তার বিভিন্ন দিকগুলো নিম্নে আলোচিত হলো :
১. উপকরণাদির সুষ্ঠু ব্যবহার (Proper utilization of resources) :
ব্যবসায় সংগঠন উৎপাদনের জন্য আর্থিক সম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনসম্পদকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যার্জনের নিমিত্তে সংগ্রহ করে ও সেগুলোকে উৎপাদনে নিয়োজিত করে । সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে উপযুক্ত কার্যধারা চিহ্নিত করা হয় এবং তার বাস্তবায়নের বিস্তারিত পথনির্দেশও নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে । ফলে উৎপাদনের উপকরণাদির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হয় ।
২. উদ্দেশ্যার্জন (Objective achievment) :
সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তবসম্মত ও সঠিক কাজের গতিধারা নির্ধারিত হয় । সঠিক কার্যধারা নির্ধারণ সম্ভব হলে এর দ্বারা উপকরণাদির কার্যকর ব্যবহার করে উদ্দেশ্যার্জন সম্ভব হয়।
৩. দক্ষতা বৃদ্ধি (Enhancement of efficiency) :
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া একটি যৌক্তিক ও বাস্তবধর্মী মডেল যা ব্যবস্থাপককে সময়, মানবীয় আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক, যুক্তিশীলতা, সৃজনশীলতা, অতীত অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ ও সংবেদনশীল করে তোলে । এ কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার একজন নির্বাহীর বক্তিগত নৈপূণ্য ও দক্ষতা বাড়ে ও প্রাতিষ্ঠানিক ফলপ্রদতা বৃদ্ধি পায় ।
৪. সম্পর্কোন্নয়ন (Improvement of relation) :
ব্যবস্থাপনার সাফল্যার্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো শ্রমিক-মালিক তথা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত সকল পক্ষের মাঝে সোহার্দ্যপূর্ণ ও কার্যোপযোগী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা । সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে মত বিনিময়, পরামর্শ এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ফলে মানব সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে । যা উত্তম কার্যপরিবেশ নিশ্চিতকরণে সহায়তা করে ।
৫. সমস্যা সমাধান (Problem solving) :
প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় । যেকোনো সমস্যার কার্যকর সমাধানে সমস্যার সংজ্ঞায়ন, সমস্যার সম্ভ্যাব্য সমাধানসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং সর্বোত্তম বা কাম্য সমাধান কোনটি তা নির্বাচন করাই হলো এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য যথার্থ পন্থা । বস্তুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমেই সমস্যা সমাধানের এই পন্থা নির্ধারিত হয় ।
৬. সঠিক কার্যধারা অনুসরণ (Following the right course of action) :
সঠিক সিদ্ধান্ত ব্যবসায়িক কার্যকলাপের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা, কার্যক্রমের ধারাবাহিক অনুক্রম ও গন্তব্যের সীমা নির্দেশ করে । এর ফলে প্রতিষ্ঠানের সকল মানবীয়, বস্তুগত ও আর্থিক সম্পদকে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করা যায় । তাছাড়া এর ফলশ্রুতিতে ব্যবসায়ের কাম্য পরিবেশ বিরাজ করে ও একজন ব্যবস্থাপক উদ্দেশ্যাভিমুখী বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে সমর্থ হন ।
৭. ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ (Growth and expansion of business) .
প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মতো বিষয়গুলোকে যথাযথভাবে বিবেচনা করে। ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধান ও সম্ভাবনা কাজে লাগানোর মতো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে শেখায়। এর ফলে ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ ঘটে
৮. গতিশীলতা সৃষ্টি (Creation of dynamism) :
সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি নিয়মিত ও ব্যাপক বিস্তৃত ব্যবস্থাপকীয় কাজ। যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সকল কর্মকাণ্ডে উদ্যম ও গতিশীলতা বৃদ্ধি পায় ।
৯. নিয়মিত প্রশিক্ষণ (Regular training) :
দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন স্তরের নির্বাহী ও কর্মীদের অংশগ্রহণের দরুন অধীনস্থরা ব্যবস্থাপকীয় সমস্যা সমাধানের কলা-কৌশল রপ্ত করতে পারে । ফলে সকল স্তরের নির্বাহী ও কর্মী ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধান কাজের ক্ষেত্রে কার্যকর ও বাস্তবমুখী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয় ।

১০. তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য প্রদায়ী উপাদান চিহ্নিতকরণ (Identification of critical success factors):
কার্যকর সিদ্ধান্ত- গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অর্জনের পথে প্রধান প্রধান ভূমিকা পালনকারী উপাদানগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয় । ফলে ব্যবস্থাপকগণ তাদের সম্পদ, উপকরণ, সময় ও প্রয়াস সেসব চিহ্নিত ক্ষেত্রে বিনিয়োজিত করতে পারে ।
পরিশেষে বলা যায়, ব্যবস্থাপনার মুখ্য কাজই হলো সিদ্ধান্ত -গ্রহণ এবং স্টুনার, ফ্রিম্যান ও গিলবার্ট এর ভাষায়, “The art of decision making is central to management.” ব্যবস্থাপনার মুখ্য কর্ম ।
