ছোট ব্যবস্থাপনা পরিসরের অসুবিধা

ছোট ব্যবস্থাপনা পরিসরের অসুবিধা এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিসর ছোট রাখা হলে স্বাভাবিকভাবেই একজন নির্বাহীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে অধস্তনের সংখ্যা কম হয় । যে কারণে নির্বাহীর পক্ষে অধস্তনদের কাজে যথাযথ তত্ত্বাবধান করা সহজসাধ্য হয়ে থাকে । কিন্তু এরূপ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানে নির্বাহীর সংখ্যা ও স্তর বৃদ্ধি পায় । ফলে বেশ কিছু অসুবিধা প্রতিষ্ঠানে জন্ম নেয় । নিম্নে ব্যবস্থাপনা পরিসর ছোট রাখার অসুবিধা বা তত্ত্বাবধান পর্যায় ও নির্বাহীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিপক্ষে যুক্তিগুলো তুলে ধরা হলো:

 

ছোট ব্যবস্থাপনা পরিসরের অসুবিধা | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

ছোট ব্যবস্থাপনা পরিসরের অসুবিধা

১. যোগাযোগে অসুবিধা (Difficulties in communication) :

ব্যবস্থাপনা পরিসর ছোট হলে প্রতিষ্ঠানে নির্বাহীর সংখ্যা ও স্তর বৃদ্ধি পায়। ফলে সংগঠনের ওপর হতে নিচের পর্যায় পর্যন্ত দূরত্ব বাড়ে ও সে কারণে প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় সমস্যার সৃষ্টি হয়। শীর্ষ নির্বাহী কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে অধস্তন নির্বাহীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। একইভাবে কোনো পরিকল্পনা, নির্দেশ বা পরামর্শ নিচের স্তরে পাঠাতে হলেও তার পক্ষে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না; যা প্রতিষ্ঠানে সমস্যার সৃষ্টি করে । নিচে চিত্রের সাহায্য বিষয়টি তুলে ধরা হলো:

২. ব্যয় বৃদ্ধি (Increase of cost) :

ব্যবস্থাপনা পরিসর ছোট রাখার ফলে ব্যবস্থাপনা পর্যায় (Levels) বাড়ে ও সেই সঙ্গে অধিক সংখ্যক নির্বাহী নিয়োগের প্রয়োজন পড়ে। এ সকল নির্বাহীর জন্য বেতন, ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা যোগাড় করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। Weinrich ও Koontz এ সম্পর্কেই বলেছেন, “Levels are expensive. As they increase, more and more effort and money are devoted to managing, because of the additional managers, the staffs to assist them, and the necessity of coordinating departmental activities, plus the cost of facilities for the personnel. –

অর্থাৎ স্তরসমূহ ব্যয়বহুল কারণ স্তরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপক নিয়োগ, তাকে সহযোগিতা করার জন্য স্টাফ কর্মী নিয়োগ, বিভাগীয় কার্যক্রমে সমন্বয়সাধনের প্রয়োজন মেটানো এবং কর্মীদের জন্য সুযোগ- সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যয় নির্বাহ । আর এসব কিছুর জন্য অধিক শ্রম ও প্রয়াস এবং অর্থ বিনিয়োজিত করতে হয়।

৩. স্তরের বিপদ (Difficulties of hierarchy) :

প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পর্যায় ও সাংগঠনিক কাঠামোতে স্তরের সংখ্যা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই স্তরজনিত বিপত্তি দেখা দেয় । বিভিন্ন স্তরের নির্বাহীদের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা ও সমন্বয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। পরোক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের কারণে সংবাদ নিচের পর্যায়ে পৌঁছাতে যেমনি বিলম্ব হয় তেমনিভাবে নিচের পর্যায় হতে সংবাদ শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে আসতেও দেরি হয়। ফলে সিন্ধ গ্রহণ ও প্রেরণ বিলম্ব হয়।

এ ছাড়া একাধিক স্তর অতিক্রম করে যখন কোনো তথ্য বা সংবাদ কারও কাছে পৌঁছে। সেখানে তথ্যের বিকৃতি ঘটার সমূহ আশঙ্কা থাকে । এছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা নির্ধারণ ও বণ্টনেও জটিলতার সৃষ্টি হয় । ফলে কার্যক্ষেত্রে অনেক সময়ই বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় ।

 

৪. মনোবল হ্রাস (Reducing morale) :

ছোট তত্ত্বাবধান পরিসরের কারণে ব্যবস্থাপনার পর্যায় বা স্তরের। সংখ্যা বেড়ে যায় । ফলে শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহী এবং নিচের দিকে কর্মরত নির্বাহী ও কর্মীদের মধ্যকার অবস্থানগত দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। এতে সরাসরি শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাদের অভাব-অভিযোগ ও সুযোগ-সুবিধা বিষয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ থাকে না ।

কর্মীদের যে সকল অধস্তন নির্বাহীগণ পরিচালনা করেন তারা শুধু কাজ আদায়েরই চেষ্টা করেন অথচ কর্মীদের জন্য ভালো কিছু করার সুযোগ তাদের তেমনি থাকে না। ফলে অধস্তনদের মনোবল হ্রাস পায় । অন্যদিকে শীর্ষ নির্বাহী তার চিন্তা-চেতনা কার্যক্ষেত্রে সরাসরি বাস্তবায়ন করতে পারে না । যে কারণে তাকে অধস্তন নির্বাহীদের ওপর নির্ভর করতে হয় । তার কাজ নির্দিষ্ট সীমায় গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়ে । যা তার মনোবল হ্রাসেরও কারণ হয় ।

৫. অনমনীয়তার প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি (Creation of tendency towards inflexibility) :

নির্বাহী স্তরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে প্রতিষ্ঠানে অনমনীয়তার প্রতি ঝোঁক বৃদ্ধি পায় । কোনো ব্যবস্থাপনা পর্যায় সৃষ্টি করা হলে ও নির্বাহী নিয়োগ করা হলে পরবর্তীকালে ইচ্ছে করলেও সহজে ঐ পর্যায়টি একবারে অবলোপন বা নির্বাহীকে প্রতিষ্ঠান হতে বাদ দেওয়া যায় না । কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলেও বিলম্ব হয় । শীর্ষ নির্বাহীদের এজন্য অধস্তনদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের পরামর্শ ও প্রতিক্রিয়া বুঝতে বিলম্ব হয়। আবার সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়নে সময় নেয় । ফলে প্রতিষ্ঠানে অনমনীয়তার প্রতি ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ করা যায় ।

৬. সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা (Problem of co-ordination and control) :

প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে অর্থাৎ বিভাগ, উপবিভাগ ও প্রতিটি পর্যায়ে নির্বাহীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেকের কাজকে সমন্বিতভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয় ।

প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যের আলোকে ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থাৎ বিভাগে ও উপবিভাগে অধিলক্ষ্য (Sub-goal) নির্দিষ্টকরণ, পরিকল্পনা গ্রহণ ও কার্য পরিচালনাকালে স্বাভাবিক নিয়মেই কিছুটা বৈসাদৃশ্যের সৃষ্টি হতে পারে । এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের প্রতিটা পর্যায়ে কাজ সঠিকভাবে সম্পাদিত হচ্ছে কিনা শীর্ষ নির্বাহীর পক্ষে সবটা যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং সে অনুযায়ী যথাসময়ে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

 

ছোট ব্যবস্থাপনা পরিসরের অসুবিধা | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

৭. বিকেন্দ্রীকরণের কুফল (Demerits of decentralization) :

প্রতিষ্ঠানের নিচের পর্যায়ে বিভাগ- উপবিভাগ ও স্তরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সংগঠন কাঠামোতে সাধারণ নিয়মেই জটিলতার সৃষ্টি হয়। এতে কর্মকেন্দ্র (Working centre) -এর সঙ্গে শীর্ষ নির্বাহীর দূরত্ব সৃষ্টি হয় । ফলে কাজকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজন পড়ে । এর ফলে প্রতিষ্ঠানের ওপর ঊর্ধ্বতনদের কর্তৃত্ব হ্রাস পায়। অনেক সময় অযোগ্য অধস্তন নির্বাহী অতিমাত্রায় কর্তৃত্ব পায় যা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত হয়ে থাকে।

Leave a Comment