কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ধারণে বাধা সৃষ্টিকারী উপাদানসমূহ

কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ধারণে বাধা সৃষ্টিকারী উপাদানসমূহ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ণয় যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সেই সঙ্গে জটিল বিষয়। ইচ্ছে করলেই / একজন নির্বাহীর পক্ষে অনেক সংখ্যক অধস্তনের কাজ সুষ্ঠুভাবে তত্ত্বাবধান করা সম্ভব নয় । এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিক ও ব্যক্তিক নানা বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই বাধা সৃষ্টিকারী উপাদানগুলো বিবেচনায় এনেই একজন নির্বাহীর ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ধারণ করার প্রয়োজন পড়ে। কার্যকর তত্ত্বাবধান পরিসর নির্ণয়ে যে সকল উপাদান বাধার সৃষ্টি করে তা নিম্নে আলোচনা করা হলো :

কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ধারণে বাধা সৃষ্টিকারী উপাদানসমূহ

 

কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ধারণে বাধা সৃষ্টিকারী উপাদানসমূহ | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১. নির্বাহীর সময় ও সামর্থ্য (Time and ability of an executive) :

একজন নির্বাহী ইচ্ছে করলেই তার পুরো সময় অধস্তনদের কাজ তত্ত্বাবধানে ব্যয় করতে পারেন না। কারণ এরূপ তত্ত্বাবধানের বাইরেও একজন নির্বাহীর নানান ধরনের কাজ থাকে। এ ছাড়া সারাক্ষণ তত্ত্বাবধান করতে চাইলে নির্বাহীর ব্যক্তিগত সামর্থ্য ও শক্তি তা সমর্থন করবে এমন নয় । সামর্থ্যের বাইরে কাজ করতে গেলেই সেখানে নানান ধরনের ভুলভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক । আর এভাবে দীর্ঘদিন কাজ করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়

। অধ্যাপক নিউম্যান এ প্রসঙ্গেই বলেছেন, “Even if the executive is willing and able to devote long hours to his job, his nervous energy is limited. After a number of hours of concentrated his judgment is not so sharp, his patience gives out sooner, he evades tough issues, and acecpts sloppy work in the hope that it will get by. ” অর্থাৎ একজন নির্বাহী দীর্ঘক্ষণ কাজে সময় দিতে আগ্রহী হলেও তার স্নায়ুবিক শক্তির সীমাবদ্ধতার জন্য তা সম্ভব নয় । দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা একনাগাড়ে মনোযোগী হয়ে কাজ করার পর বিচারবুদ্ধি আর প্রখর থাকে না, ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে, ফলে সে কঠিন বিষয়গুলো পরিহার করে এবং সহজ ভেবে লঘু বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেয় ।

২. নির্বাহীর মানসিক শক্তি ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য (Mental capacity and personal adaptibility) :

প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত নির্বাহীদের মানসিক শক্তি ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যও এক ধরনের নয় । একইভাবে প্রতিষ্ঠানের একই স্তরে বা একজন তত্ত্বাবধায়কের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত অধস্তনরাও সমান আচরণ করে না । একই টেবিলে বসে কোনো কর্মী বৈদ্যুতিক পাখা জোরে চালালে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে আবার কেউ চাইবে পাখাটা আস্তে চলুক বা বন্ধ থাক । কেউ কাজের মধ্যে দু-চারবার একটু ঘোরাফেরা করতে পছন্দ করে । তাতে অন্যদের কী অসুবিধা হলো বা কাজে কী সমস্যা হলো তার তোয়াক্কা করে না ।

নির্বাহীদের কারো দেখা যাবে মানসিক শক্তি যথেষ্ট শক্তিশালী । কাজের ধকল ও অধস্তনদের বিরক্তি সহ্য করার মতো শক্তি তার মাঝে বিদ্যমান । আবার কেউ এতে ভেঙে পড়ে, মারাত্মক বিরক্তিবোধ করে । নির্বাহীদের মধ্যে অনেকেই থাকেন যারা তত্ত্বাবধানের কাজে যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন । আবার অনেকে নিজের মনে কাজ করতে ভালোবাসেন কিন্তু অন্যকে চালানোর বিষয়ে তেমন উৎসাহবোধ করেন না। কার্যক্ষেত্রে নির্বাহীদের মানসিক শক্তি ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের এই পার্থক্যও কার্যকর তত্ত্বাবধান পরিসর নির্ণয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ।

 

৩. জটিলতাপূর্ণ তত্ত্বাবধান পরিবেশ (Complex supervisory situation) :

তত্ত্বাবধান বলতে অধস্তনদের কাজ সরাসরি পর্যবেক্ষণ বা খোঁজ-খবর গ্রহণ, ভুল হলে সংশোধন, পরামর্শ ও উৎসাহদান, প্রয়োজনে ধমক প্রদান ইত্যাদিকে বুঝায় । এরূপ তত্ত্বাবধানে কার্য পরিবেশের জটিলতা সমস্যার সৃষ্টি করে এবং সেক্ষেত্রে তত্ত্বাবধান পরিসর বড় হতে পারে না । অধস্তনরা যদি একই স্থানে কাজ করে তবে তত্ত্বাবধান সহজ হয় কিন্তু যদি তারা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকে তবে সেক্ষত্রে ইচ্ছা করলেও অধিক সংখ্যক অধস্তনের কাজ তত্ত্বাবধান করা সম্ভব হয় না ।

অধ্যাপক নিউম্যান বলেছেন, “Good supervision requires current information, thought and personal attention to the subordinates and activities being directed. Such knowledge and attention is restricted not only by the executives time, energy, mental capacity and personal adaptability but also by the supervisory situation itself. “40 অর্থাৎ উত্তম তত্ত্বাবধানের জন্য চলতি তথ্যাবলি, চিন্তা-ভাবনা, অধস্তন কর্মীদের প্রতি ও যে কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে সেই কাজের প্রতি নির্বাহীর ব্যক্তিগত মনোযোগ অপরিহার্য বিবেচিত হয় । এরূপ জ্ঞান ও মনোযোগ শুধুমাত্র নির্বাহীর সময়, সামর্থ্য, মানসিক শক্তি ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের দ্বারাই বাধাগ্রস্ত হয় না তা তত্ত্বাবধায়িত কার্য পরিবেশের দ্বারাও বাধাগ্রস্ত হয় ।

৪. কাজের প্রকৃতি (Nature of activities) :

কোনো প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ ও উপবিভাগে ধরনও এক রকমের নয়। কোথাও দেখা যায় কাজ সহজ প্রকৃতির; আবার কোথাও কাজ জটিল ধরনের। কাজ সহজ হলে অধস্তনরা ভুল কম করে; আবার কাজ জটিল হলে সেখানে ভুল বেশি হয়। ফলে ঊর্ধ্বতনকে অধস্তনের কাজ তত্ত্বাবধানে অধিক সময় ব্যয় ও মনোযোগ প্রদান করতে হয় ।

কোথাও কাজ দেখা যায় বিশেষজ্ঞ প্রকৃতি আবার কোথাও কাজ সাদা-মাঠা ধরনের । উৎপাদন বিভাগের সকল প্রক্রিয়ার বা সকল বিভাগের কাজ যেমনি এক ধরনের নয় তেমনি উৎপাদন বিভাগ, বিক্রয় বিভাগ, মেরামত বিভাগ ইত্যাদি প্রত্যেক বিভাগের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান । কাজের এরূপ ভিন্নতার কারণে নির্বাহীদের কাজের পরিসর কী হবে তা নির্ণয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয় । 

 

কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ধারণে বাধা সৃষ্টিকারী উপাদানসমূহ | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

৫. অধস্তনদের মান (Qualities of subordinates) :

প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মী বা অধস্তনদের মানও সর্বস্ত একই ধরনের নয় । এরূপ মান কর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, কাজের প্রতি আগ্রহ, একাগ্রতা নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। একই জায়গায় একই নির্বাহীর অধীনে কর্মরত কর্মীদের মধ্যে যেমনি মানগত ভিন্নতা থাকে তেমনি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োজিত কর্মী ও নির্বাহীদের মানেও ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় । তাই একজন নির্বাহীর তত্ত্বাবধান পরিসর কি হবে কর্মীর মান বিবেচনায়ও সহজে তা বলে দেওয়া যায় না । অর্থাৎ অধস্তনদের মানগত ভিন্নতাও ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ণয়ে সমসার সৃষ্টি করে ।

Leave a Comment