কাম্য ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ণয়ের গুরুত্ব এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। নিয়োজিত বিভিন্ন উপায়-উপাদান বিশেষত মানব শক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার ও ফলপ্রদতা নির্ভরশীল। তাই কাম্য তত্ত্বাবধান পরিসর নির্ধারণ যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব নিয়ে উল্লেখ করা হলো :
Table of Contents
কাম্য ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ণয়ের গুরুত্ব

১. নির্বাহীর শক্তি ও সামর্থ্যের কার্যকর ব্যবহার (Proper utilization of executive’s energy and ability) :
নির্বাহীর শক্তি ও সামর্থ্যের কার্যকর ব্যবহারের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক ফলপ্রদতা বিশেষভাবে নির্ভর নির্বাহী কর্মভারগ্রস্ত হলে একদিকে তার পক্ষে যেমনি সুষ্ঠু তত্ত্বাবধানসহ অন্যান্য কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সমূহ হয় না; অন্যদিকে পরিসর ছোট হলে তার শক্তি-সামর্থ্য বাস্তবপক্ষে অব্যবহৃত থাকে । তাই তত্ত্বাবধান পরিসং অবশ্যই কাম্য হওয়া উচিত করে।
২. কার্যকর তত্ত্বাবধান (Effective supervision) :
সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান অধস্তনদের যোগ্যতার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে । পরিসর বড় হলে যেমনি কর্মীরা যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাবে ফাঁকিবাজির সুযোগ পায়; অপরপক্ষে পরিসর ছোট হলে কার্যক্ষেত্রে অধিক মাত্রায় ঊর্ধ্বতনের হস্তক্ষেপ তাদের অযথা বিব্রত করে। ফলে তাদের মনোবলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে । সে জন্যও তত্ত্বাবধান পরিসর কাম্য থাকা উচিত ।
৩. সুষ্ঠু যোগাযোগ (Effective communication) :
কাম্য ব্যবস্থাপনা পরিসর কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । তত্ত্বাবধান পরিসর ছোট হলে প্রতিষ্ঠানে স্তরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় । ফলে ওপর হতে নিচের দিকে বা নিচ হতে ওপর দিকে যোগাযোগে বিলম্ব হয় । এ ছাড়া যোগাযোগক্ষেত্রে তথ্য বিকৃতি, ভুল ব্যাখ্যা ইত্যাদি নানান সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে । এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সমস্যা হয় । অন্যদিকে তত্ত্বাবধান পরিসর বড় হলে স্তরের সংখ্যা কমায় ওপর হতে নিচে এবং নিচ হতে উপরে যোগাযোগ সহজ হলেও একজন নির্বাহীর পক্ষে অধস্তন সবার সঙ্গে সঠিকভাবে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা ও তত্ত্বাবধানে সমস্যা দেখা দেয় ।
৪. সহজ সমন্বয় (Easy co-ordination) :
কার্য সমন্বয়ের ওপরও কাম্য ব্যবস্থাপনা পরিসরের প্রভাব লক্ষণীয় । তত্ত্বাবধান পরিসর ছোট হলে প্রতিষ্ঠানে স্তরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় । স্বাভাবিকভাবেই যোগাযোগে সমস্যা | দেখা দেয়। ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন নির্বাহীদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় কাজের খোঁজখবর গ্রহণ এবং সমন্বয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয় । একই স্তরে, বিভাগ বা উপবিভাগের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও সমন্বয়ে সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে তত্ত্বাবধান পরিসর বড় হলে বাহ্যিকভাবে সমন্বয় সহজ মনে হলেও পরিসরের অভ্যন্তরেই সমন্বয়ের অভাব দেখা দিতে পারে । তাই কাম্য পরিসর নির্ণয়ের মাধ্যমেই এরূপ সমস্যা দূর করে প্রতিষ্ঠানের সকল পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় ।
৫. নিয়ন্ত্রণে সুবিধা (Easy controlling) :
নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও কাম্য ব্যবস্থাপনা পরিসরের গুরুত্ব রয়েছে। এরূপ পরিসর বড় হলে নির্বাহীর পক্ষে পরিকল্পনার আলোকে সুষ্ঠুভাবে প্রত্যেক বিভাগ বা কর্মীর কার্যাকার্য পরিমাপ, ভুল সংশোধন ও কার্যকর নেতৃত্ব দান যেমনি সম্ভব হয় না তেমনিভাবে পরিসর ছোট হলেও স্তরজনিত বিপদের কারণে সমন্বয়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়।
৬. ব্যয় হ্রাস (Reduction of costs) :
ব্যবস্থাপনা পরিসরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের খরচ ও অপচয়েরও সম্পর্ক বিদ্যমান । তত্ত্বাবধান পরিসর ছোট হলে প্রতিষ্ঠানে নির্বাহীর সংখ্যা ও বিভাগ-উপবিভাগের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ে। অন্যদিকে এরূপ পরিসরের পরিমাণ বড় হলে সাধারণ দৃষ্টিতে ব্যয়ের পরিমাণ কম ব্যয় বৃদ্ধি পায় । তাই কাম্য তত্ত্বাবধান পরিসর প্রতিষ্ঠা করা গেলেই প্রতিষ্ঠানে ব্যয়ের পরিমাণ কাম্য স্তরে বজায় থাকে।
৭. উত্তম কার্য পরিবেশ সৃষ্টি (Creating proper working environment) :
উত্তম কার্য পরিবেশ তত্ত্বাবধান সম্ভব হয় না। ফলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। অপরপক্ষে পরিসর ছোট হলে নির্বাহীরা ক্ষেত্র বিশেষে আরামপ্রিয় হয়ে পড়ে। অন্যথায় অতিমাত্রায় তদারকী ব্যবস্থা আরোপের কারণে স্বাভাবিক কার্য পরিবেশে বিঘ্ন ঘটে । তাই তত্ত্বাবধান পরিসর কাম্য হলে ঊর্ধ্বতন নির্বাহী ও অধস্তনদের মধ্যে একটি উত্তম মানবীয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এতে কার্য পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ।

৮. ব্যক্তিক বিকাশের সহায়ক (Aid to flourishing personality) :
কাম্য ব্যবস্থাপনা পরিসরের আওতায় একজন ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন উভয়েরই ব্যক্তিক বিকাশ সম্ভবপর হয় । এরূপ পরিসর বড় হলে নির্বাহী কর্মভারগ্রস্ত হন; ফলে কাজের চাপে তার চিন্তা করার সুযোগ কমে এবং কাজের প্রতি ব্যক্তিক স্বাচ্ছন্দ্য হ্রাস পায় । অন্যদিকে অধস্তনরাও ঊর্ধ্বতনের কাছ থেকে যে ধরনের তত্ত্বাবধান ও খোঁজখবর প্রত্যাশা করে তা না পাওয়ায় তাদের মধ্যেও ফাঁকিবাজির প্রবণতা বাড়ে ও বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হয় । অন্যদিকে তত্ত্বাবধান পরিসর বেশি ছোট হলে নির্বাহীর শক্তি-সামর্থ্য অব্যবহৃত থাকে। অতিরিক্ত খোঁজখবর ও কাজের জন্য বেশি চাপাচাপির কারণেও অধস্তনরা হতাশ হয় ।
উপসংহারে বলা যায়, কাম্য ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ণয় প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় । প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রত্যেকটি নির্বাহীর কাম্য তত্ত্বাবধান পরিসর নির্ণয় যদিও বেশ কষ্টসাধ্য, তথাপি প্রতিষ্ঠানের জনশক্তি ও সেই সঙ্গে অন্যান্য উপকরণের কার্যকর ব্যবহারে এরূপ পরিসর নির্ণয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ । তাই এ বিষয়ে শীর্ষ নির্বাহীদের সব সময় যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা আবশ্যক ।
