নেতৃত্বের উপাদান

আজকের আলোচনার বিযয় নেতৃত্বের উপাদান – যা নেতৃত্ব এর অর্ন্তভুক্ত, নেতৃত্ব হলো লক্ষ্যার্জনের জন্য অধস্তনদের প্রভাবিত করার কৌশল বা প্রক্রিয়া। উপাদান বলতে কোনো কিছুর অপরিহার্য অংশ (Necessary part) অথবা কোনো কিছুর চরিত্র বা রূপ সৃষ্টি করে এমন অঙ্গীভূত বিষয়াদি (Characteristics) কে বুঝানো হয় । নেতৃত্বকে একটা কৌশল ধরা হলে উক্ত কৌশল কতিপয় বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত ও বিকশিত হয় । নিম্নোক্ত রেখাচিত্র বা মডেলের সাহায্যে তা উপস্থাপিত হলো :

 

নেতৃত্বের উপাদান

 

নেতৃত্বের উপাদান

নিম্নে নেতৃত্বের অপরিহার্য অঙ্গ বা উপাদানসমূহ আলোচনা করা হলো :

১. নেতার গুণ (Quality of leader) :

নেতার গুণ নেতৃত্বের মুখ্য উপাদান হিসেবে গণ্য। নেতা যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে যোগ্য হন, প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী হন, কর্মক্ষেত্রে দক্ষ হন, দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার মত সামর্থ্যবান হন-তবে স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্বের মান ও বৈশিষ্ট্যে তার প্রতিফলন ঘটে ।

২. নেতার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা (Formal power of leader) :

নেতার ক্ষমতা নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে । সাংগঠনিক নিয়মে যদি একজন নেতা যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হন তবে নেতৃত্বকে তা প্রভাবিত করে থাকে । অধিক ক্ষমতা যেমনি নেতাকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে তেমনি সীমিত ক্ষমতা নেতাকে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানে বাধা দেয় ।

৩. অধস্তন জনশক্তির মান (Quality of subordinates) :

অধস্তন জনশক্তি বা অনুসারীদের মান নেতৃত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অধস্তন জনশক্তি যোগ্য ও দক্ষ হলে নেতা নেতৃত্বদানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন । অধস্তনরা নিম্ন মনোবলের অধিকারী হলে সেক্ষেত্রে নেতার নিকট থেকে কার্যকর নেতৃত্ব প্রত্যাশা করা যায় না ।

৪. অধস্তনদের মনোভাব (Attitude of followers) :

অধস্তন বা অনুসারীরা নেতা সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করে তার ওপর নেতৃত্বের প্রকৃতি নির্ভর করে। নেতৃত্ব সম্পর্কে যদি জনশক্তি হতাশ ও নিরাসক্ত থাকে তবে সেখানে নেতৃত্ব স্বেচ্ছাচারী, জনকল্যাণবিমুখ ও উদাসীন হয়। অন্যদিকে নেতৃত্ব সম্পর্কে যদি অধস্তনদের মনোভাব ভালো হয় তবে সেখানে নেতৃত্ব সাবলীল ও বলিষ্ঠ হতে পারে ।

 

৫. আনুগত্য ও শৃঙ্খলা (Loyalty and discipline) :

প্রতিষ্ঠানে আনুগত্য ও শৃঙ্খলার মান নেতৃত্বকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে । অধস্তন জনশক্তি বা অনুসারীদের মধ্যে আনুগত্যের ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত হলে এবং প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বিরাজ করলে সেখানে নেতৃত্ব একভাবে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হয়। অন্যদিকে অনুসারীদের মধ্যে অবাধ্যতা ও প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করলে সেখানে নেতৃত্ব কার্যকর হতে পারে না ।

৬. আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক (Interpersonal relationship) :

প্রতিষ্ঠানের জনশক্তির মধ্যে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক নেতৃত্বের মান ও বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে। নেতার সাথে অনুসারীদের এবং অনুসারীদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক যদি উন্নত হয় তবে নেতৃত্ব অধিক কার্যকর হতে পারে । অনুসারীদের সাথে নেতার সম্পর্ক যত নিকটবর্তী হয় ততই নেতা সাবলীল ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ নেতৃত্বদানে সমর্থ হন ।

৭. প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য (Organizational goal) :

লক্ষ্যও নেতৃত্বকে প্রভাবিত করে । লক্ষ্য যত গুরুত্বপূর্ণ হয় নেতার এবং অধস্তন জনশক্তির মানসিক ও বৈষয়িক প্রস্তুতিও ততই বেশি হয়ে থাকে । লক্ষ্যের মধ্যে যদি নতুনত্ব থাকে এবং তা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ (Challenging) হয় তবে নেতৃত্বও ইতিবাচক এবং উদ্যমী হয় । লক্ষ্য গতানুগতিক হলে নেতৃত্বও গতানুগতিক হয়ে থাকে ।

৮. যোগাযোগ ব্যবস্থা (Communication system) :

যোগাযোগ ব্যবস্থা নেতৃত্বের একটা অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গণ্য । অনুসারী বা অধস্তনদের প্রভাবিত করে লক্ষ্যার্জনের কৌশলই হলো নেতৃত্ব। এই প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে নেতা ও অনুসারীদের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । এরূপ যোগাযোগ সহজ ও ফলপ্রদ হলে নেতা ও কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস পায়। ফলে গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব বিকাশ লাভ করে ।

৯. পরিবেশ-পরিস্থিতি (Situation) :

পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকেও নেতৃত্ব গড়ে উঠে । পরিস্থিতিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের ধারণা এথেকেই এসেছে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে নেতৃত্বের ধরন এক ধরনের হয়, অন্যদিকে পরিস্থিতি ভিন্নতর হলে নেতৃত্ব সেই মানের হয়ে থাকে । বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা নেতৃত্বে যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় তার পিছনে পরিবেশ- পরিস্থিতির প্রভাব লক্ষণীয় ।

১০. প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য (Tradition of organization) :

সাংগঠনিক ঐতিহ্যের কারণেও নেতৃত্ব ভিন্নতর হয়ে থাকে । কোনো প্রতিষ্ঠানে আমলাতন্ত্রের প্রভাব সক্রিয় হলে সেখানে নেতৃত্বের মধ্যে ধীরগতি ও অতি-আনুষ্ঠানিকতার ভাবধারা গড়ে ওঠে। এরূপ প্রভাব কম হলে নেতৃত্ব বলিষ্ঠ ও সাবলীল হতে পারে ।

 

নেতৃত্বের উপাদান
নেতৃত্বের উপাদান

 

উপসংহারে বলা যায়, উপরোক্ত উপাদানের উপস্থিতি একজন নেতাকে যোগ্য নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম করে তোলে । তাই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ও সেই সাথে একজন নেতাকে তার নেতৃত্বের প্রভাব সৃষ্টিকারী বিষয়গুলোর প্রতি সতর্ক থেকে কার্যকর ক্ষমতা প্রয়োগে যত্নশীল হওয়া উচিত ।

Leave a Comment