আজকের আলোচনার বিযয় প্রেষণার গুরুত্ব – যা প্রেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, ব্যবস্থাপনার কাজ হলো অন্যের দ্বারা কাজ সম্পন্ন করিয়ে নেয়া। কিন্তু কাজের ব্যাপারটি বিশেষভাবে কর্মীদের কার্য সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কিত । কেউ কাজ করতে না চাইলে কোনো ব্যবস্থাপকের পক্ষে জোর করে কারো নিকট হতে কাজ আদায় করা সম্ভব নয় । তাই আধুনিক ব্যবস্থাপনা কর্মীদের সন্তুষ্টি অর্জনের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে । নিম্নে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রেষণার গুরুত্ব উল্লেখ করা হলো :
Table of Contents
প্রেষণার গুরুত্ব

১. মানবশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার (Maximum use of manpower) :
প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত জনশক্তি যত দক্ষ ও যোগ্যই হোক না কেন কর্মক্ষেত্রে যদি তারা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত না হয় তবে তাদের নিকট থেকে কাঙ্ক্ষিত কার্যফল প্রত্যাশা করা যায় না । এ জন্যই আধুনিক লেখকগণ কর্মসম্পাদনের বিষয়টিকে নিম্নোক্ত সমীকরণের সাহায্যে উপস্থাপন করেছেন : কর্ম সম্পাদন (Performance) = প্রেষণা x (কর্মীর সামর্থ্য × কর্মীর জ্ঞান) অর্থাৎ কর্মীর সামর্থ্য ও জ্ঞানের যথার্থ ব্যবহার প্রেষণার ওপর নির্ভরশীল ।
২. উচ্চ মনোবল উন্নয়ন (Development of high morale) :
প্রেষণা কর্মীদের উচ্চ মনোবল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । কারণ উত্তম প্রেষণা উচ্চ কার্যসন্তুষ্টির সৃষ্টি করে আর এরূপ সন্তুষ্টি মনোবলের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে । তাই প্রেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতি এবং কাজের প্রতি কর্মীদের অধিক আন্তরিক করে তোলে এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী যেকোনো কার্যকলাপে নিরুৎসাহিত করে । ফলে প্রতিষ্ঠানে একটি উত্তম কার্য পরিবেশের সৃষ্টি হয় ।
৩. দক্ষতা বৃদ্ধি (Increase in efficiency) :
কাজের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই কর্মীরা সেই কাজে আনন্দ পায় এবং আনন্দ সহযোগে যেকোনো কর্ম প্রচেষ্টা তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে । সঠিক প্রেষণা কর্মীদের কাজে শুধু স্বেচ্ছাপ্রণোদিতই করে না তাদের যোগ্যতার বিকাশেও ভূমিকা রাখে । প্রেষণার অভাবে কর্মীরা কাজে নিরানন্দ বোধ করে যা ক্রমে তাদের দক্ষতা হ্রাসের কারণ হয় ।
৪. অধিক উৎপাদন ( Mass production) :
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে যথাসম্ভব কম ব্যয়ে সর্বোচ্চ উৎপাদনের ওপর। এর জন্য অবশ্যই জনশক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়া উচিত। কাঁচামাল, যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য উপাদান যত অনুকূলই হউক না কেন, জনশক্তি প্রেষণার অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়লে কখনই অধিক উৎপাদন নিশ্চিত হতে পারে না ।
৫. অপচয় হ্রাস (Reduction of wastage) :
প্রেষণা অপচয় হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । প্রেষণার অভাবে কর্মীদের শ্রম ঘণ্টার যে অপচয় হয় উত্তম প্রেষণার বদৌলতে তা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। এছাড়া আন্তরিকতার ছোঁয়া থাকলে কর্মীরা শুধু কাজেই আন্তরিক হয় না উপায়-উপকরণের কার্যকর ব্যবহারেও সচেষ্ট হয় । যা সামগ্রিক অপচয় হ্রাস করে ।
৬. শ্রম-ঘূর্ণায়মানতা হ্রাস (Reducing labour – turnover) :
প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কর্মস্থল ত্যাগের একটা বড় কারণ হলো প্রেষণার অভাব । কারণ কর্মীরা কাজের বিনিময়ে ন্যায্য প্রাপ্তির প্রত্যাশা করে । প্রতিষ্ঠান যখন কর্মীদের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সুবিধা দেয় এবং কর্মীর ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও নিরাপত্তার সুযোগ নিশ্চিত করে তখন কর্মীরা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে চায় না । ফলে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কর্মস্থল পরিত্যাগ করার হার হ্রাস পায় এবং এ সংক্রান্ত জটিলতা থেকে প্রতিষ্ঠান মুক্তিলাভ করে ।
৭. নমনীয়তা বৃদ্ধি (Increasing flexibility) :
প্রেষণা কর্মক্ষেত্রে নমনীয়তা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । কর্মীদের মনোবল নিম্নমানের হলে তারা প্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের পরিবর্তনকে সহজ অর্থে গ্রহণ করে না । অথচ প্রেষণা দানের মাধ্যমে কর্মীদের মনোবল উন্নয়ন করা সম্ভব হলে যেকোনো পরিবর্তনের প্রতি তারা অনূকূল সাড়া দেয় । ফলে প্রতিষ্ঠানে নমনীয়তা বৃদ্ধি পায় ।
৮. উত্তম শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা (Establishing fair labour-management relation) :
উত্তম শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ । প্রেষণার দ্বারাই তা অর্জন করা সম্ভব। কর্মীদের মানসিক দিক হতে যত সন্তুষ্ট রাখা যায় ব্যবস্থাপনার প্রতি তাদের ধারণা ও আন্তরিকতা তত বৃদ্ধি পায় । প্রেষণার অভাবে কর্মীরা আন্দোলনে নামে ও শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক খারাপ হয় ।

৯.উদ্যোগ ও উন্নয়ন (Initiative and development) :
প্রেষণা শুধু মানসিক সন্তুষ্টিই সৃষ্টি করে না তা কর্মীদেরকে নব-নব পন্থা উদ্ভাবনের মাধ্যমে উত্তম উপায়ে কাজ সম্পাদনে উদ্যোগী করে তোলে । এছাড়া কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতনদের প্রেষিত করলে তা তাদেরকে কার্যক্ষেত্রে অধিক কৃতিত্ব প্রদর্শনে উৎসাহিত করে । যা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে ।
মোটকথা, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে সকল পর্যায়ের কর্মীদের কাজের প্রতি উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা না গেলে কখনই লক্ষ্যার্জন সম্ভব নয় । আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে এ বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করে থাকেন । আর এ কারণেই ব্যবস্থাপনাকে এ বিষয়ে সব সময়ই অধিক যত্নবান হওয়া আবশ্যক ।
