আজকের আলোচনার বিযয় প্রেষণার বিভিন্ন তত্ত্ব – যা প্রেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, আধুনিক ব্যবস্থাপনায় প্রেষণা এক অতি গুরুত্বপূর্ণ কার্য হিসেবেই বিবেচিত। কর্মীদেরকে কাজে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব-এ নিয়ে ব্যবস্থাপনা বিশারদদের চিন্তার অন্ত নেই । বিভিন্ন সমাজে, বিভিন্ন পরিবেশে, বিভিন্ন মন ও মানের লোকদের প্রেষণাদানের উপায় নিয়ে অনেক মনোবিজ্ঞানী, আচরণবিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানী গবেষণা চালিয়েছেন । ফলে এক্ষেত্রে বিভিন্ন চিন্তা বা তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে। নিম্নে প্রধান প্রধান তত্ত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো:
Table of Contents
প্রেষণার বিভিন্ন তত্ত্ব

১.চাহিদা সোপান তত্ত্ব (Need hierarchy theory) :
আব্রাহাম মাসলো প্রেষণা দানের যে সকল তত্ত্ব ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে তার মধ্যে চাহিদা সোপান তত্ত্ব অন্যতম। আব্রাহাম মাসলো এরূপ তত্ত্বের উদ্ভাবক। তিনি এ তত্ত্বে মানুষের অভাব বা চাহিদাকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন । যা একের পর এক ধারাবাহিকভাবে অবস্থান করে এবং একের পরিতৃপ্তি ঘটলে পরবর্তী অভাব তার নিকট মুখ্য হয় । তাই যেই কর্মী অভাবের যেই স্তরে বিরাজ করে তাকে প্রেষণাদানের ক্ষেত্রে সেই অভাব পূরণে সচেষ্ট হওয়া আবশ্যক । তিনি মানুষের চাহিদাকে নিম্নোক্ত পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন ।
ক) জৈবিক / দৈহিক চাহিদা (Physiological needs) অর্থাৎ খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি; খ) নিরাপত্তার চাহিদা (Safety needs) অর্থাৎ টিকে থাকার প্রয়োজনে ভীতি মুক্তি, যেকোনো নিরাপদ বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা;
গ) সামাজিক চাহিদা (Social needs) অর্থাৎ অন্যদের সাথে মিলেমিশে চলা বা সমাজের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ
ঘ) আত্মতৃপ্তির চাহিদা (Esteem needs) অর্থাৎ সমাজের মানুষের মাঝে নিজের পৃথক একটা ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা; এবং রাখার
ঙ)আত্মপ্রতিষ্ঠার চাহিদা (Self actualization needs অর্থাৎ মৃত্যুর পর নিজেকে অমর করে আগ্রহ।
২. ই.আর.জি, তত্ত্ব (ERG theory) :
মাসলোর তত্ত্ব বিভিন্নভাবে সমালোচিত হওয়ায় ক্লেটন এলডারফার (Clayton Alderfer) একটি বিকল্প তত্ত্ব উপস্থাপন করেন । এটি ই.আর.জি. তত্ত্ব নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে তিনি মানুষের অভাব বা চাহিদাকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন; যা নিম্নরূপ :
ক) টিকে থাকার চাহিদা (Existence needs) :
এর মধ্যে জৈবিক চাহিদা ও কর্মসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় প্রাপ্তির চাহিদা অন্যতম; যেমন- বেতন, আনুষঙ্গিক সুবিধা, ভৌত অবস্থা ইত্যাদি
খ) সম্পৃক্ততার চাহিদা (Relatedness needs) :
এর মধ্যে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী এবং পেশা সম্পৃক্ত সহযোগীদের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, নিজের ধারণা ও মতামতকে সেখানে তুলে ধরা বা প্রতিষ্ঠা করার চাহিদা অন্তর্ভুক্ত।
গ) প্রবৃদ্ধির চাহিদা (Growth needs) :
নতুন কিছু সৃষ্টি করা বা উদ্ভাবন করার আগ্রহ বা চাহিদা এর মধ্যে পড়ে । যা পারিপার্শ্বিক পরিবেশে উৎপাদনমুখী কোনো প্রভাব রাখতে সক্ষম । এরূপ তত্ত্বে মনে করা হয়, একটা চাহিদা পূরণ হলে বা মোটামুটি একটা পূরণের পর্যায়ে এলে স্বভাবতই অন্য চাহিদা ব্যক্তির মাঝে দেখা দেয়। তবে প্রথমোক্ত চাহিদার বিষয়টা যতটা দৃঢ় থাকে পরবর্তী ক্ষেত্রে তা অনেকটাই নমনীয় হয়ে থাকে ।
তবে কোনো উচ্চ পর্যায়ের চাহিদা পূরণের সম্ভাবনা যদি ব্যক্তি দীর্ঘদিনেও না দেখে তবে উক্ত চাহিদা তার মন থেকে হারিয়ে যায় । মাসলোর তত্ত্ব অপেক্ষা এ তত্ত্বটি অধিক নমনীয় এবং এক্ষেত্রে মনে করা হয় একটা পূরণ না হতেই আরেকটা অভাব ব্যক্তি মনে দৃঢ়মূল হতে পারে । এরূপ তত্ত্ব অনেকটা কার্য পরিবেশের সাথে সম্পর্কযুক্ত ।
৩. অর্জিত চাহিদা তত্ত্ব বা সাফল্য অর্জন ধারণা তত্ত্ব (Acquired needs theory) :
ডেভিড মি. ম্যাকার এরূপ তত্ত্বের উদ্ভাবক হলেন ডেভিড সি. ম্যাকলিল্যান্ড (David C. McClelland)। এরূপ তত্ত্বে মনে করা হয় মানুষের অভাব বা চাহিদা হলো তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত বা শিক্ষণের ফলশ্রুতি । যদিও এ সকল অভাববোধ মানুষ যে পরিবেশে বেড়ে উঠে সেখানকার বিভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল এবং কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা ব্যক্তির চাহিদাকে প্রভাবিত করে । তিনি কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের নিম্নোক্ত তিন ধরনের চাহিদাকে শনাক্ত করেছেন :
ক) কৃতিত্ব বা সাফল্য অর্জনের চাহিদা (Need for achievement) :
এরূপ চাহিদা বলতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কাজ সম্পাদন এবং এরূপ কাজে সন্তোষজনক ফলাফল অর্জনের আগ্রহকে বুঝায় ।
খ) স্বীকৃতি প্রাপ্তির চাহিদা (Need for affiliation) :
এরূপ আকাঙক্ষা বলতে অন্যের সাথে উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখাকে বুঝায় ।
গ) ক্ষমতাপ্রাপ্তির চাহিদা (Need for power) :
এরূপ চাহিদা বলতে অন্যের ওপর প্রভাব সৃষ্টি এবং নিজস্ব পরিবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগ্রহকে বুঝায় । এরূপ তত্ত্বে যে সকল চাহিদার উল্লেখ করা হয়েছে তা ব্যবস্থাপকীয় দক্ষতার সাথে সম্পৃক্ত । ম্যাকক্লিল্যান্ড এর মতে, যাদের মধ্যে কৃতিত্ব অর্জনের চাহিদা থাকে তারা ভালো ব্যবস্থাপক হতে পারে ।
যাদের মধ্যে স্বীকৃতি প্রাপ্তির চাহিদা থাকে তারা ব্যাপক লোকজনের সাথে মেলামেশার বা যোগাযোগের প্রয়োজন হয়-এরূপ কাজ; যেমন- স্বাস্থ্য পরিচর্যা, বিক্রয়, শিক্ষকতা, পরামর্শদান ইত্যাদিতে ভালো করে । যারা ব্যক্তিগত ক্ষমতা পছন্দ করে তারা প্রতিষ্ঠানের জন্য তেমন কল্যাণকর হয় না। তবে যারা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার প্রত্যাশা করে তারা প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠানকে ভালো নেতৃত্ব দিতে পারে । ম্যাকক্লিল্যান্ড মনে করেন, এ ধরনের চাহিদা ব্যক্তির মনে সুপ্ত থাকে এবং তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাগ্রত ও সক্রিয় করা যায় ।
৪. দ্বি-উপাদান তত্ত্ব (Two factors theory) :
ফ্রেডারিক হাজরাগ প্রতিষ্ঠানের ২০০ জন প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষকের ওপর গবেষণা চালিয়ে কর্মীদের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির সাথে প্রখ্যাত মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ফ্রেডারিক হার্জবাগ (Herzberg) এরূপ তত্ত্বের উদ্ভাবক। হার্জবাগ মনে করেন রক্ষণাবেক্ষণ উপাদানের অনুপস্থিতিতে কর্মীদের মাঝে অসন্তুষ্টির সূচনা হয় ।
কারণ প্রতিষ্ঠানে এরূপ উপাদানের উপস্থিতি থাকা কর্মীরা তাদের ন্যায্য পাওনা বা স্বাভাবিক প্রত্যাশার বিষয় বলে মনে করে । তাই এরূপ উপাদানের উপস্থিতি কর্মীদেরকে প্রণোদিত করে না। অন্যদিকে প্রেষণামূলক উপাদানসমূহ কর্মীদের কাজে অনুপ্রেরণা যোগায় এবং বাড়তি উৎসাহের সৃষ্টি করে। তবে এর অনুপস্থিতি কর্মীদের মাঝে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করে না বা এজন্য তারা কোনোরূপ দাবি-দাওয়া পেশ করে না ।
৫. X তত্ত্ব ও Y তত্ত্ব (Theory X & theory Y) :
ডগলাস ম্যাকগ্রেগর (Douglas McGregor) এরূপ তত্ত্বের জনক । এ ধরনের তত্ত্বে মানব প্রকৃতি বিষয়ে দু’টি ভিন্নধর্মী ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি মনে করেছেন সমাজে দু’ধরনের মন-মানসিকতার লোক পাওয়া যায়। বিভিন্নমুখী পরিবেশ, কর্মীদের শিক্ষা, জ্ঞান, যোগ্যতা সব মিলিয়ে এ দু’টো প্রকৃতির কর্মীদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানসমূহে লক্ষণীয় । নিম্নে তত্ত্ব দু’টি উল্লেখ করা হলো:
ক) তত্ত্ব X (Theory X) :
এরূপ তত্ত্বে মানব প্রকৃতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা হয় । মনে করা হয়, কর্মীরা উত্তরাধিকারসূত্রে কাজ অপছন্দ করে, সুযোগ থাকলে কাজে ফাঁকি দেয় । তাই তাদের নিকট থেকে কাজ আদায়ে ভীতি প্রদর্শন, চাপ প্রয়োগ ও প্রয়োজনে শাস্তি দিতে হয়। কর্মীরা দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে চায়, দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে চায় না । তাই আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব অর্পণ করলেই সে তা পালন করে । কর্মীরা খুব কমই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে । তাই তাদের প্রেষিত করার সুযোগ কম। আর্থিক সুযোগ-সুবিধাকেই তারা একমাত্র পাওনা মনে করে । ইতিবাচক,
খ) তত্ত্ব Y (Theory Y) :
এরূপ তত্ত্বে কর্মীদের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করা হয় । মনে করা হয় কর্মীরা কাজ পছন্দ করে এবং অন্য আর পাঁচটি কাজের মতো প্রতিষ্ঠানের কাজকেও সাধারণভাবে গ্রহণ করে । তারা স্ব- উদ্যোগেই চলতে চায় । যে কারণে তাদের ওপর অহেতুক চাপ সৃষ্টি না করে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া উচিত । কর্মীরা দায়িত্ব নিতে চায় এবং দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কৃতিত্ব অর্জন করতে চায়। এজন্য সে স্বীকৃতি পাওয়ারও প্রত্যাশা করে । সুযোগ পেলে অধস্তনরাও নতুনত্ব সৃষ্টি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে উত্তম পরামর্শ দিতে সক্ষম ।
মানব প্রকৃতি ও আচরণের এ উভয়বিধ অবস্থার মধ্যে প্রান্তিকতার একটা ভাবধারা বিদ্যমান । তাই উভয় ধরনের তত্ত্বের সংমিশ্রণে একটা নতুন তত্ত্ব গড়ে উঠেছে। যাকে Theory Z বলে । এক্ষেত্রে মানুষকে ভালো-মন্দের সংমিশ্রণে ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন জীব গণ্য করা হয়েছে। এরূপ ধারণার প্রবক্তা হিসেবে লকি (Locke), সুলিভান (Sullivan) এবং পিটার এফ.ড্রাকার (Peter F. Drucker) এর নাম উল্লেখযোগ্য ।
৬.প্রত্যাশ্যা তত্ত্ব (Expectancy theory) :
এরূপ তত্ত্বের উদ্ভাবক হলেন ভিক্টর এইচ. ভ্রম (Victor H. Vroom)। ন্যান্ডলার (Nandler) ও ললার (Lawler) এরূপ তত্ত্বের উন্নয়নে কাজ করছেন। এরূপ তত্ত্ব নিম্নোক্ত দু’টি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে :
ক) কর্মীরা কোন জিনিস কতটা পেতে চায় ও
খ) প্রার্থিত জিনিসের কতটা সে পেতে পারে ।
ভ্রুম এ বিষয়টাকে একটা সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন । যা হলো : M = E × 1 × V
যখন, M = Motivation (শক্তি বা প্রেষণা),
E=Expectancy (প্রত্যাশা),
I =Instrumentality (কর্মের সঙ্গে পুরস্কারের সম্পর্কের মাত্রা),
V = Valence (আকর্ষণ)।
এরূপ তত্ত্বে প্রদত্ত কর্ম বা প্রচেষ্টার দ্বারা কতটা কর্মফল (Outcome) পাওয়া যেতে পারে তার আশাকে প্রত্যাশা (Expectancy) বলে । কারকত্ব (Instrumentality) বলতে উত্তম কর্ম কতটা প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে পারবে তার সম্ভাবনার মাত্রাকে বুঝায় ।
উত্তম কাজে যদি উচ্চ বেতন ও সুবিধাদি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে এ মাত্রা ১ ধরা হয় । এরূপ সম্ভাবনা না থাকলে তাকে – ১ ধরা হয়। অর্থাৎ এর মধ্যেই এরূপ সম্পর্কের মাত্রা উঠানামা করে । অন্যদিকে কর্মীর এরূপ প্রচেষ্টার বদৌলতে প্রতিষ্ঠান যে মূল্য দিতে চায় তাকে Valence বা আকর্ষণ বলে ।
যদি কোনো কর্মীর প্রত্যাশা, কারকত্ব ও আকর্ষণ অধিক হয় তবে উক্ত কাজে কর্মীর প্রেষণার মাত্রাও বেশি হয়ে থাকে । একটা নতুন প্রজেক্টে একজন কর্মীকে স্থানান্তর করার ক্ষেত্রে তার প্রত্যাশিত বেতন ও সুবিধাদি, উক্ত কাজের ফলে তা বাড়ার সম্ভাবনা ও নতুন প্রজেক্টের প্রতি তার যদি আকর্ষণ থাকে তবে তার মাঝে উচ্চ প্রেষণা দেখা দেবে।
৭. সমতা বা ন্যায়পরায়ণতা তত্ত্ব (Equity theory) :
মনোবিজ্ঞানী J.Stacy Adams এরূপ তত্ত্বের জনক । এ তত্ত্ব অনুযায়ী কার্যক্ষেত্রে প্রেষণা, কর্মফল (Performance) ও কর্মসন্তুষ্টি (Job satisfaction)-এর অন্যতম উপাদান হলো উক্ত কর্মের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ন্যায়পরায়ণতা বা সাম্য সম্পর্কে কর্মীর মূল্যায়ন । কর্মী যদি মনে করে অন্য কর্মীদের অপেক্ষা বা কোনো নির্দিষ্ট কর্মের গুরুত্ব বিবেচনায় অন্য কর্মী থেকে তাকে কম সুযোগ-সুবিধা প্রদত্ত হচ্ছে তবে কর্মীর প্রেষণা কম হবে । অন্যদিকে যদি কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের সকল ক্রিয়াকর্মে ন্যায়পরায়ণতা বা সাম্য লক্ষ করে তবে তাদের প্রেষণার মাত্রা অধিক হবে।
এরূপ তত্ত্বে আর্থিক সুযোগ-সুবিধাকে কর্মস্থলে প্রেষণা দানের প্রধান উপায় হিসেবে গণ্য করা হয় । ফলে কর্মীবৃন্দ তাদের প্রাপ্ত পারিশ্রমিককে অন্যদের সাথে তুলনা করে তার প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের যথার্থতা সম্পর্কে একটা ধারণায় পৌঁছে । তার প্রাপ্তি কম মনে হলে সে মানসিক চাপে ভোগে ফলে কাজে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয় না । অন্যদিকে এরূপ মাত্রা যথার্থ হলে কর্মী কাজে উৎসাহিত হয়। নিচের দিকের কর্মীদের জন্য এরূপ তত্ত্ব বিশেষভাবে উপযোগী মনে করা হলেও সকল পর্যায়ের কর্মীদের ক্ষেত্রেই এরূপ তত্ত্বের প্রয়োগযোগ্যতা রয়েছে ।
৮.অংশগ্রহণ তত্ত্ব (Participation theory) :
অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা (Participative management) ধারণা থেকে এরূপ তত্ত্ব আহরিত। এক্ষেত্রে মনে করা হয় কর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ালে কর্মীরা কাজে অধিক উৎসাহী হয়। অন্যদিকে এরূপ সুযোগের মাত্রা কম থাকলে কর্মীরা উক্ত কাজকে আপন মনে করতে পারে না বা তার সাথে সম্পূর্ণ একাত্ম হতে পারে না ।
ফলে উক্ত কাজে তাদের আগ্রহের মাত্রা কম থাকে। এরূপ তত্ত্বে ধরে নেয়া হয়- কর্মীরা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করে । কর্মক্ষেত্রে তারা কৃতিত্ব অর্জন করতে চায়। তাই প্রতিষ্ঠানে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনে করে । তাই সে যে কাজ করবে উক্ত কাজের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন যখন সিদ্ধান্ত দেবেন সেখানে সে তার পরামর্শ রাখতে চায় । অর্থাৎ উক্ত কাজের সিদ্ধান্তে সে নিজেকে শরীক দেখতে পছন্দ করে । নিজ দায়িত্ব পালনকালে প্রয়োজনীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্বও সে প্রত্যাশা করে । যা তাকে দায়িত্বশীলতার সাথে কর্ম সম্পাদনে উৎসাহিত করে।
৯.প্রেষণার লক্ষ্য স্থাপন তত্ত্ব (Goal setting theory of mativation) :
প্রেষণার লক্ষ্য স্থাপন তত্ত্বের মূলকথা হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতিটা বিভাগ ও উপবিভাগে যদি সঠিকভাবে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য স্থাপন করা যায় এবং সংশ্লিষ্ট জনশক্তিকে যদি উক্ত লক্ষার্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হয় তবে তা প্রেষণাদানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উপায় হতে পারে। ব্যবস্থাপনা একটা পদ্ধতি এবং এই পদ্ধতির সাথে অনেক উপপদ্ধতি জড়িত ।
লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ এই পদ্ধতির একটা উপপদ্ধতি । লক্ষ বাস্তবায়ন উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ এই পদ্ধতির অপরাপর উপপদ্ধতি । তাই সঠিকভাবে লক্ষ্য স্থাপন করে যদি তা অর্জনে জনশক্তির মধ্যে একটা আগ্রহ বা তাড়না সৃষ্টি করা সম্ভব হয় তবে নিঃসন্দেহে পরবর্তী উপপদ্ধতিতে তার প্রভাব পড়ে ।
১০. পুনঃশক্তি সঞ্চয়ন বা পুনঃদৃঢ়করণ তত্ত্ব (Re-inforcement theory) :
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী B.F. Skinner এরূপ তত্ত্বের উদ্ভাবক । এরূপ তত্ত্বকে ইতিবাচক দৃঢ়করণ তত্ত্ব অথবা আচরণ পরিমার্জন (Behavior modification) তত্ত্ব নামেও অভিহিত করা হয় । এই তত্ত্ব মতে কার্য পরিবেশের যথাযথ বিন্যাস এবং কর্মীদের কাজের প্রশংসা তাদেরকে কর্ম সম্পাদনে উদ্বুদ্ধ করে। নিম্নমানের কার্য সম্পাদনের জন্য যদি কারো ওপর শক্তি প্রয়োগ, চাপ সৃষ্টি বা বলপ্রয়োগ করা হয় তবে কর্মসম্পাদনের ওপর তা আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এক্ষেত্রে ইতিবাচক পুনঃশক্তি সঞ্চয়ন বলতে চাপ প্রয়োগ না করে কাজের প্রশংসা, কাজের চাপ কিছুটা হ্রাস, উন্নত পরিকল্পনা তৈরি, কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা অপসারণ, ফলাবর্তনমূলক যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন ইত্যাদি কর্মব্যবস্থা নেয়া হলে কর্মী নতুনভাবে মানসিক শক্তি লাভ করে ও উত্তমভাবে কার্যসম্পাদনে ব্রতী হয় ।

১১. সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব (Social learning theory) :
প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) পুনঃশক্তি সঞ্চয়ন তত্ত্বের ওপর বিস্তৃত গবেষণা করতে গিয়ে এ নতুন তত্ত্বটির উদ্ভাবন করেন । এই তত্ত্ব মতে, মানবীয় আচরণ, বিভিন্ন ব্যক্তিগত উপাদান ও পরিবেশগত শক্তির ধারাবাহিক মিথষ্ক্রিয়া (Interaction) ব্যক্তির মাঝে শিক্ষণ ঘটায় ।
Bartol ও Martin বলেন, “Learning occurs through the continuous interaction of our behavior, various personal factors and environmental forces. ” অর্থাৎ আমাদের আচরণ, বিভিন্ন ব্যক্তিগত উপাদান ও পরিবেশগত বিভিন্ন শক্তির ধারাবাহিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা শিক্ষালাভ করি । এরূপ শিক্ষণ আবার ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও আচরণকে প্রভাবিত করে । তাই কর্মীর মাঝে শিক্ষণের ফল যাতে ইতিবাচক হতে পারে এজন্য প্রতিষ্ঠানকে বা এর নির্বাহীদেরকে সবসময়ই সচেতন ভূমিকা রাখতে হয় ।
