মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব

আজকের আলোচনার বিযয় মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব – যা প্রেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, Maslow’s Need Hierarchy Theory অভাব ও এর পরিতৃপ্তির সাথে প্রেষণার বিষয়টি বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু অভাব অসীম এবং একটি অভাব পূরণ হলেই আরেকটি অভাব তার স্থান দখল করে । তাই পূরণের সাথে সাথেই অভাব যে এর রূপ পাল্টায় তার ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে সামাজিক সম্পর্ক আন্দোলন (Human relations movement ) -এর অন্যতম পথিকৃত প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী Abraham Maslow যে তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন তাকে “Maslow’s Need Hierarchy Theory” বলে ।

মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব

তিনি তাঁর তত্ত্বে মানুষের চাহিদা বা অভাবকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন । যা একের পর এক অবস্থান করে এবং পর্যায়ক্রমিক এদের পরিতৃপ্তির ওপর কর্মীর প্রেষণা লাভ বিশেষভাবে নির্ভরশীল । Ricky W. Griffin বলেছেন, “Maslow’s hierarchy of needs, a theory of motivation that people must satisfy five groups of needs in order – physiological, security, belongingness, esteem and self-actualization. ” 

অর্থাৎ‍ মাসলোর চাহিদা সোপান হলো একটি প্রেষণা তত্ত্ব যেখানে মনে করা হয় মানুষ পর্যায়ক্রমে পাঁচটি চাহিদা পূরণের প্রত্যাশা করে; যা হলো – জৈবিক, নিরাপত্তা, অন্যকে আপন করে পাওয়া বা পারস্পরিক মিল ও ভালোবাসা, আত্মতৃপ্তি এবং আত্মপ্রতিষ্ঠা । নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্যে এরূপ তত্ত্বে উল্লেখ চাহিদার সোপান প্রদর্শিত হলো :

 

মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব

 

মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব

 

রেখাচিত্রে প্রদর্শিত চাহিদার স্তর সমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো :

১. জৈবিক / দৈহিক চাহিদা (Physiological needs) :

ন্যূনতম বাঁচার বা জীবন ধারণের প্রয়োজনকে জৈবিক বা দৈহিক চাহিদা বলে। খাদ্য, পানীয়, বাতাস, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন এ শ্রেণীর চাহিদার অন্তর্ভুক্ত Bovee ও অন্যদের মতে, “Physiological needs are the lowest level needs in Maslow’s hierarchy including the elements that ensure basic human servival” অর্থাৎ জৈবিক চাহিদা হলো মাসলোর চাহিদা সোপানের সর্বনিম্ন স্তর, এর উপাদানসমূহ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক নিশ্চয়তা দেয় । ন্যূনতম বেঁচে থাকার অধিকার প্রথমত সবাই ভোগ করতে চায় । তাই প্রেষণাদানে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ ধরনের অভাব প্রতিষ্ঠানে কিভাবে পূরণ করা যায় এ সম্পর্কে Ricky W. Griffin বলেছেন, “In organization these needs are generally satisfied by adequate wages and the work environment itself. ” 

২. নিরাপত্তার চাহিদা (Safety needs) :

জৈবিক প্রয়োজন পূরণের পর মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বোধ করে নিরাপত্তার । সে নিজেকে ও তার পরিবারকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির হাত হতে রক্ষা করতে চায় । এ জন্য সে চায় পেশার বা চাকরির স্থায়িত্ব, কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিরাপদে বাঁচার সুযোগ । Bartol ও Martin এরূপ চাহিদা সম্পর্কে বলেন, “Safety needs which pertain to the desire to feel safe, secure and free from threats to our existance. ” অর্থাৎ নিরাপত্তা চাহিদার মধ্যে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সকল ধরনের ভীতি হতে নিরাপদ ও মুক্ত থাকার আকাঙক্ষা অন্তর্ভুক্ত ।

৩. সামাজিক চাহিদা (Social needs) :

মানুষ যখন নিরাপত্তাবোধে তৃপ্ত হয় তখন সে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী ও সমাজের অন্যদের সাথে মিলেমিশে চলতে ও অন্যদের ভালোবাসা পেতে চায়। একেই সামাজিক চাহিদা বলে । এ পর্যায়ে সে বিভিন্ন সামাজিক ক্রিয়াকর্মে উৎসাহিত হয় ও নিজেকে সমাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে চায় । Ricky W. Griffin এরূপ চাহিদা সম্পর্কে বলেছেন, “Belongingness relates to social processes. They include the need for love and affection and need to be accepted by one’s peers. 

অর্থাৎ অন্যকে আপন করে পাওয়ার চাহিদা সামাজিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। এর মধ্যে পড়ে প্রেম ও ভালোবাসা এবং নিজ সঙ্গী-সাথীদের স্বীকৃতি। এ পর্যায়ের অভাব পূরণের জন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে খাবারের কক্ষ, কমিউনিটি রুম, সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ, দলবদ্ধ প্রচেষ্টা উৎসাহিতকরণ ইত্যাদি ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে ।

৪. আত্মতৃপ্তির চাহিদা (Esteem needs) :

উপরোক্ত চাহিদাগুলো পূরণ হলে মানুষ কাজের মধ্যে আত্মতৃপ্তির প্রয়োজনীয়তা বোধ করে। আত্মতৃপ্তির প্রয়োজন একজন ব্যক্তির সুনাম-সুখ্যাতি, যশ, অহংবোধ ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত । Weinrich ও Koontz এরূপ চাহিদার ধরন সম্পর্কে বলেছেন, This kind of need produces such satisfactions as power, prestige, status and self confidence. ” 15 অর্থাৎ এ ধরনের চাহিদা-ক্ষমতা, সম্মান, মর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠার মতো প্রত্যাশার জন্ম দেয় । এ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বড় অফিস, বড় বাসা, সুন্দর গাড়ি, প্রতিযোগিতামূলক কাজ ইত্যাদির ব্যবস্থা করা যেতে পারে ।

৫. আত্মপ্রতিষ্ঠার চাহিদা (Self actualization needs ) :

মানব চাহিদার শেষ পর্যায়ে যা মানুষকে আকর্ষিত করে তা হলো আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। এ পর্যায়ে সে তার প্রতিভার সর্বাত্মক রূপায়ণে অগ্রসর হতে চায়। Ricky W. Griffin এ পর্যায়ের চাহিদা সম্পর্কে বলেছেন, “These involve realizing one’s potential for continued growth and individual development.  অর্থাৎ একজন ব্যক্তির সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও ব্যক্তিক উন্নয়ন-এ পর্যায়ের চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মীর এ অবস্থায় প্রত্যাশা পূরণ বেশ জটিল।

অধিক কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, গুরুত্বপূর্ণ কাজ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার ইত্যাদি এ পর্যায়ে ব্যক্তি সন্তুষ্টির সৃষ্টি করতে পারে । ব্যক্তিগত জীবনে এরূপ চাহিদা পূরণে কোনো ব্যক্তি শিল্প- সাহিত্য, রাজনীতি, সভা-সমাবেশ, দান-খয়রাত ইত্যাদি কার্যে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজে নিজের সম্পর্কে একটা ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চায় । সে মৃত্যুর পরও নিজেকে অমর করে রাখার প্রত্যাশী হয় । 

 

তত্ত্বের মৌলিক ধারণাসমূহ (Basic ideas of theory) :

মাসলো তাঁর পর্যায়ক্রমিক চাহিদা তত্ত্বে যে সকল বিষয় ধরে নিয়েছেন তা হলো –

ক) মানুষের প্রেষিত আচরণের উৎস হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের চাহিদা বা অভাব । এর মধ্যে জৈবিক চাহিদা মুখ্য । মানুষ প্রথমেই এ চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে । এরপর পর্যায়ক্রমে উচ্চস্তরের চাহিদাগুলো পূরণের চেষ্টা চালায়;

খ) মাসলো মনে করেন, মানুষ পূর্ববর্তী স্তরের চাহিদাগুলো পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী স্তরের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে না। তবে চাহিদাগুলো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল এবং নিম্নস্তরের একটা অভাব পূরণ না হতেই পর্যায়ক্রমিক পরবর্তী উচ্চস্তরের অভাববোধ ব্যক্তির মনে সৃষ্টি হয়। 

গ) যে সকল উপাদানের মাধ্যমে বিদ্যমান স্তরে ব্যক্তির যতবেশি চাহিদা পূরণ সম্ভব সেই সকল উদ্দীপকের ব্যবস্থা করেই ব্যক্তিকে ঐ পর্যায়ে প্রেষিত করা যায় । 

তত্ত্বের সমালোচনা (Criticism of theory) :

মাসলোর তত্ত্বের সমালোচকগণ এর সমালোচনা করতে গিয়ে যা বলেছেন তা হলো-

ক) তত্ত্বটি ব্যাপক গবেষণাসমৃদ্ধ নয়- অনেকটা সাধারণ মানের; 

খ) এ তত্ত্বে আত্মপূর্ণতার যে চাহিদার কথা বলা হয়েছে তা ব্যক্তি ও স্থানীয় কৃষ্টিনির্ভর । তাই দেশ-কাল- পাত্র ভেদে এর গুরুত্বের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়; 

গ) তত্ত্বটি সাধারণভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কার্যগত মূল্য খুবই কম এবং 

ঘ) বর্তমানকালে প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্য পরিবেশে যে জটিলতা বাড়ছে তাতে নির্দিষ্ট কর্ম পরিবেশে প্রেষণা দানের উপাদান সম্পর্কে তার তত্ত্ব তেমন সহায়তা প্রদান করে না ।

উপসংহার (Conclusion) :

বিভিন্নভাবে সমালোচিত হলেও সার্বিক বিচারে এ তত্ত্বটি জনপ্রিয়তা, ব্যাপকতা ও মৌলিকতার দিক দিয়ে অনন্য । পরবর্তীকালে যারাই প্রেষণা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন বা তত্ত্ব দিয়েছেন তার ওপর মাসলোর তত্ত্বের কম-বেশি প্রভাব লক্ষ করা যায় ।

Leave a Comment