আজকের আলোচনার বিযয় প্রেষণা দানের বিভিন্ন উপায় বা পদ্ধতি – যা প্রেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, আধুনিক ব্যবস্থাপনায় শ্রমিক-কর্মীদের নিকট হতে কাজ আদায়ে প্রেষণা দানের গুরুত্ব সকল মহলেই স্বীকৃত । অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের প্রেষণাদান পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রচলিত থাকলেও একে প্রকৃতি অনুযায়ী আর্থিক ও অনার্থিক দু’ভাগে ভাগ করা হয় । নিম্নে এদের সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

Table of Contents
প্রেষণা দানের বিভিন্ন উপায় বা পদ্ধতি
ক) প্রেষণা দানের আর্থিক উপায় বা পদ্ধতি (Financial means of motivation) :
মানুষের জীবনে যে সীমাহীন অভাব লক্ষণীয় তার মুখ্য অংশের পূরণ অর্থের সাথে সংশ্লিষ্ট । মানুষ কাজ করার বিনিময়ে তাই অর্থ ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পেতে চায়। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে যে সকল প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা প্রদত্ত হয় তাকে আর্থিক প্রেষণা বলে । নিম্নে এর উপাদানসমূহ আলোচিত হলো :
১. ন্যায্য বেতন (Fair wages) :
উচ্চ বেতন স্বভাবতই কর্মীদেরকে উদ্দীপ্ত করে । বেতন বলতে এক্ষেত্রে মূল বেতনকেই বুঝায় । কর্মী যদি তাকে প্রদত্ত বেতন অন্যায্য মনে করে তবে কার্যক্ষেত্রে নিরুৎসাহ বোধ করা খুবই স্বাভাবিক; আর এর ফলে তার কর্মদক্ষতা হ্রাস পায় ।
২. মুনাফার অংশ (Profit sharing) :
সাধারণভাবে মুনাফা মালিকের প্রাপ্য। কর্মীদের যদি মুনাফার একটি অংশ দেয়া হয় তা হলে প্রতিষ্ঠানকে নিজের ভাবতে যেমনি তারা উৎসাহিত হয় তেমনিভাবে মুনাফা বৃদ্ধির জন্যও তারা সচেষ্ট থাকে।
৩. বোনাস (Bonus) :
বর্তমানকালে কর্মীদের উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য বোনাস একটি ফলপ্রদ পদ্ধতি । একে কর্মীরা বাড়তি পাওনা মনে করে, ফলে কাজে উৎসাহিত হয়। সাধারণত বিভিন্ন পর্ব ও অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বোনাস দেয়া হয় ।
৪. আর্থিক নিরাপত্তা (Financial security) :
ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা প্রত্যেক কর্মীরই একটি আকাঙ্ক্ষিত বিষয় । এ লক্ষ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচুইটি, পেনশন, গ্রুপ বীমা ইত্যাদির সুযোগ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেয়া হয় ।
৫. অগ্রিম ও ঋণ (Advance and loan) :
বর্তমানকালে আমাদের মতো দেশে কর্মীদের বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রভিডেন্ড ফাণ্ড, বেতন ইত্যাদির বিপক্ষে প্রতিষ্ঠান হতে পরবর্তী সময়ে মাসে মাসে কর্তন করা হবে-এ শর্তে অগ্রীম বা ঋণ প্রদান করা হয় । আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সহজ শর্তে তাদের কর্মীদের ঋণ দেয় । এটাও কর্মীদেরকে কাজে উদ্দীপ্ত করে ।
৬. বাসস্থান ভাতা (House allownce) :
বাসস্থান মানুষের মৌলিক অভাবের অন্তর্ভুক্ত। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রেষণা দানের উদ্দেশ্যে এ মৌলিক অভাব পূরণে বাসস্থান ভাতা প্রদান করে। অনেকক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করে । যার ভাড়া বাসস্থান ভাতা থেকে কেটে নেয়া হয় ।
৭. যাতায়াত ভাতা (Conveynce allownce) :
শহরাঞ্চলে কর্মীরা অধিকাংশই দূর হতে কার্যক্ষেত্রে আগমন করে । ফলে যাতায়াতে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। তাই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে যাতায়াত ভাতা প্রদান করা হলে কর্মীরা উৎসাহিত হয় । অনেক প্রতিষ্ঠান যাতায়াত ভাতা না দিয়ে পরিবহন সুবিধা প্রদান করে ।
৮. চিকিৎসা ভাতা (Medicare allownce) :
কর্মীদের সুস্বাস্থ্য উচ্চ মনোবলের পক্ষে অপরিহার্য। তাই কর্মীদের চিকিৎসা ভাতা প্রদান করা হয়। যা তাদের চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহে সহায়তা করে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের সাথে তার পরিবার-পরিজনদের চিকিৎসা সুবিধাও প্রদান করে । যা কর্মীদের উদ্দীপ্ত করার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপায় ।
৯. পদোন্নতি (Promotion) :
পদোন্নতির সাথে আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির প্রশ্ন জড়িত । তাই পদোন্নতি প্রাপ্তির বিষয়টি কর্মীদের মনে উৎসাহ জোগায় । সেজন্য যোগ্য কর্মীকে পদোন্নতি দান ও ভবিষ্যৎ উন্নতির সম্ভাবনার দ্বার খোলা রাখা প্রয়োজন ।
১০. পুরস্কার (Rewards) :
উত্তম কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করা যেতে পারে । এতে যারা পুরস্কৃত হয় তারা যেমনি উদ্দীপ্ত হয় তেমনি তাদের ন্যায় অন্যরাও এভাবে পুরস্কৃত হওয়ার লক্ষ্যে নিজেদেরকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করে ।
১১. রেশন সুবিধা (Rationing facilities) :
নির্দিষ্ট সময়ান্তে কম মূল্যে রেশনে কর্মীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করে বা প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত দ্রব্যাদি কমমূল্যে সরবরাহের মাধ্যমেও কর্মীদের উদ্দীপ্ত করা যায়।
১২. কেন্টিন সহযোগিতা (Canteen facilities) :
কার্যকালীন যে সকল প্রতিষ্ঠানে নাস্তা বা খাদ্য খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, সেক্ষেত্রে কেন্টিন সাবসিডি প্রদানের মাধ্যমেও কর্মীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা প্রদান করে উৎসাহ সৃষ্টি করা সম্ভব ।
খ) প্রেষণা দানের অনার্থিক উপায় বা পদ্ধতি (Non-financial means of motivation) :
কর্মীদের প্রণোদিত করার জন্য অর্থের বাইরে যে সকল উদ্দীপক ব্যবহৃত হয় তাকে এক কথায় অনার্থিক প্রেষণা বলে। কর্মীদের মাঝে উৎসাহ সৃষ্টির পিছনে এ সকল অনার্থিক প্রেষণার গুরুত্বও কম নয়। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী স্তরের জনশক্তিকে উদ্দীপ্ত করার ক্ষেত্রে এ সকল উপায় ক্ষেত্রবিশেষে অধিক কার্যকর বিবেচিত হয় । নিম্নে এদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো :
১. ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও অধিকার (Personal power and rights) :
কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা ভোগ করার ইচ্ছা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মৌলিক অধিকার পূরণের সাথে সে কর্মস্থলে ক্ষমতা ও অধিকার পেতে চায় । তাই এরূপ ক্ষমতা ও অধিকার প্রদত্ত হলে কর্মী বা নির্বাহীগণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে ।
২. সুষ্ঠু কর্ম পরিবেশ (Fair working environment) :
ফলপ্রদ কাজের পিছনে কর্ম পরিবেশের প্রভাব রয়েছে । কর্মী যেখানে কাজ করে সেই স্থানের পরিবেশ যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসসমৃদ্ধ ও হৈ চৈ মুক্ত হয় তবে তা কর্মীদের মনোবল উন্নত করে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পায়খানা ও প্রস্রাবখানা, কর্মীদের জন্য কেন্টিন, বিশ্রামাগার, প্রার্থনাগার ইত্যাদির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৩. নিরাপত্তা (Security) :
কর্মী কাজের ক্ষেত্রে যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করে তবে তার ওপর একটা মানসিক চাপ পড়ে। ফলশ্রুতিতে কর্মস্পৃহা লোপ পায়। সেজন্য কাজের ক্ষেত্রে ঝুঁকির পরিমাণ যথাসম্ভব কমানোর চেষ্টা করা দরকার । তদুপরি চাকরি যাওয়ার ভয় যাতে তাকে ব্যাকুল না করে সে দিকেও খেয়াল রাখা আবশ্যক ।
৪. আকর্ষণীয় কাজ (Attractive work) :
কর্মীরা আনন্দদায়ক ও অবদানমূলক কাজে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসাহিত হয়। তাই কাজকে আনন্দপূর্ণ করা এবং কর্মী যে কাজ করছে তার গুরুত্ব তাদের নিকট তুলে ধরার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন । তদুপরি কর্মীদের প্রবণতা অনুসন্ধান এবং সে অনুযায়ী কাজ দেয়া আবশ্যক ।
৫. উত্তম ব্যবহার (Fair treatment) :
ভালো ব্যবহারে যেমন অর্থ ব্যয় হয় না তদুপরি এর ফলাফলও অত্যন্ত বেশি । একজন নির্বাহী বা তত্ত্বাবধায়ক যদি তার কাজে দক্ষ হয়, অধস্তনদের সাথে সদয় ব্যবহার করে, তাদের সুখে-দুখের সাথী হয় এবং যোগ্য শিক্ষক হিসেবে তাদের মানোন্নয়নের চেষ্টা করে তবে সহজেই অধস্তনদের মনে স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ সৃষ্টি করে কাজ আদায় করা সম্ভব ।
৬. ভালো কাজের প্রশংসা (Appreciation of worthwhile work) :
মানুষ তার কৃতকর্মের প্রশংসা শুনলে স্বাভাবিকভাবেই উদ্দীপ্ত হয় । তাই কর্মীদের অধিক কাজের জন্য যেমনি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দান ও তত্ত্বাবধান করতে হয় তেমনি ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করা উচিত।
৭. প্রশিক্ষণ সুবিধা (Training facility) :
উত্তম প্রশিক্ষণ, কর্মীদের দক্ষতা ও মনোবল বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে । এটি কর্মীদের পদোন্নতি লাভে বা অধিক দায়িত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণে সক্ষম ও সাহসী করে তোলে । তাই উত্তম প্রশিক্ষণ সুবিধা কর্মীদের প্রণোদনা সৃষ্টির একটি অন্যতম উপায়।
৮. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা (Democratic management) :
ব্যবস্থাপনা যদি স্বেচ্ছাচারী না হয়ে কর্মীদের চিন্তা-ভাবনার প্রতি মূল্য দেয়, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পরামর্শ গ্রহণ করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামত নেয় এবং অভাব-অভিযোগের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তবে নির্বাহী তথা প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের সুধারণার সৃষ্টি হয় । ফলে কার্যক্ষেত্রে তাদের উৎসাহ বাড়ে ।
১০. মালিকানায় অংশগ্রহণের সুযোগ (Opportunity to participation in ownership) :
বর্তমানকালে কর্মীদের প্রণোদিত করার উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে দেখা যায় । কোম্পানির ক্ষেত্রে শেয়ারের একটি অংশ সহজ শর্তে কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করা যেতে পারে । এতে কর্মীদের মনে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ও এর কাজে আগ্রহ বৃদ্ধি পায় ।
১১. সুবিচার প্রতিষ্ঠা (Establishing equity) :
প্রতিষ্ঠানের কার্যাকার্যে অন্যায়-অবিচার স্বভাবতই কর্মীদের ক্ষুব্ধ করে । প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে ও সকল কার্যে যদি সুবিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় এবং সকল কর্মীদের সাথে সমান আচরণ করা যায় তবে তা কর্মীদের প্রণোদিত করে।
১২. শ্রমিক সংঘ করার সুযোগ (Granting union right) :
শ্রমিক সংঘ করার অধিকার বর্তমানকালে শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে শ্রমিকদের অন্যতম দাবি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই শ্রমিক সংঘ করার সুযোগও কর্মীদের উৎসাহের একটি কারণ হয়ে থাকে ।
১৩. প্রতিষ্ঠানের সুনাম (Goodwill of the organization) :
কর্মী যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তার সুনাম- সুখ্যাতিও কর্মীদের মাঝে প্রেরণা যোগায় । ভালো প্রতিষ্ঠান কর্মীরা সহজে ছাড়তে চায় না। বরং তা তাদের গর্বের বস্তুতে পরিণত হয় ।

১৪. শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি (Creating education facilities) :
বর্তমানকালে সন্তান-সন্ততির শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সমস্যা ও ব্যয় অত্যন্ত বেশি। প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার মাধ্যমেও কর্মীদের অনুপ্রাণিত করা যায় ।
১৫. অন্যান্য প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা (Other motivational arangements) :
কর্মীদের মানসিক প্রশান্তি ও কাজে একঘেঁয়েমি দূর করার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা; যথা- খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বনভোজন ইত্যাদির ব্যবস্থা করা যেতে পারে । উপসংহারে বলা যায়, প্রেষণা দানের উপরোক্ত বিভিন্ন উপায়-উপাদান কর্মীদের সহজেই উদ্দীপ্ত করে থাকে । তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কোন্ উপায় কতখানি প্রয়োগযোগ্য তা বিশেষভাবে বিবেচনাসাপেক্ষ । আর্থিক উপায়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হয়। তবে উপরোক্ত বিভিন্ন উপায়-পদ্ধতি সাধ্যানুযায়ী ব্যবহারে ব্যবস্থাপকদের সব সময়ই সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন ।
