বাংলাদেশে শিল্প শ্রমিকদের প্রণোদিত করার উপায়

আজকের আলোচনার বিযয় বাংলাদেশে শিল্প শ্রমিকদের প্রণোদিত করার উপায় – যা প্রেষণা এর অর্ন্তভুক্ত, বাংলাদেশ শিল্পে অনুন্নত একটি উন্নয়নশীল দেশ । ভয়াবহ বেকার সমস্যার কারণে এদেশের শিল্প শ্রমিকদের চাওয়া-পাওয়া বলতে গেলে একান্তই সীমিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ সামান্য প্রত্যাশা হতেও আজ তারা বিভিন্নভাবেই বঞ্চিত । তাই ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করেই আমাদের দেশের শিল্প শ্রমিকদের প্রণোদনা যোগানো সম্ভব। বাংলাদেশের শিল্প শ্রমিকদের প্রেষণা দিতে চাইলে যে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

বাংলাদেশে শিল্প শ্রমিকদের প্রণোদিত করার উপায়

 

বাংলাদেশে শিল্প শ্রমিকদের প্রণোদিত করার উপায়

 

১. উপযুক্ত মজুরি (Fair wages) :

আমাদের দেশের শিল্প শ্রমিকদের মজুরি নেহায়েতই কম । বেসরকারি অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম মজুরি বলে তেমন কিছুই নেই । অথচ ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মজুরি পাওয়া প্রত্যেক শ্রমিকের মৌলিক অধিকার । তাই আমাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে শ্রমিক-কর্মীদের উপযুক্ত মজুরি দেয়ার মাধ্যমে সহজেই তাদের কাজে উদ্বুদ্ধ করা যায় ।

২. বোনাস (Bonus) :

বর্তমানকালে সর্বত্রই শ্রমিক-কর্মীদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে বোনাস একটি ফলপ্রসূ পর্বকে কেন্দ্র করে বোনাস দিয়ে এবং সাধ্যানুযায়ী বোনাসের পরিমাণ বাড়িয়েও শিল্প শ্রমিকদের উৎসাহ দেয়া |

৩. আর্থিক নিরাপত্তা (Financial security) :

ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি প্রত্যেক শ্রমিক-কর্মীর নিকটই অতীব মূল্যবান । আমাদের দেশে সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে এরূপ নিরাপত্তার কিছুটা ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে তা নেই বললেই চলে । প্রভিডেন্ড ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, পেনশন, গ্রুপ বীমা ইত্যাদির ব্যবস্থা করেও শিল্প শ্রমিকদের প্রেষণা দেয়া যায় ।

৪. চাকরির নিরাপত্তা (Job security) :

আমাদের দেশের বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে শিল্প শ্রমিকদের চাকরি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থায়ী নয় । যেকোনো সময় চাকরি চলে যাওয়ার ভয়ে তারা সবসময়ই কার্যক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন থাকে । তাই চাকরির নিরাপত্তা বিধান করেও কর্মীদেরকে সহজে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব । 

৫. বাসস্থান সুবিধা (Accomodation facilities) :

বাসস্থান মানুষের মৌলিক অভাবের অন্তর্ভুক্ত । এ অভাব দূরীকরণে এ দেশের প্রতিষ্ঠানসমূহ সাধ্যানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেও শিল্প শ্রমিকদের কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে শ্রমিক-কর্মীদের জন্য সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকলেও আধিকাংশ বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানে তা এখনও অবহেলিত । বাসস্থান ভাতা হিসেবে যা দেয়া হয় তাও বাস্তব অর্থে অপ্রতুল ।

৬. পরিবহন সুবিধা (Transportation facilities) :

শহরের অভ্যন্তরে যে সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেখানে দেখা যায় শ্রমিক-কর্মীরা শহরের বাইরে থেকে এসে কাজ করে । অথচ অল্প বেতনের শ্রমিক-কর্মীর পক্ষে প্রতিদিন অর্থ ব্যয় করে চাকরি স্থলে আসা সম্ভব হয় না। তাই তাদেরকে পরিবহন সুবিধা অন্যথায় পরিবহন ভাতা প্রদান করেও কাজে উদ্বুব্ধ করা সম্ভব ।

৭. চিকিৎসা সুবিধা (Medicare facilities) :

আমাদের দেশের শিল্প শ্রমিকরা স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতন এবং যে কারণে এদের অধিকাংশই নানান ধরনের অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত থাকে । তাই শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক- কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য নিজস্ব ডাক্তার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধার ব্যবস্থা করা যেতে পারে ।

৮. অগ্রিম বা ঋণ সুবিধা (Advance or loan facilities) :

আমাদের দেশের শ্রমিক-কর্মীদের সঞ্চয়ের সামর্থ্য নেই বললেই চলে । তাই তাদের বিপদে-আপদে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে বেতন বা প্রভিডেন্ড ফান্ডের বিপক্ষে ঋণ মঞ্জুর করেও কাজে উৎসাহিত করা যায় ।

৯. সুষ্ঠু কর্ম পরিবেশ (Good working environment) :

উত্তম কর্ম পরিবেশে কর্মীরা স্বাভাবিকভাবেই কাজে উদ্বুদ্ধ হয় । অথচ আমাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক কর্ম পরিবেশ খুবই নিম্নমানের । পর্যাপ্ত স্থান, আলো-বাতাস, পানি, টয়লেট সুবিধা, উপাসনালয় ইত্যাদির সুব্যবস্থা করে ও প্রতিষ্ঠান সবসময় পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন রেখে কর্ম পরিবেশ উন্নয়ন ও কর্মীদের প্রেষণা দেয়া সম্ভব । 

 

১০. দক্ষ তত্ত্বাবধান (Efficient supervision) :

একজন ভালো তত্ত্বাবধায়ক তার দক্ষতা ও আচরণ দিয়ে অধস্তনদেরকে কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারে । অথচ আমাদের তত্ত্বাবধায়করা অধিকাংশই গতানুগতিক মানসিকতার অধিকারী । তাই নির্বাহী বা তত্ত্বাবধায়কগণ আধুনিক ও গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতা সহযোগে যথাযথ তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে অধস্তনদের মনে উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারে । 

১১. উত্তম ব্যবহার (Fair treatment) :

উত্তম ব্যবহারে কোনো অর্থ ব্যয় হয় না কিন্তু এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী । আমাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে ঊর্ধ্বতনদের পক্ষ হতে যদি অধস্তন শ্রমিক-কর্মীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা হয় এবং তাদের প্রতি ঊর্ধ্বতন সহমর্মী থাকে সেক্ষেত্রে অধস্তনদের মনোবল অনেক উন্নত হতে পারে ।

১২. ওভারটাইম মূল্যায়ন (Evaluation of overtime work) :

শ্রমিক-কর্মীরা অনেকসময় আর্থিক অসুবিধার কারণেই ওভারটাইম খেটে কিছু বাড়তি আয়ের চিন্তা করে । তাই যে সকল প্রতিষ্ঠানে এরূপ সুযোগ রয়েছে সেখানে কর্মীদের ওভারটাইম খাটার সুযোগ প্রদান ও সুষ্ঠু নিয়মের আলোকে তার যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত । 

১৩. কেন্টিন সহযোগিতা (Canteen facilities) :

শ্রমিক-কর্মীরা কাজের ফাঁকে বিরতিকালে হালকা নাস্তা বা খাবারের প্রত্যাশা করে । তাই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এ ধরনের কেন্টিনের ব্যবস্থা করে এবং সেখান হতে কিছুটা কম মূল্যে (Subsidize value) শ্রমিক-কর্মীদের নাস্তা পরিবেশন করেও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কাজে উৎসাহিত করা সম্ভব।

 

বাংলাদেশে শিল্প শ্রমিকদের প্রণোদিত করার উপায়

 

১৪. অন্যান্য (Others) :

উপরোক্ত বিভিন্ন উপায়ের বাইরেও অমাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সুবিধামতো শ্রমিক-কর্মীদের ছেলেমেয়ের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে । এছাড়া খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিরও আয়োজন করা যায়। শ্রমিক সংঘ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিলেও তাদের মনোবল উন্নত হতে পারে। 

উপসংহারে বলা যায়, শ্রমিক-কর্মীদের বাদ দিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানের উন্নতি কখনই প্রত্যাশা করা যায় না । তাই শ্রমিক-কর্মীদের মনোবল উন্নত করার জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনায় যেভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়ে থাকে আমাদের দেশেও শিল্প ব্যবস্থাপকদেরকে সেগুলো চিন্তা করে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন । এক্ষেত্রে উপরোক্ত বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি সাধ্যানুযায়ী গুরুত্বারোপ করে আমাদের শিল্প শ্রমিকদের কর্মোদ্দীপ্ত করা যেতে পারে ।

Leave a Comment