আজকের আলোচনার বিযয় নিয়ন্ত্রণের আদর্শ বা নীতিমালা – যা নিয়ন্ত্রণ এর অর্ন্তভুক্ত, আদর্শ বা নীতি বলতে কোনো কার্য সম্পাদনের যথার্থ পথ-নির্দেশনা (Guide-line) কে বুঝায় । আদর্শ বলে দেয় কী করা উচিত বা কীভাবে কাজটি সম্পাদিত হলে বা সম্পাদন করলে লক্ষ্যার্জন সম্ভব । নিয়ন্ত্রণ হলো একটি প্রক্রিয়া ।
মান নির্ধারণ, প্রকৃত ফলাফল নিরূপণ, মানের সাথে ফলাফলের তুলনা, বিচ্যুতি ঘটে থাকলে তা নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এরূপ বিচ্যুতি যাতে না ঘটে এজন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এরূপ প্রক্রিয়ার অধীন । পরিকল্পনার এ গুরুত্বপূর্ণ কার্যকে সঠিকভাবে সম্পাদনের ক্ষেত্রেও কতিপয় আদর্শ বা মূলনীতির অনুসরণ করা যেতে পারে । নিম্নে তা তুলে ধরা হলো:

Table of Contents
নিয়ন্ত্রণের আদর্শ বা নীতিমালা
১. উপযুক্ততার নীতি (Principle of suitability) :
এরূপ নীতি বলতে নিয়ন্ত্রণের যথাযথ পদ্ধতিকে যথাযথ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করাকে বুঝায় । যে ক্ষেত্রে সংখ্যাত্মক মান নির্ধারণ এবং অর্জিত কার্যফলকে তার সাথে তুলনা করে বিচ্যুতি নিরূপণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করা অসম্ভব সেখানে বাজেটারি নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আরোপ করা যায় না । কর্মীদের মান নিয়ন্ত্রণে বাজেটারি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োগ যথার্থ নয় । সেখানে বিশেষ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা যেতে পারে । তাই প্রতিষ্ঠানের যেই পর্যায়ে এবং যেই কাজে যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উপযুক্ত মনে হয় সেখানে তার প্রয়োগ করায় সমীচিন ।
২. সরলতার নীতি (Principle of simplicity) :
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অবশ্যই সহজ ও বোধগম্য হওয়া আবশ্যক । স্ব-স্ব বিভাগ বা উপবিভাগের নির্বাহীগণ তার অব্যবহিত অধস্তনদের কার্য নিয়ন্ত্রণ করে । তাই নিয়ন্ত্ৰণ ব্যবস্থা যদি এমন হয় যা বুঝে উঠতে স্বয়ং নির্বাহীই অস্পষ্টতায় ভোগে তবে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করা যায় না । এছাড়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জটিল হলে তা সময় সাপেক্ষ ও ব্যয় সাপেক্ষ হয় । ফলে তা কার্যকর ফল দিতে পারে না।
৩. দ্রুততার নীতি (Principle of promptness) :
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দ্রুত বিচ্যুতি নিরূপণযোগ্য এবং সংশোধনী ব্যবস্থা গ্রহণের উপযোগী হওয়া আবশ্যক। পরিকল্পনা বা মান এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত যাতে তাকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা যায়। ফলে একটা পর্যায় পর্যন্ত কাজ হওয়ার পরই তা মূল্যায়নপূর্বক বিচ্যুতি নিরূপণ ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী ব্যবস্থা গ্রহণ সহযোগে পরবর্তী কাজ সম্পাদিত হতে পারে । ফলাফল মূল্যায়ন, বিচ্যুতি নিরূপণ, বিচ্যুতির কারণ নির্ণয় ইত্যাদি কাজেই যদি অনেক সময় লেগে যায় তবে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব ঘটে । ফলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হলেও তাথেকে কার্যকর ফললাভ সম্ভব হয় না ।
৪. নমনীয়তার নীতি (Principle of flexibility) :
নমনীয়তা বলতে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি বিধানের সামর্থ্যকে বুঝায় । নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তা তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হয় । কার্যক্ষেত্রে বিচ্যুতির কারণ নির্ণয়ে দেখা গেলো- কিছু কর্মকর্তার ভুলের জন্য এরূপ ঘটেছে । এখন তাদেরকে কীভাবে সংশোধন করা সম্ভব এক্ষেত্রে পূর্বে গৃহীত ব্যবস্থা সবসময়ই প্রযোজ্য হবে তা অমূলক প্রত্যাশা বৈ কিছুই নয় । এভাবে বাজেটারি নিয়ন্ত্রণে যে বাজেট তৈরি করা হয়েছে তা সবসময়ই ঠিক থাকবে তাও প্রত্যাশিত নয় । তাই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় অবশ্যই নমনীয়তার আদর্শ অনুসরণ করতে হয় ।
৫. ভবিষ্যৎ দর্শনের নীতি (Principle of future looking) :
নিয়ন্ত্রণ হলো পরবর্তী পরিকল্পনার ভিত্তি । তাই নিয়ন্ত্রণ -ব্যবস্থা এমন হওয়া আবশ্যক যাতে তা ভবিষ্যত করণীয় সম্পর্কে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে সমর্থ হয় । উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার পিছনে কোনো একটা বিভাগের দায় নিরূপণই যথেষ্ট নয় । উক্ত বিভাগ কেনো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, ভবিষ্যতে এরূপ অবস্থা যাতে কোথাও না ঘটে এজন্য ঊর্ধ্বতন ও সংশ্লিষ্ট নির্বাহীদের কী করা উচিত-নিয়ন্ত্রণ -ব্যবস্থায় তারও দিক নির্দেশনা থাকা আবশ্যক । ফলে তা পরবর্তী পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে ।
৬. ব্যতিক্রমের নীতি (Principle of exception) :
ব্যতিক্রমের নীতি বলতে কার্যক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করে সেক্ষেত্রে বিশেষ কর্মব্যবস্থা গ্রহণ করাকে বুঝায়। পরিকল্পনার আওতায় সম্পাদিত সকল ক্ষেত্রে বিচ্যুতির সম্ভাবনা থাকে না । আবার বিচ্যুতির ফলাফলও সকল ক্ষেত্রে সমান হয় না । তাই যে সকল ক্ষেত্রে বিচ্যুতির ফলাফল সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ধরনের বিচ্যুতির সৃষ্টি করে সেগুলোকে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।
৭. মিতব্যয়িতার নীতি (Principle of economy) :
নিয়ন্ত্রণ -ব্যবস্থা আরোপে মিতব্যয়িতার নীতিরও অনুসরণ করা আবশ্যক। এরূপ নীতি বলতে সর্বোচ্চ কম খরচ ও ব্যয়ে কার্যক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপকে বুঝায়। অনেক সময় দেখা যায় মান নির্ধারণ, প্রকৃত কর্মফল মূল্যায়ন, বিচ্যুতি নিরূপণ ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা হয়। এরূপ ব্যয়ের ফলে নিয়ন্ত্রণ কাজে জটিলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিলম্বও ঘটে । তাই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সহজ ও স্বল্প ব্যয় সাপেক্ষ হওয়া উচিত ।

৮. দক্ষতার নীতি (Principle of efficiency) :
দক্ষতা বলতে কম অর্থ ও শক্তি ব্যয়ে সঠিক কাজ করাকে বুঝায় । নিয়ন্ত্রণ যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এক্ষেত্রে দক্ষতার নীতির অনুসরণ করা না হলে তা পক্ষান্তরে প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা ও নানান ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে । নিয়ন্ত্রণ -ব্যবস্থা ত্বরিত বিচ্যুতি নিরূপণ ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে পরবর্তী পরিকল্পনা সঠিকভাবে গ্রহণ করা যায় না । এছাড়া কোনো সমস্যার যথাযথ সমাধান না হলে তা নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে । তাই নিয়ন্ত্রণ- ব্যবস্থা আরোপে দক্ষতার নীতি অনুসরণ করতে হয় ।
উপসংহারে বলা যায়, নিয়ন্ত্রণ -ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য উপরোক্ত মূলনীতি বা আদর্শের অনুসরণ করা আবশ্যক। আর তা করা হলে নিয়ন্ত্রণকে ফলপ্রদ করা যায়। যার ফলশ্রুতিতে ব্যবস্থাপনার সকল কাজেই গতিশীলতা বৃদ্ধি পায় ।
