ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্টে শ্রমিকসংঘ আইন 

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় শ্রমিকসংঘ আইন । এই পাঠটি “ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্টে” বিষয়ের “শ্রম ও শিল্প আইন” বিভাগের একটি পাঠ।

 

  শ্রমিকসংঘ আইন

 

  শ্রমিকসংঘ আইন 

 

তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৯ সালে শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশ জারী করে। ১৯৭৫ ও ১৯৮৫ সালে সংশোধনপূর্বক ১৯৬৯ সালের শিল্পসম্পর্ক অধ্যাদেশ বর্তমানে আমাদের দেশে বলবৎ রয়েছে। ১৯৬৯ সালের শিল্পসম্পর্ক অধ্যাদেশ এর আওতায় শ্রমিক-কর্মচারীরা শ্রমিকসংঘ গঠন করার অধিকার রাখে। দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং প্রশাসনিক চাকুরিতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উক্ত অধ্যাদেশটি প্রযোজ্য নয়। শ্রমিকে মালিকে, শ্রমিকে শ্রমিকে এবং মালিকে মালিকে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে শ্রমিকসংঘ বা ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয় ।

 

(ক) শ্রমিকসংঘের সংজ্ঞা (Definition of trade union) :

১৯৬৯ সালের শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশের ২ (xxvi) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘শ্রমিকসংঘ’ বলতে শ্রমিকদের বা কর্মচারীদের যে কোন সংঘ বা সমিতিকে বুঝায়, যা গঠনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে বা দুই শ্রমিকের মধ্যে অথবা দুই মালিকের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা যে কোন ব্যবসায় বা বাণিজ্য পরিচালনার উপর নিয়ন্ত্রক শর্ত আরোপ করা । দুই বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত ফেডারেশনও এর অন্তর্ভুক্ত।

 

(খ) শ্রমিকসংঘের উদ্দেশ্য (Objectives of trade union) :

শ্রমিকসংঘের উদ্দেশ্যসমূহ নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হল-

১। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাসমূহ ও জীবনযাত্রার মানের সাথে সঙ্গতি রেখে শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত মজুরি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা করা এবং এর মাধ্যমে তাদের উন্নত আর্থিক মর্যাদা দান করা।
২। ব্যবস্থাপকদের স্বজনপ্রীতি ও অসদাচরণ রোধ করা।
৩। প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব পারিবর্তন করা এবং উত্তম মানবীয় সম্পর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা। ৪। শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের বিরোধ হ্রাসের মাধ্যমে উত্তম শিল্পসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা ।
৫। শ্রমিকদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি করা।
৬। শ্রমিকদের আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
৭। ব্যবস্থাপনার উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা অর্জন করা
৮। সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করে শ্রম স্বার্থের অনুকূলে আইন প্রণয়ন করা ।
৯। শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে মালিকপক্ষ বা ব্যবস্থাপনার সাথে দর কষাকষিতে লিপ্ত হওয়া।

 

(গ) শ্রমিকসংঘের নিবন্ধন (Registration of trade Union):

১৯৬৯ সালের শিল্পসম্পর্কে অধ্যাদেশে শ্রমিকসংখ নিবন্ধনের যে পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে তা নিম্নরূপ-

 

১। নিবন্ধনের জন্য আবেদন ঃ

যে কোন শ্রমিকসংঘের সভাপতি ও সম্পাদকের স্বাক্ষর সম্বলিত আবেদনপত্র পেশ করে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারবে। [৫ ধারা।।

 

২। আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ ঃ

১৯৬৯ সালের শিল্পসম্পর্কে অধ্যাদেশের ৬ ধারায় বলা হয়েছে যে, ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশনের জন্য সকল আবেদনপত্র রেজিস্ট্রারের নিকট পেশ করতে হবে এবং আবেদনপত্রের সাথে নিম্নোক্ত বিষয়াদি থাকতে হবে-

১। ট্রেড ইউনিয়নের নাম ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা।
২। ইউনিয়ন গঠনের তারিখ ।
৩। ইউনিয়ন কর্মকর্তাদের নাম, পদবি, বয়স, ঠিকানা ও পেশা।
৪। চাঁদা পরিশোধকারী সদস্যের সংখ্যা।
৫। ফেডারেশন হলে সদস্য ইউনিয়নসমূহের নাম, ঠিকানা, ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর । ৬। তিন কপি গঠনতন্ত্র এবং গঠনতন্ত্র গৃহীত হবার সিদ্ধান্তের কপি ৩ প্রস্থ।
৭। রেজিস্ট্রেশনের আবেদন করার জন্য সভাপতি ও সম্পাদকে দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তাবের কপি ।
৮। ফেডারেশনের ক্ষেত্রে সদস্য ইউনিয়নসমূহের ফেডারেশনভুক্ত হবার সিদ্ধান্তের কপিসমূহ।

 

৩। নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাদি ঃ

গঠনতন্ত্রে কী কী তথ্য অবশ্যই থাকতে হতে তার বিবরণ অত্র অধ্যাদেশের 8 ৭ ধারায় বিবৃত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নের নাম ও ঠিকানা, ইউনিয়ন গঠনের উদ্দেশ্য, ইউনিয়নের তহবিলের উদ্দেশ্য, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কমপক্ষে তিন-চতুর্থাংশ শ্রমিক এই ইউনিয়নের সদস্য, গঠনতন্ত্রে সদস্যদেরকে প্রদত্ত সুযোগ- সুবিধার বর্ণনা ও শর্তসমূহ, সদস্যদের উপর জরিমানা আরোপ ও সদস্যপদ বাতিল হবার কারণ, সদস্যদের তালিকা সংরক্ষণ এবং তা পরিদর্শনের ব্যবস্থা, গঠনতন্ত্র সংশোধন ও বাতিলের পদ্ধতি, তহবিলের নিরাপত্তা, আয়ব্যয়ের বার্ষিক অডিট এবং সদস্যদের হিসাব পরিদর্শনের ব্যবস্থা, ইউনিয়ন বিলোপের বিধান, কর্মকর্তা নির্বাচন পদ্ধতি, নির্বাচনের মেয়াদ তা দু’ বছরের অধিক হবে না, কর্মকর্তার উপর অনাস্থা প্রকাশের পদ্ধতির এবং কার্যনির্বাহী বা সাধারণ সভা অনুষ্ঠানের নিয়ম ।

 

৪। নিবন্ধনভুক্তকরণ ঃ

৮ ধারায় বলা হয়েছে যে, অধ্যাদেশে বর্ণিত সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে। এরূপ সন্তুষ্ট হওয়ার পর রেজিস্টার নির্দিষ্ট রেজিস্টারে ট্রেড ইউনিয়নকে নিবন্ধভুক্ত করবেন এবং আবেদন প্রাপ্তির ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে নিবন্ধন সার্টিফিকেট প্রদান করবেন। আবেদনে কোন প্রয়োজনীয় বিষয় বাদ পড়লে কিংবা যথার্থ বলে বিবেচিত না হলে রেজিস্টার আবেদন প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন তার জবাব দিবেন।

 

৫। নিবন্ধনপত্র প্রদান :

নিবন্ধন ৮ ধারার বিধানসাপেক্ষে কোন শ্রমিকসংঘকে নিবন্ধনভুক্ত করলে নির্ধারিত ফরমে নিবন্ধনের প্রত্যয়নপত্র প্রদান করবেন। এরূপ প্রত্যয়নপত্র শ্রমিকসংঘের নিবন্ধনের বিষয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে। উপরোক্ত পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে কোন শ্রমিকসংঘ নিবন্ধন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্মর্তব্য যে, নিবন্ধন না করে বা অনিবন্ধনকৃত কোন শ্রমিকসংঘ আইনানুগ শ্রমিকসংঘ হিসেবে কাজ চালাতে পারবে না ।

 

  শ্রমিকসংঘ আইন 

Leave a Comment