প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধানসমূহ

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধানসমূহ। শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী একটি দেশের উৎপাদনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। তাদের কর্মসংস্থান, সুরক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধান ও শ্রম আইন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট অধিকার ও সুরক্ষার বিধান দিয়েছে, যাতে তারা নিরাপদ ও ন্যায্য পরিবেশে কাজ করতে পারেন। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের বয়স, কাজের ধরন, দৈনিক ও সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা, ছুটি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি কাঠামো, বিধানসমূহ এবং তাদের বাস্তব প্রয়োগের দিক নিয়ে আলোচনা করব, যা একজন নিয়োগকর্তা ও শ্রমিক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক।

 

প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধানসমূহ

 

প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধানসমূহ

 

১৯৬৫ সালের কারখানা আইনের ২(খ) ধারা অনুসারে (নারী-পুরুষ নির্বিশেষ) কোন শ্রমিকের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

১। সাপ্তাহিক কার্যঘণ্টা ঃ

কারখানা আইনের ৫০(১) ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন কারখানায় কোন প্রাপ্তবয়স্ক মুহিতকে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে বলা যাবে না যা দেয়া যাবে না। ৫০(২) ধারায় বলা হয়েছে যে, ৫৮ ধারায় বর্ণিত বিধানের আলোকে অর্থাৎ অতিরিক্ত সময়ে কাজ করার ক্ষেত্রে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক দিনে ৯ ঘণ্টা বা সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবে।তবে শর্ত এ যে, এরূপ শ্রমিকের সাপ্তাহিক মোট কার্যকালীন সময় ৬০ ঘণ্টার বেশি হবে না এবং বাৎসরিক হিসেবে তা সপ্তায় ৫৬ ঘণ্টার অধিক হতে পারে না।

২। সাপ্তাহিক ছুটি :

কারখানা আইনের ৫২ ধারায় প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ছুটির বিষয়ে নিম্নরূপ বিধান প্রনত
হয়েছে।

(ক) কারখানায় নিযুক্ত কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের অবস্থানুযায়ী শুক্রবার বা রবিবার কাজ করতে বলা যাবে না। তবে যদি সাপ্তাহিক নির্ধারিত শুক্রবার বা রবিবারের ছুটির পূর্ববর্তী বা পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শ্রমিককে পূর্ণ একদিনের ছুটি প্রদান করা হয় সেক্ষেত্রে উক্ত দিনে কাজ করতে বলা যাবে।

৩। ক্ষতিপূরক সাপ্তাহিক ছুটি ঃ

৫১ ধারায় বিধানমতো কোন শ্রমিক তার সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করতে না পারলে তবেসে মাসেই অথবা পরবর্তী ২ মাসের মধ্যে সমপরিমাণ  দু’টি ক্ষতিপূরক ছুটি ভোগ করতে পারবে।

৪। দৈনিক কার্য সময় :

কারখানা আইনের ৫৩ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন কারখানায় কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে দৈনিক ৯ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে বলা যাবে না বা করতে দেয়া যাবে না। উল্লেখ্য যে, অত্র আইনের ৫০, ৫৪ ৫৫ ও ৫ ধারায় বিধান অনুযায়ী কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে ৯ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে দেয়া যেতে পারে তবে তা দশ ঘণ্টার অতিরিক্ত হতে পারবে না।

 

৫। বিশ্রাম বা আহারের জন্য বিরতি :

কারখানা আইনের ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন শ্রমিককে মাঝে এক ঘণ্টার বিরতি না দিলে, একনাগাড়ে ৬ ঘণ্টার বেশি বা মাঝখানে আধ ঘণ্টা বিরতি দিলে একনাগাড়ে ৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না।

৬। কাজের সময়ের ব্যাপ্তি ঃ

৫৪ ধারায় উল্লিখিত বিশ্রামের সময়সহ একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের দৈনিক কাজের সময় প্রধান পরিদর্শকের অনুমতি না নিয়ে সাড়ে ১০ ঘণ্টার বেশি হবে না, তবে তার অনুমতি সাপেক্ষে মৌসুমী কারখানায় একজন শ্রমিককে দৈনিক সাড়ে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো যেতে পারে। [৫৫ ধারা]

৭। নৈশ শিট ঃ

কারখানা আইনের ৫৬ ধারায় উল্লেখ আছে যে, কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক এমনভাবে শিফটে কাজ করে যেন কার্যসময় মধ্যরাত্রে অতিক্রান্ত হয়, সেক্ষেত্রে শিট শেষ হওয়ার পরবর্তী একনাগাড়ে ২৪ ঘন্টা তার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে ধরা হবে এবং মধ্যরাত্রির পর সে যতটুকু সময় কাজ করেছে তা পূর্ববর্তী দিনের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।

৮। শিট অতিক্রমণ :

কারখানা আইনের ৫৭(১) ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন কারখানার শিফট এমনভাবে নির্ধারণ করা যাবে না যেন একই সময়ে একই রকম কাজে একাধিক শিফটের শ্রমিক নিযুক্ত থাকে।

৯। অতিরিক্ত সময়ের কাজের ভাতা :

কারখানা আইনের ৫৮ ধারা মতে (ক) কোন শ্রমিক যদি কারখানায় এক দিনে ৯ ঘণ্টার বেশি বা সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার অধিক সময় কাজ করে তবে অতিরিক্ত সময়ের জন্য সে স্বাভাবিক বেতনের দ্বিগুণ হারে অতিরিক্ত ভাতা পাবে।

(খ) যে সকল কারখানার ঠিকাভিত্তিতে শ্রমিকদের মজুরি দেয়া হয় সেরে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা সাপেক্ষে সরকার বিহার নির্ধারণ করে দিতে পারে।

১০। দ্বৈত চাকরির ক্ষেত্রে বাধানিষেধ ঃ

কারখানা আইনের এক ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক নির্ধারিত শর্তাধীনে প্রধান পরিদর্শকের লিখিত অনুমতি ব্যতিরেকে একই দিনে দুটি কারখানার কর্মরত থাকতে পারবে না বা কাজ করতে দেয়া যাবে না।

১১। কাজের সময়কাল সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি :

প্রত্যেক কারখানার নিয়োজিত প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে কত সময় কাছ করতে হবে তা ১০৯ (২) ধারার বিধান অনুযায়ী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখপূর্বক নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে রাখতে হবে। ১২। প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের রেজিস্টার ও কার্ড সরবরাহ ও আইনের ৬১ (১১) ধারা অনুসারে প্রত্যেক কারখানায় কারখানা ব্যবস্থাপক প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের জন্য একটি রেজিস্টার সংরক্ষণ করবেন এবং কাজ চালানোর সময় কারখানাপরিদর্শক যেন যে কোন সময় তা পরিদর্শন করতে পারেন সে জন্য যথাযথভাবে সর্বক্ষণ তা সংরক্ষণ করতে হবে।

 

প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধানসমূহ

Leave a Comment