নগরায়ন এর বিস্তারিত। Innovation & Entrepreneurship

নগরায়ন এর বিস্তারিত ক্লাসটি পলিটেকনিকের ইনোভেশন এন্ড এন্টারপ্রিনিউরশিপ (৬৫৮৫৩) / উদ্ভাবন ও শিল্পোদ্যোগ (৬৫৮৫৩) (Innovation & Entrepreneurship, 65853) বিষয়ের ৫ম অধ্যায়ের পাঠ।

 

নগরায়ন এর বিস্তারিত

 

নগরায়ণ বিষয়ে বাংলাদেশের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতেই এখানে পুন্ড্রনগরের (বর্তমানে মহাস্থানগড় নামে পরিচিত) মতো নগর গড়ে উঠেছিল। নগরায়ণের দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও মোট জনসংখ্যার তুলনায় সরকারিভাবে সংজ্ঞায়িত নগরকেন্দ্রগুলিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর অনুপাত বিবেচনায় বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বের স্বল্পতম নগরায়িত দেশগুলির অন্যতম। এমনকি একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় ২০০১ সালেও জাতীয় জনসংখ্যার মাত্র ২৩ শতাংশ নগর ও শহরগুলিতে বাস করছিল। তবে জনসংখ্যার বিশাল আকৃতির কারণে চূড়ান্ত বিবেচনায় ২৩ শতাংশের অর্থ দাঁড়ায় ২৮ মিলিয়নেরও অধিক মানুষ।

 

নগরায়ন এর বিস্তারিত

 

বিগত শতাব্দীর সূচনালগ্নে ১৯০১ সালে ব্রিটিশ ভারতে অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশ ভূখন্ডে মোট জনসংখ্যার মাত্র ২.৪৩ শতাংশ (বা ০.৭ মিলিয়নের মতো) শহর এলাকায় বাস করতো। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। ১৯৪১ সালে জনসংখ্যার ৪ শতাংশেরও কম শহরে বাস করতো এবং শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১.৫৪ মিলিয়ন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে নগরায়ণে গতি সঞ্চারিত হয়। এসময় ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে পূর্ববঙ্গ (বর্তমানের বাংলাদেশ) হয় পূর্ব পাকিস্তান।

১৯৪১-১৯৫১ দশকের তুলনায় (১৮.৩৮%) ১৯৫১-১৯৬১ সময়কালে শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে (৪৫.১১%) বৃদ্ধি পায়। শহরাঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ১৯৫১ সালের ১.৮ মিলিয়ন থেকে ১৯৬১ সালে ২.৬ মিলিয়নে উন্নীত হয়। এই দ্রুত প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ১৯৪৭ সালের পর ভারত থেকে মুসলমানদের বড় মাপের অভিবাসন, যারা মূলত শহরাঞ্চলেই বসতি স্থাপন করে।

১৯৬১ থেকে ১৯৭৪ সাল মেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি ছিল বিস্ময়কর, যার হার ছিল ১৩৭.৬ শতাংশ। এ সময়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ঘটে গড়ে ৬.৭ শতাংশ, যা কিনা পূর্ববর্তী দশকে ছিল ৩.৭ শতাংশ। এই দ্রুত নগরায়ণকে দুটো কারণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, মূলত কর্মসংস্থানের সুযোগের সন্ধানে পল্লী অঞ্চল থেকে দরিদ্রদের শহরে অভিবাসন।

একটি হিসাব অনুযায়ী ১৯৭৪ সালে মোট শহুরে জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশই গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছিল। দ্বিতীয়ত, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ঘটে যাওয়া সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলিও নগরায়ণকে প্রভাবিত করেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার নতুন মর্যাদা ছিল একটি বড় আকর্ষণ।

১৯৬১ সালে মোট জনসংখ্যার ৫.২ শতাংশের তুলনায় ১৯৭৪ সালে শহুরে জনসংখ্যা ৮.৯ শতাংশে উন্নীত হয়। দুই আদমশুমারির মধ্যবর্তী ১৯৭৪-৮১ মেয়াদে এই পরিবর্তন ছিল ১১১ শতাংশ; এ সময়ে শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। পূববর্তী দশকের মতোই অভিবাসন ও প্রাকৃতিক প্রবৃদ্ধি দুটো উপাদানই এতে অবদান রেখেছিল। ১৯৭৪-৮১ সময়কালে শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৩০ শতাংশই ঘটেছিল শহরাঞ্চলের সংজ্ঞায় দেশব্যাপী ৪৬০টি থানা সদরকে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে।

১৯৮১-৯১ সময়কালে শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পূর্ববর্তী দশকের তুলনায় হ্রাস পেয়ে ৫.৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ১৯৯১ সালে মোট শহুরে জনসংখ্যা ছিল ২২.৪৫ মিলিয়ন, যা ছিল মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। আর ২০০১ সালে শহুরে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ২৮.৬ মিলিয়ন, যা মোট জনসংখ্যার ২৩.১ শতাংশ ছিল।

ভবিষ্যতে শহুরে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি  বাংলাদেশে বর্তমানে শহুরে জনসংখ্যা কতো তা সঠিকভাবে বলা দুষ্কর। এর জন্য আমাদের ২০১১ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত আদম শুমারির ফলাফল প্রাশের পূর্বপর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা কার্যক্রম ২০১০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়ন বলা হয়েছে। এই সংখ্যা বেশি মনে হলেও আতাহারুল ইসলামের গবেষণার ফলাফলে ২০১১ সালের ১৫৯.৪ মিলিয়ন জনসংখ্যা উপরোক্ত সংখ্যার যথার্থতাই প্রমাণ করে। জাতীয় নীতি নির্ধারকদের বিভিন্ন তথ্য বিবরণীতেও জনসংখ্যাকে ১৫০-১৬০ মিলিয়ন উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ২৫ শতাংশ নগরাঞ্চলে বাস করে- এই অনুমানের ভিত্তিতে ২০১০ সালে দেশের শহুরে জনসংখ্যা হবে ৩৭ থেকে ৪০ মিলিয়ন। ২০৫১ সালের জন্য জাতীয় জনসংখ্যার যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে সে অনুযায়ী তা সর্বনিম্ন ১৮৮.১ মিলিয়ন, মধ্যম ১৯৯.৩ মিলিয়ন এবং সর্বোচ্চ ২৪৩.৯ মিলিয়ন হতে পারে (ইসলাম, ২০০৩)।

তিনি ২০২১ সালের জন্য সর্বোচ্চ ১৮৫.২ মিলিয়ন জনসংখ্যার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা যথেষ্ট বাস্তবভিত্তিক বলে মনে হয়; এমনকি ২০১০ সালে জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়ন ধরা হলেও এই হিসাব কম বলেই মনে হবে। ২০৫১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং এরপর তা হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হয়।

২০২১ এবং ২০৫১ সালের জন্য উপরে বর্ণিত প্রাক্কলন অনুযায়ী মোট শহুরে জনসংখ্যা ২০২১ সালে ৫০ মিলিয়ন (২৭%) এবং ২০৫০ সালে ৮০ মিলিয়ন (৩৩%) হবে বলে অনুমান করা হয়। ২০৭৫ সাল নাগাদ শহুরে জনসংখ্যা ১২০ মিলিয়নে (মোট জনসংখ্যার ৫০%) উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে নগর কেন্দ্রের সংজ্ঞায় পরিবর্তন, জনসংখ্যার বণ্টনে নীতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে ভবিষ্যতে নগরাঞ্চল সম্প্রসারণের ধারায় নাটকীয় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই ৫০% শতাংশের পর্যায়টি ২০৫০ সালের অনেক আগেই অর্জিত হতে পারে।

বাংলাদেশের মত একটি ক্ষদ্র আয়তনের দেশে বিপুল জনসংখ্যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। বর্তমানের ১৬০ মিলিয়ন মানুষ ইতিমধ্যেই ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। শহরাঞ্চলে ৩৮ মিলিয়ন মানুষের বাসস্থান সঙ্কুলানই একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা আর এর দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা অনেকটাই দুঃসাধ্য ব্যাপার।

নগরায়ণ বৃদ্ধির উপাদান এবং অভিবাসনের কারণসমূহ  গত তিন দশকে বাংলাদেশে শহুরে জনসংখ্যার যে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটেছে তার পেছনে কয়েকটি কারণ সন্নিবেশিত রয়েছে। এর মধ্যে আছে: স্থানীয় শহুরে জনসংখ্যার প্রাকৃতিক প্রবৃদ্ধির উঁচু হার; বিদ্যমান নগর এলাকার ভূখন্ডগত বিস্তার ও এর সংজ্ঞায় পরিবর্তন এবং গ্রামাঞ্চল থেকে শহর এলাকায় অভিবাসন।

শহুরে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধিতে অভিবাসনই সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী উপাদান হিসেবে কাজ করেছে, ১৯৭৪-৮১ সময়কালে যার অবদান ছিল ৪০ শতাংশ। ঢাকার মতো বড় নগরীর ক্ষেত্রে এই অবদান আরো বেশি (৭০% শতাংশ পর্যন্ত) হতে পারে।

পল্লী এলাকা থেকে শহরাঞ্চলে উচ্চ হারে অভিবাসনের পেছনে পল্লীর বহির্মুখী ‘চাপ’ ও শহরের অন্তর্মুখী ‘টান’ কাজ করেছে। বড় নগর-কেন্দ্রগুলো, বিশেষত ঢাকা থেকে গেছে প্রধানতম আকর্ষণ হিসেবে। গ্রামাঞ্চল থেকে বহির্মুখী অভিবাসনের পেছনে গ্রাম্য দারিদ্র্য ও ভূমিহীনতা ছিল মুখ্য কারণগুলি অন্যতম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষত নদীতীরের ভাঙন প্রায়শই তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কাজ করেছে। শহুরে ‘টান’-এর মধ্যে আছে কর্মসংস্থানের প্রকৃত ও ধারণাগত সুযোগ এবং আর্থ-সামাজিক সুযোগ-সুবিধা।

 

 

নগরায়ন এর বিস্তারিত এর বিষয়বস্তুঃ

 

Leave a Comment