গ্রামীন ব্যাংক | Innovation & Entrepreneurship

গ্রামীন ব্যাংক এর ইনোভেশন এন্ড এন্টারপ্রিনিউরশিপ বা উদ্ভাবন ও শিল্পোদ্যোগ [Innovation & Entrepreneurship] ৬৫৮৫৩ [ 65853] বিষয়ের, ৫ম অধ্যায় [ বাংলাদেশের শিল্প ধারণার উৎস সমূহ ও মূল্যায়ন ] Chapter 5 [Source and Evaluation of Venture Ideas in Bangladesh] এর পাঠ।

 

গ্রামীন ব্যাংক

 

গ্রামীণ ব্যাংক  দেশের পল্লী অঞ্চলের ভূমিহীন দরিদ্র নারী-পুরুষদের জন্য ঋণ সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩-এর অধীনে একটি কর্পোরেট সংস্থা হিসেবে ঐ বছরের অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষ ধরনের ব্যাংক। ব্যাংকটি ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতোমধ্যে বিশ্ব জুড়ে খ্যাতিলাভ করেছে। চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলাধীন জোবরা গ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক ১৯৭৬ সালে চালু করা পল্লী ব্যাংকিং-এর একটি পাইলট প্রকল্প থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের উৎপত্তি।

 

গ্রামীন ব্যাংক

 

গ্রামের ভূমিহীন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নির্ভরযোগ্য উপায়ে জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের উপযোগিতা ও সাংগঠনিক কাঠামোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে জোবরা গ্রামে গ্রামীণ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। দরিদ্রদের, বিশেষত মহিলাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করলে তারা উৎপাদনমুখী আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম কি-না এ সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করাও গ্রামীণ প্রকল্পের অপর একটি উদ্দেশ্য ছিল।

প্রকল্পটির আশাব্যঞ্জক ফলাফলের ভিত্তিতে মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইল জেলার আরও কয়েকটি গ্রামে এর সম্প্রসারণ ঘটান। বাংলাদেশ ব্যাংক এ সম্প্রসারিত প্রকল্পের জন্য তহবিলের যোগান দেয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ)-এর আর্থিক সহায়তায় ১৯৮২ সালে প্রকল্পটি ঢাকা, রংপুর এবং পটুয়াখালী জেলায় সম্প্রসারণ করা হয়। এতদিনে প্রকল্পটি দরিদ্রদের জন্য একটি ব্যাংকিং কাঠামোতে উন্নীত হয়।

ফলে গ্রামীণ প্রকল্পের ব্যাংকিং ইউনিট সৃষ্টিপূর্বক সেগুলিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির স্থানীয় শাখার সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে ঋণদান ও আদায় কার্যক্রম চালানো হয়। গ্রামীণ প্রকল্পটিকে গ্রামীণ ব্যাংক নামকরণ করে একটি বিশেষায়িত ঋণদান প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। শুরুতে গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ও পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১০০ মিলিয়ন ও ৩০ মিলিয়ন টাকা। ব্যাংকের মূলধন প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যের সাধারণ শেয়ারে বিভক্ত।

এর মোট পরিশোধিত মূলধনের ৪০% ব্যাংকটির ঋণগ্রহীতাগণ এবং অবশিষ্ট ৬০% বাংলাদেশ সরকার ও সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিশোধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে এর কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকটির অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধি করা হয়। ফলে ৩১ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৫০০ মিলিয়ন ও ৩৫৮মিলিয়ন টাকা।

ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের ৩.৩৫% বাংলাদেশ সরকার, ০.৮৪% সোনালী ব্যাংক, ০.৮৪% বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং ৯৪.৯৭% ঋণগ্রহীতাগণ কর্তৃক পরিশোধিত। ঋণ গ্রহীতাদের পরিশোধিত অংশ তথা ৯৪.৯৭% এর মধ্যে ৪.২৩% পুরুষ ঋণগ্রাহক এবং ৯০.৭৪% মহিলা ঋণগ্রাহকগণ কর্তৃক পরিশোধিত।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভূমিহীন দরিদ্র জনগণকে আয় সৃষ্টিকারী ও জীবিকানির্ভর নানাবিধ কাজের জন্য নগদ অর্থ অথবা উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে জামানতবিহীন ঋণদান করাই গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কাজ। এ ছাড়া, ব্যাংকটি আমানত গ্রহণ করে এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিজস্ব সমঙদ জামানত রেখে বা অন্যান্য উপায়ে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করে।

তবে এটি বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে না। ব্যাংকটি সরকারি সিকিউরিটিজ ক্রয়সহ ক্ষুদ্র ব্যবসায় ও শিল্পে বিনিয়োগ করার জন্য এর গ্রাহকদেরকে পেশাগত ও কারিগরি পরামর্শসেবা প্রদান করে। এতদ্ব্যতীত গ্রামীণ ব্যাংক আয়সৃষ্টিকারী কাজ ও ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলির স্থায়িত্ব ও সম্ভাব্যতা নিয়ে গবেষণা করে।

আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য ঋণ সুবিধা পাওয়া একটি মানবিক অধিকার- এ নীতির ভিত্তিতে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রচলিত ব্যাংকিং-এ জনগণকে ঋণ গ্রহণের জন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়, অর্থাৎ ঋণ গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তিকে সশরীরে ব্যাংকে হাজির হতে হয়। কিন্তু গ্রাহকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ তহবিল নিয়ে তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর নীতির ভিত্তিতে তার ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে।

ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংক পল্লী অঞ্চলের ভূমিহীন ও অশিক্ষিত নারীদেরকে নিজস্ব ব্যবসায়, অন্যান্য আয়সৃষ্টি ও আয়বর্ধক কার্যাবলি হাতে নেওয়া ও চালানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এতে দরিদ্র মহিলারা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে কিছুটা স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরশীলতা, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষমতা লাভ করে।

বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণের গ্রামীণ মডেল বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশসহ আমেরিকা, কানাডা, জার্মানি এবং ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ/হ্রাসে ব্যবহূত হচ্ছে। ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ ও আদায়ের পদ্ধতি দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য একটি কার্যকর ও ফলপ্রসু মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি স্বরূপ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেছে।

 

 

নগরায়ন এর বিস্তারিত এর বিষয়বস্তুঃ

 

Leave a Comment