বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তাপ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নতুন উদ্যোগ

বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে এবং আগামী সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক নিশ্চিত করতে শনিবার (২৬ অক্টোবর) মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে মুখোমুখি হচ্ছেন দুই দেশের শীর্ষ অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা।

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশসমূহের সংস্থা (আসিয়ান) সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশ চেষ্টা করবে নতুন সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে। কারণ ট্রাম্প আগামী ১ নভেম্বর থেকে চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক এবং নতুন বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা আরোপের হুমকি দিয়েছেন। চীন সম্প্রতি বিরল খনিজ পদার্থ ও ম্যাগনেট রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

গত মে মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের চার দফা আলোচনায় তৈরি হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি এই নতুন পদক্ষেপে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শনিবারের বৈঠকে বেসেন্ট, গ্রিয়ার ও হে লিফেং চেষ্টা করবেন ট্রাম্প ও শির মধ্যে আগামী বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ায় এপেক (এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন) সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকের পথ প্রশস্ত করতে। ওই বৈঠকে শুল্ক, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য—বিশেষ করে সয়াবিন ক্রয় নিয়ে মধ্যবর্তী কোনো সমঝোতা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান জশ লিপস্কি বলেন, “এই বৈঠক সফল করতে হলে অন্তত গ্রীষ্মকালীন যুদ্ধবিরতির মতো একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র চায় চীনের নতুন বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হোক।”

তিনি আরও বলেন, “তবে চীন সেটা মেনে নেবে কি না, তা বলা কঠিন। এই নিয়ন্ত্রণই এখন তাদের মূল কূটনৈতিক হাতিয়ার।”

কুয়ালালামপুর বৈঠক সম্পর্কে মালয়েশিয়া সরকার, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—তিন পক্ষই খুব অল্প তথ্য প্রকাশ করেছে। বৈঠকের স্থানও শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত হয়, যখন চীনা কর্মকর্তারা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভবন মারদেকা ১১৮ টাওয়ারে পৌঁছাতে শুরু করেন।

রবিবার মালয়েশিয়ার রাজধানীতে পৌঁছাবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এরপর হয়তো তিনি বৈঠকের অগ্রগতি বা ফলাফল নিয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে পারেন।

ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ স্কট কেনেডি বলেন, “বেইজিং যদি যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, তাহলে এই কৌশল সফল হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।”

 

বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতি চেষ্টা করছে বাণিজ্যযুদ্ধকে আবার শুল্কের ত্রিগুণ পর্যায়ে পৌঁছাতে না দিতে। গত এপ্রিলেই ট্রাম্প ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেন, যার জবাবে চীন যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

জেনেভায় গত মে মাসের বৈঠকে বেসেন্ট, গ্রিয়ার ও হে লিফেং ৯০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন, যার ফলে শুল্ক কমে আসে—যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং চীনে ৩০ শতাংশে। একই সঙ্গে ম্যাগনেট সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়। পরবর্তী লন্ডন ও স্টকহোম বৈঠকে এই যুদ্ধবিরতি আরও বাড়ানো হয়, যা ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিভাগ নিষেধাজ্ঞার তালিকা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করে। এখন ওই তালিকাভুক্ত কোম্পানির অর্ধেকের বেশি মালিকানাযুক্ত প্রতিষ্ঠানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ। এতে কয়েক হাজার নতুন চীনা কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে।

এর জবাবে চীন ১০ অক্টোবর নতুন করে বৈশ্বিক বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জারি করে, যার উদ্দেশ্য এসব উপাদান সামরিক সরঞ্জামে ব্যবহারে বাধা দেওয়া। এতে চীনা প্রযুক্তিতে উৎপাদিত বিরল খনিজ পণ্য রপ্তানির জন্য বিশেষ লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়।

বেসেন্ট ও গ্রিয়ার চীনের এই পদক্ষেপকে “বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল দখলের প্রচেষ্টা” বলে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ওয়াশিংটন এখন চীনের প্রতি আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে—যার মধ্যে ল্যাপটপ থেকে শুরু করে জেট ইঞ্জিন পর্যন্ত সফটওয়্যার-নির্ভর পণ্যের রপ্তানি সীমিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসন আবারও নতুন এক তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে, যার লক্ষ্য ২০২০ সালের ‘ফেজ ওয়ান’ চুক্তি বাস্তবায়নে চীনের ‘ব্যর্থতা’ খতিয়ে দেখা।

এই তদন্ত ট্রাম্পকে চীনা আমদানির ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপের আইনি সুযোগ দিতে পারে। ২০২০ সালের ওই চুক্তিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য, জ্বালানি ও সেবাখাতে ব্যাপক ক্রয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা পূরণ হয়নি।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের কাছে পুনরায় আমেরিকান সয়াবিন কেনার দাবি তুলতে পারে—বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে চীন কোনো সয়াবিন না কেনায় মার্কিন কৃষকরা অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন। কৃষক সমাজ ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটভিত্তি হিসেবেও পরিচিত।