শিল্পোদ্যোগ ও শিল্পোদ্যোক্তার সংজ্ঞা নিয়ে আজকের আলোচনা। শিল্পোদ্যোগ ও শিল্পোদ্যোক্তা’ শব্দ দুটির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে আলাদা দুটি শব্দ, যেমন- উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা। ‘শিল্প’ শব্দের সঙ্গে ‘উদ্যোগ’ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘শিল্পোদ্যোগ। তেমনি ‘শিল্প’ শব্দের সঙ্গে ‘উদ্যোক্তা’ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘শিল্পোদ্যোক্তা। শিল্প বলতে কাজ বুঝায় আর এ কাজ যিনি সম্পাদন করেন, তাঁকেই উদ্যোক্তা বলে। আবার শিল্প বা কাজ করার জন্য যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তাকেই শিল্পোদ্যোগ বলে।
Table of Contents
শিল্পোদ্যোগ (Entrepreneurship):
ইংরেজি ‘Entrepreneurship’ শব্দের বাংলা অর্থ শিল্পোদ্যোগ বা ব্যবসায় উদ্যোগ। অর্থাৎ মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত সব রকম উৎপাদন, বণ্টন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে পরিচালনার সকল কার্যাবলিকে শিল্পোদ্যোগ বলে।।

শিল্পোদ্যোগের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা:
(ক) E.E. Hagen-এর মতে:
“শিল্পোদ্যোগের কাজ হচ্ছে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি, নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গঠন, মূলধন সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংস্থান, নতুন উৎপাদন কৌশল, নতুন পণ্য উদ্ভাবন, কাঁচামালের নতুন উৎস সন্ধান এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানের দৈনিক কার্যাবলি পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক নির্বাচন করা।”
(খ) Finner-এর মতে:
“সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ইচ্ছার প্রতি সাড়া দেয়া এবং অর্থনৈতিক সুযোগকে কাজে লাগানো ও কাজের স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষমতাই শিল্পোদ্যোগ।”
(গ) বসু ও মৌলিক-এর মতে:
“শিল্পোদ্যোগ হলো অর্থনৈতিক সুযোগকে কাজে লাগানো, প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করে তোলা।”
পরিশেষে বলতে পারি যে, নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, নতুন কিছু উদ্ভাবন, ঝুঁকি গ্রহণ ইত্যাদির উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার ইচ্ছা ও ক্ষমতাকে শিল্পোদ্যোগ বলে।

শিল্পোদ্যোক্তা (Entrepreneur) :
উদ্যোক্তা ইংরেজি শব্দ, যা Entrepreneur (এন্টারপ্রিনিউর) হতে সৃষ্ট, যার অর্থ হলো উদ্যোগ গ্রহণ করা। প্রকৃতপক্ষে, ‘Entrepreneur শব্দটি ফরাসি শব্দ ‘Entreprendre হতে উৎপত্তি হয়েছে। এর অর্থ হলো কোনো কিছু করার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করা।
সহজ কথায়, যিনি বা যে ব্যক্তি উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাকেই উদ্যোক্তা বলা হয়। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় যে, যে ব্যক্তি ব্যবসায় বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গঠনের নিমিত্তে উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাকে বলা হয় শিল্পোদ্যোক্তা/ব্যবসায় উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তা একজন সংগঠক। তিনি ব্যবসায় বা শিল্প প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ঝুঁকি ও দায়দায়িত্ব বহন করেন এবং উৎপাদনের সমস্ত উপকরণ যথা- ভূমি, শ্রম, মূলধন, প্রযুক্তি ইত্যাদি সংগ্রহ ও একত্রিত করে ব্যবসায় বা শিল্পসংগঠন গড়ে তোলেন এবং সাফল্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন।
অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলির বিভিন্ন অবস্থার আলোকে বিভিন্ন পণ্ডিত ও মনীষীগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্যোক্তার সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে কয়েকজন বিশিষ্ট লেখকের সংজ্ঞা উদ্ধৃত করা হলোঃ

প্রামাণ্য সংজ্ঞা :
(ক) অর্থনীতিবিদ ক্যানটিন (Cantillon)-এর মতে,
“শিল্পোদ্যোক্তা হচ্ছেন একজন প্রতিনিধি (Agent), যিনি পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট মূল্যে উপকরণসমূহ সংগ্রহ করেন এবং সেগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে পণ্য প্রস্তুত করেন, যার বিক্রয়মূল্য অনিশ্চিত।”
(খ) জোসেফ এ. সুমপিটার (Joseph A. Schumpeter) বলেন যে,
“শিল্পোদ্যোক্তা এমন একজন ব্যক্তি, যিনি তাঁর সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা কোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন এবং উন্নয়নে গতিশীলতা সঞ্চার করেন।”
(গ) ডব্লিউ. এফ. গুচ (W.F. Gluech) বলেন,
“উদ্যোক্তা হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নতুন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গঠন করেন এবং কৃতকার্য না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে যান।”
(ঘ) জে.এস. মিলস (J.S. Mills)-এর মতে,
“শিল্পোদ্যোক্তা হলেন সংগঠক, যিনি মেধাপূর্ণ কাজের পুরস্কার পেয়ে। থাকেন।”
সুতরাং বলা যায় যে, শিল্পোদ্যোক্তা হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি স্বীয় উদ্যম বা প্রচেষ্টা, কর্মস্পৃহা, উদ্ভাবনী শক্তি ও প্রেরণার সাহায্যে একটি নতুন ব্যবসায় বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গঠন করে একে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসার লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
ব্রেক ইভেন পয়েন্ট বা সমাবস্থা বিশ্লেষণ এর বিষয়বস্তুঃ
