ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য বা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনার পরিচিতি” বিষয়ক পাঠের অংশ। মানব সংগঠনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনার অস্তিত্ব বিদ্যমান। তাই সংগঠনের প্রকৃতি যেমনি বিভিন্ন ধরনের তেমনি এর উদ্দেশ্যও বিভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে। রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্দেশ্য ও ব্যবসায় সংগঠনের উদ্দেশ্য এক নয় বিধায় উভয়ের ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যও এক হতে পারে না। তবে সব ধরনের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই কতকগুলো মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে ও তা অর্জনের জন্য বিভিন্ন সহায়ক উদ্দেশ্য নির্ণীত হয়। ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার এরূপ উদ্দেশ্যাবলি নিম্নে তুলে ধরা হলো :
Table of Contents
ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য বা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য

ক) প্রাথমিক বা মুখ্য উদ্দেশ্যাবলি (Primary objectives) :-
১. মুনাফা অর্জন (Earning profit) :
ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করে । এই মালিকগণ ব্যবসায়ে মূলধন বিনিয়োগ করে স্বভাবতই অধিক মুনাফা পেতে চায় । এ ছাড়া সর্বত্রই অর্জিত মুনাফার পরিমাণ বিবেচনা করে ব্যবস্থাপনার দক্ষতা পরিমাপ করা হয়ে থাকে । তাই মুনাফা অর্জন ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য ।
২. অস্তিত্ব রক্ষা ও উন্নয়ন (Survival and growth) :
বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় জগতে ব্যবস্থাপনার আরেকটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো অস্তিত্ব রক্ষার পাশাপাশি এর উন্নয়ন ও প্রসার সাধন করা । ব্যবসায় জগত এতটাই গতিশীল যে, স্থির অবস্থায় নিজস্ব অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাই উন্নয়ন বা প্রসারের প্রচেষ্টায় ব্যবস্থাপনাকে সবসময়ই ব্যস্ত থাকতে হয় । পিটার এফ. ড্রাকার বলেছেন, “Survival is the central purpose of an organization”. অর্থাৎ অস্তিত্ব রক্ষা একটা প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য ।
খ) গৌণ বা সহায়ক উদ্দেশ্যাবলি (Secondary objectives ) :-
প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য অনেকগুলো গৌণ বা সহায়ক উদ্দেশ্য অর্জনের প্রয়োজন পড়ে। ব্যবস্থাপনা এ লক্ষ্যে সাধারণত নিম্নোক্ত উদ্দেশ্যাবলি অর্জনের প্রয়াস চালায় :
১. মানবশক্তির মানোন্নয়ন (Improving human resources) :
প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত উপকরণাদির মধ্যে মানবশক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্য কর্মী বাহিনী সংগ্রহ, তাদের মানোন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখা। এ জন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মী বিভাগ (Personnel department) বিশেষ ভূমিকা পালন করে ।
২. বস্তুগত উপকরণাদির উন্নয়ন (Development of material resources) :
প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত বস্তুগত উপকরণাদি; যথা-ভূমি, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, মূলধন, বাজার, পদ্ধতি ইত্যাদির উন্নয়ন সাধন করে তাকে যুক্তিযুক্তভাবে কাজে লাগানোও ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য। উন্নতি যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, কলা-কৌশল, পদ্ধতি ইত্যাদির ব্যবহার প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি করে । ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতার সামর্থ্য বৃদ্ধি পায় ।
৩. সম্প্রসারিত বাজার সৃষ্টি ও অধিক উৎপাদন (Creating wide market and ensuring mass production) :
বর্তমানকালে ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষভাবে বাজারকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। তাই প্রতিযোগিতাপূর্ণ | ব্যবসায় জগতে ব্যবস্থাপনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বাজারে নিজ পণ্যের বা সেবার বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি করে বাজার সম্প্রসারণ করা । এর মধ্য দিয়ে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করাও ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য ।
৪. প্রতিযোগী মূল্যে উন্নতমানের পণ্য সরবরাহ (Supply of quality goods at a competitive price) :
বাজারে নিজ পণ্য বা সেবার চাহিদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনার আরেকটি সহযোগী উদ্দেশ্য হলো, প্রতিযোগী মূল্যে বাজারে উন্নতমানের পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা। প্রতিযোগী মূল্য বলতে বাজারে যেই প্রতিষ্ঠান কর্তৃত্বশালী (Leading company) তাদের চেয়ে কম মূল্যে বাজারে উৎকৃষ্টমানের পণ্য সরবরাহকে বুঝায় ।
৫. পণ্যসারির বা নতুন পণ্যের উন্নয়ন (Development of new product or product line):
বর্তমানকালে বৃহদায়তন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারজাতকৃত পণ্যতালিকায় নতুন নতুন পণ্য সংযোজন করার চেষ্টা চালায় । এতে বাজারজাতকরণ ও অন্যান্য ব্যয় একক প্রতি হ্রাস পায়। এ ছাড়া এতে প্রতিষ্ঠানের সুনামও বাড়ে। তাই নতুন নতুন পণ্য এর পণ্যসারি ( product line )-র অন্তর্ভুক্তকরণ এবং প্রয়োজনে নতুন পণ্য উৎপাদনও ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য ।
৬. সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা নিশ্চিতকরণ (Ensuring maximum customer services) :
বর্তমানকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গ্রাহকসেবা (Customer service) খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। ক্রেতাসাধারণের সচেতনতা ও আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধি, রুচিবোধের উন্নয়ন, ব্যাপক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি কারণে ভোক্তা বা ক্রেতাগণ সর্বত্রই অধিক গ্রাহক সেবার প্রত্যাশা করে। তাই ক্রেতা সাধারণকে সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করাও ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য ।
৭. উৎপাদনমুখী কার্যপরিবেশ সৃষ্টি (Creating production oriented working environment):
প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি, কর্মীদের মানসিক উৎকর্ষতা বিধান এবং কাজকে সহজ ও গতিশীল করতে যেকোনো ব্যব৷৷য-প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনমুখী কার্যপরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এ জন্য উৎপাদনধর্মী সকল প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনার আরেকটি সহযোগী উদ্দেশ্য হলো উৎপাদনমুখী কার্যপরিবেশ সৃষ্টি করা ।

৮. শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়ন (Development of labour management relationship) :
বর্তমানকালে বৃহদায়তন সকল প্রতিষ্ঠানে শ্রম-ব্যবস্থাপনার সম্পর্কের উন্নয়ন বিধান করাও ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য। এরূপ সম্পর্ক কাম্য মানের না হলে কখনই দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা কাজ করতে পারে না। এর অভাবে প্রতিষ্ঠানে অদক্ষতা ও বিশৃংখলা বিরাজ করে । তাই এরূপ সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে দলীয় চেতনা ও কর্মস্পৃহা বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থাপনা কাজ করে।
উপরোল্লিখিত আলোচনার আলোকে বলা যায়, ব্যবস্থাপনা তার মুখ্য উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পরিবেশ- পরিস্থিতির আলোকে নানান ধরনের সহায়ক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে। সহায়ক উদ্দেশ্যাবলির কোনোটি কখনও অবস্থা বিবেচনায় মুখ্য উদ্দেশ্যের মর্যাদা পায় । আবার অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়কালে এক বা একাধিক উদ্দেশ্য সামনে রেখেও ব্যবস্থাপনা কাজ করে ।
