আজকের আলোচনা “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের “উদ্দেশ্য” অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে তার সুসংগঠিত পরিকল্পনা, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সঠিক দিকনির্দেশনার ওপর। এর জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ও সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো। উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা (Management by Objectives – MBO) এমনই একটি ব্যবস্থাপনা কৌশল, যা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
Table of Contents
উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কী

উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কী?
উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা হলো একটি দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উদ্দেশ্যের আলোকে প্রতিটি বিভাগ ও উপবিভাগের জন্য পৃথকভাবে উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয় এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরের কর্মী ও ব্যবস্থাপক সম্মিলিতভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কাজে অংশগ্রহণ করে, ফলে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য অর্জন সহজতর হয়।
বিশ্লেষণ ও লেখক মতামত
উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিশিষ্ট দুই লেখক নিম্নোক্ত মতামত প্রদান করেছেন:
| লেখক | মতামত |
|---|---|
| George S. Odiorne | “Management by objectives (MBO) is a process through which specific goals are set collaboratively for the organization as a whole and every unit and individual within it.” অর্থাৎ, এটি একটি যৌথ প্রক্রিয়া যেখানে প্রতিষ্ঠান, তার ইউনিট এবং প্রতিটি কর্মী নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে। |
| J.S. Chandan | “MBO is a process by which managers and subordinates work together in identifying goals and setting up objectives and make plans together in order to achieve these objectives.” অর্থাৎ, ব্যবস্থাপক ও অধস্তন কর্মীরা একত্রে লক্ষ্য নির্ধারণ ও পরিকল্পনা প্রণয়নে যুক্ত থাকেন। |

উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য
উপরোক্ত সংজ্ঞা ও বিশ্লেষণ থেকে MBO-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:
সকল স্তরে লক্ষ্য নির্ধারণ: এটি প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে সুস্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য উদ্দেশ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া।
সামগ্রিক উদ্দেশ্যের ভিত্তি: প্রথমে প্রতিষ্ঠানের একটি সামগ্রিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়।
বিভাগীয় লক্ষ্য নির্ধারণ: সামগ্রিক উদ্দেশ্যের আলোকে প্রতিটি বিভাগ ও উপবিভাগের জন্য পৃথক উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়।
অধস্তনদের সম্পৃক্ততা: লক্ষ্য নির্ধারণে অধস্তনদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা হয়, ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দায়বদ্ধতা বাড়ে।
পরিকল্পনা প্রণয়ন: প্রতিটি ইউনিট তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
সমন্বিত বাস্তবায়ন: সম্মিলিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়।
উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার উপকারিতা
| উপকারিতা | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি | লক্ষ্যভিত্তিক কাজ কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। |
| দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ | নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও লক্ষ্য থাকায় প্রতিটি ইউনিট তাদের পারফরম্যান্স সম্পর্কে সচেতন থাকে। |
| যোগাযোগ বৃদ্ধি | ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ গঠিত হয়। |
| পরিমাপযোগ্য ফলাফল | লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ হওয়ায় মূল্যায়ন সহজ হয়। |
| প্রেরণা বৃদ্ধি ও আত্মবিশ্বাস গঠন | নিজ হাতে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। |
প্রাসঙ্গিক ইতিহাস ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ধারণাটি প্রথম প্রবর্তন করেন Peter F. Drucker। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মী যদি নিজেদের কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে, তবে তা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক সাফল্য অর্জনে সহায়ক হবে।

উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা একটি আধুনিক, অংশগ্রহণমূলক ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থাপনা কৌশল। এটি শুধু একটি ব্যবস্থাপনার কৌশল নয়, বরং একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা লক্ষ্য নির্ধারণ, অংশগ্রহণ, পরিকল্পনা ও যৌথ দায়িত্ববোধের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। বর্তমান যুগে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে এমন লক্ষ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুশীলন অপরিহার্য।
শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ:
ব্যবস্থাপনা শিক্ষার্থীদের উচিত উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ধারণা শুধু মুখস্থ না করে এর বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এর সফল প্রয়োগের উদাহরণ বিশ্লেষণ করা। এটি ভবিষ্যতে বাস্তব ক্ষেত্রের ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জনে সহায়ক হবে।
