শিল্পোদ্যোক্তা বা উদ্যোক্তার শ্রেণিবিভাগ (The classification of entrepreneur) করতে গেলে প্রথমে ৩ ভাগে ভাগ করতে হবে, তা হলো – বৈশিষ্ট্য, গুণাবলি ও দক্ষতার ভিত্তিতে, মালিকানার ভিত্তিতে এবং কারবারের ধরন অনুসারে।
বৈশিষ্ট্য, গুণাবলি ও দক্ষতার ভিত্তিতে ৫ শিল্পোদ্যোক্তাকে ভাগে ভাগ করা হয়, যেমন – (ক) জীবিকানির্বাহ উদ্যোক্তা, (খ) আত্মকর্মসংস্থানমূলক উদ্যোক্তা, (গ) ক্ষুদ্র ব্যবসায় উদ্যোক্তা, (ঘ) সামাজিক উদ্যোক্তা, (ঙ) শিল্পকারখানা স্থাপন উদ্যোক্তা।
মালিকানাভিত্তিক শিল্পোদ্যোক্তা বা উদ্যোক্তাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যা হলো – (ক) সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তা, (খ) একক বা যৌথ উদ্যোক্তা। এছাড়া কারবারের ধরন অনুসারে শিল্পোদ্যোক্তা বা উদ্যোক্তার শ্রেণিবিভাগ করা যায় ৩ ভাবে, যা হলো – (ক) শিল্পোদ্যোক্তা, (খ) বাণিজ্যিক উদ্যোক্তা, (গ) সেবামূলক উদ্যোক্তা।

Table of Contents
শিল্পোদ্যোক্তা বা উদ্যোক্তার শ্রেণিবিভাগ
বিভিন্ন প্রকার শিল্পোদ্যোক্তার বর্ণনা :
১। বৈশিষ্ট্য, গুণাবলি ও দক্ষতার ভিত্তিতে উদ্যোক্তা
(ক) জীবিকানির্বাহ উদ্যোক্তা :
যখন কোনো মানুষ কোনো কাজকর্ম খুঁজে না পেয়ে জুতা পালিশের কাজ করে কিংবা ফুটপাতে ফলমূল বিক্রি করে কিছু উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদেরকে জীবিকা নির্বাহ উদ্যোক্তা বলে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কাজকর্ম করে যারা আয়-রোজগার করে, তাদেরকে শিল্পোদ্যোক্তা বলা যায় না।
(খ) আত্মকর্মসংস্থানমূলক উদ্যোক্তা:
এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উদ্যোক্তা কেবলমাত্র নিজের কর্মসংস্থান করে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবসার পরিসর খুবই ছোট হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ- পান-সিগারেট বিক্রি করার জন্য দোকান দেয়া।
(গ) ক্ষুদ্র ব্যবসায় উদ্যোক্তা:
সকল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকেই উদ্যোক্তা বলা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবসায়ের সম্প্রসারণ ঘটাতে সক্ষম না হয়। যে ব্যবসায়ী ছোট ব্যবসায়কে নতুন ধ্যানধারণা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বড় করতে সক্ষম হয়, তাকেই উদ্যোক্তা বলা যায়।
(ঘ) সামাজিক উদ্যোক্তা:
যে-সমস্ত উদ্যোক্তা নিজ গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যের কারণে সুষ্ঠুভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান সামাজিক উন্নয়নের জন্য পরিচালনা করে থাকে, তাদেরকে সামাজিক উদ্যোক্তা বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে ব্র্যাক এর প্রতিষ্ঠাতা জনাব ফজলে হোসেন আবেদ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনুস এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
(ঙ) শিল্পকারখানা স্থাপন উদ্যোক্তা:
এ ধরনের উদ্যোক্তা শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের লক্ষ্যে প্রকল্প ধারণা থেকে শুরু করে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিকল্পনা গ্রহণ, পরিকল্পনা মোতাবেক প্রস্তুতি গ্রহণ ও সংগঠিতকরণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি মূল্যায়নের মাধ্যমে সফলতা অর্জনের জন্য যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে সক্ষম হন। উদাহরণ হিসেবে, ‘প্রাণ’ সামগ্রী প্রস্তুতকারক মেজর জেনারেল (অবঃ) আমজাদ হোসেন চৌধুরী এবং ঢাকা ক্লাবের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সফল উদ্যোক্তা গীতি আরা চৌধুরী এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

২। মালিকানাভিত্তিক উদ্যোক্তা:
(ক) সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ:
মালিকানাভেদে শিল্পোদ্যোক্তাকে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ হিসেবে ভাগ করা যায়। শিল্পোদ্যোগ সাধারণত একটি বেসরকারি কার্যকলাপ হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগও প্রসার লাভ করেছে। যে-সব দেশে বৈদেশিক মূলধনের অভাব এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিল্পোদ্যোক্তার স্বল্পতা রয়েছে সেসব দেশে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাসহ শিল্পায়নে রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশে সেক্টর কর্পোরেশন এবং আরো কিছুসংখ্যক সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি শিল্প স্থাপন করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
(খ) একক এবং ব্যাপকভিত্তিক শিল্পোদ্যোগ :
শিল্পোদ্যোগকে আবার একক এবং ব্যাপকভিত্তিক শিল্পোদ্যোগ হিসেবে বিভক্ত করা যায়। সরকারের সামগ্রিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা পরিবারভিত্তিক বাণিজ্য বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকে একক শিল্পোদ্যোগ বলা যায়। এভাবে সরকারি নীতির মাধ্যমে ভাগ্যবান শিল্পসমৃদ্ধ পরিবার সৃষ্টির ফলে একটি অনগ্রসর অর্থনীতিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।
যে-সব দেশে উন্নয়নের ব্যাপক অংশ জুড়ে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি বিষয়টি জড়িত সেখানে ব্যাপকভিত্তিক শিল্পোদ্যোগ সৃষ্টির প্রয়োজন সর্বাধিক। এ ধরনের ব্যাপকভিত্তিক শিল্পোদ্যোগ কৌশল দেশের বিদ্যমান সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে বেকার ও অর্ধবেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বাংলাদেশের প্রকট বেকার সমস্যার প্রেক্ষাপটে ব্যাপকভিত্তিক শিল্পোদ্যোগ আবশ্যক।

৩। কারবারের ধরন অনুসারে উদ্যোক্তা:
(ক) শিল্পোদ্যোক্তা:
যে-সমস্ত উদ্যোক্তা রাষ্ট্রীয় সম্পদের রূপগত পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার উদ্দেশ্যে কারবার বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গঠন ও পরিচালনা করে থাকে, তাদেরকে শিল্পোদ্যোক্তা বলে। দেশে বৃহদায়তন কারবার গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এসব উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
(খ) বাণিজ্যিক উদ্যোক্তা:
এ ধরনের উদ্যোক্তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের বণ্টন প্রণালির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। এরা উৎপাদকের নিকট হতে ব্যাপকহারে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে ভোক্তাদের নিকট বিক্রয় করে। খুচরা বা পাইকারি ব্যবসায়ী এ শ্রেণির উদ্যোক্তার অন্তর্ভুক্ত।
(গ) সেবামূলক উদ্যোক্তা:
যে সকল উদ্যোক্তা মানুষের জনকল্যাণমূলক এবং অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে সেবাকর্মের সৃষ্টি ও সেগুলোর বিতরণের উদ্দেশ্যে কারবার গঠন করে, তাকে সেবা পরিবেশক উদ্যোক্তা বলে। ব্যাংক, পরিবহন সংস্থা, বিজ্ঞাপনী সংস্থা ইত্যাদি সেবা পরিবেশন উদ্যোক্তা।
শিল্পোদ্যোক্তার শ্রেণিবিভাগ এর বিষয়বস্তুঃ
