আজকের আলোচনার বিযয় কমিটির প্রকারভেদ – যা সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন এর অর্ন্তভুক্ত, আজকাল বড় ও মাঝারি সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানেই কমিটির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষণীয়। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন বা প্রশাসনিক কাজে সহযোগিতা করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে বা ঊর্ধ্বতনের নির্দেশক্রমে নানান ধরনের কমিটি গঠন করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হতে বিচার করলে কমিটিকে কতকগুলো ভাগে ভাগ করা যায় । নিম্নে তা আলোচনা করা হলো :
Table of Contents
কমিটির প্রকারভেদ

ক) স্থায়িত্বের দৃষ্টিকোণ হতে শ্রেণীবিভাগ (Classification based on duration) :
১. স্থায়ী কমিটি (Standing committee) :
প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে, সাংগঠনিক বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে যে কমিটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রশাসনিক কাজ সম্পাদনের নিমিত্তে গঠিত হয় তাকে স্থায়ী কমিটি বলে । R. M. Hodgetts, “Standing committee is a committee that is permanent in nature, as in the case of the finance or personnel committees that exist in many organizations.” অর্থাৎ স্থায়ী কমিটি হলো এমন কমিটি যা স্থায়ী প্রকৃতির ।
অর্থ বা কর্মী বিষয়ক কমিটি যা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকে তা এ ধরনের । প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মী বিষয়ক কমিটি দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিক-কর্মীদের নানান অভাব-অভিযোগ নিষ্পত্তি, পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা, আর্থিক ও অনার্থিক সুযোগ-সুবিধা দেখাশুনা ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করে। এরূপ কমিটির সদস্য নির্দিষ্ট সময় শেষে বা পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত বা আবর্তিত হতে পারে কিন্তু কমিটি দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে । এভাবে প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী কমিটি, পরিচালনা বোর্ড, অর্থ কমিটি ইত্যাদি এর উদাহরণ ।
২. অস্থায়ী কমিটি (Adhoc committee or Temporary committee) :
কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জন বা কাজ সম্পাদনের জন্য সাময়িক প্রকৃতির যে কমিটি গঠন করা হয় তাকে অস্থায়ী কমিটি বলে । R. M. Hodgetts বলেছেন, “Adhoc committee means a committee that is formed for a particular purpose and that is disbanded upon completion of the objective, ” 33 অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যার্জনের নিমিত্তে গঠিত কমিটি হলো অস্থায়ী কমিটি যা ঐ কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যার্জনের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে যায় ।
এরূপ কমিটি প্রয়োজনমতো ঊর্ধ্বতন নির্বাহী কর্তৃক গঠন করা হয় এবং এর সদস্য কারা হবে তাও ঊর্ধ্বতন নির্ধারণ করে । প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি, সুপারিশ কমিটি, বিশেষ ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য জন্ম কমিটি, পুরাতন সামগ্রী বিক্রয়ের জন্য বিক্রয় কমিটি ইত্যাদি এর উদাহরণ । অর্থাৎ উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেলেই এ কমিটির বিলুপ্তি ঘটে । সাধারণত অস্থায়ী কমিটি পরামর্শমূলক কাজে বা সহযোগিতামূলক কাজে ভূমিকা রাখে । তবে স্পষ্টভাবে এরূপ কমিটিকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়া হলে কমিটি তাও করার অধিকারী হয়।
৩. মেয়াদি কমিটি (Committee for a fixed time) :
নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কোনো প্রশাসনিক বা অন্য কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য কোনো কমিটি গঠন করা হলে তাকে মেয়াদি কমিটি বলে । অবস্থাভেদে মেয়াদি কমিটিকে স্থায়ী কমিটি হিসেবেও গণ্য করা যায়। একটি কলেজের গভর্নিং বডি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য গঠিত হয়। উক্ত সময় শেষে কমিটি বিলুপ্ত হলেও পুনরায় নতুন কমিটি গঠিত হয়ে থাকে ।
অর্থাৎ প্রশাসনিক নিয়মেই সেখানে কমিটি কাজ করে । একটি কমিটি গঠিত হওয়ার পর তা একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বহাল থাকে বিধায় একে মেয়াদি কমিটি হিসেবে গণ্য করা হয়। আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির অধিকাংশই এ ধরনের মেয়াদি কমিটি ।
খ) আনুষ্ঠানিকতার দৃষ্টিকোণ হতে (Classification based on formalities):
১. আনুষ্ঠানিক কমিটি (Formal committee) :
প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে বা ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ অনুসারে নির্দিষ্ট দায় ও কর্তৃত্ব সহযোগে যে কমিটি গঠিত হয় তাকে আনুষ্ঠানিক কমিটি বলে। কমিটি বলতে মূলত আনুষ্ঠানিক কমিটিকেই বুঝায় । অইরিক ও কুঞ্জ বলেন, “ A committee if established as part of the organization structure, with specifically delegated duties and authority, they are formal. “
অর্থাৎ সংগঠন কাঠামোর অংশ হিসেবে যদি কোনো কমিটি গঠিত হয় এবং সুনির্দিষ্ট রূপে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব প্রদান করা হয় তবে তাকে আনুষ্ঠানিক কমিটি বলেড্ড কমিটি স্থায়ী বা অস্থায়ী যে ধরনেরই হোক না কেন তাকে আনুষ্ঠানিক কমিটি বলা হয় । এক্ষেত্রে কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য, সদস্য সংখ্যা, কমিটির সদস্যদের কাজ, দায়-দায়িত্ব, কর্তৃত্ব-ক্ষমতা ইত্যাদি পূর্বেই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় ।
২. অনানুষ্ঠানিক কমিটি (Informal committee) :
পূর্ব থেকে কোনো কমিটির ঘোষণা না থাকলেও ঊর্ধ্বতন যদি কোনো বিশেষ বিষয়ে পরামর্শ নেওয়ার জন্য বা আলাপ-আলোচনা করার জন্য অধস্তন নির্বাহীদের বা প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের ভিতরের-বাইরের অন্যদের নিয়ে এক বা একাধিক অধিবেশনে মিলিত হন তবে তাকে অনানুষ্ঠানিক কমিটি বলে। এ ধরনের কমিটি মূলত পরামর্শমূলক বা উপদেষ্টামূলক কাজেই ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার জন্য বা সুপারিশ করার জন্য বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিষয়ের মতামত তৈরি, পরিবেশ সৃষ্টি ইত্যাদি কাজে ঊর্ধ্বতন অধস্তনের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন ।
একাধিক ব্যক্তির ওপর একযোগে এরূপ দায়িত্ব অর্পণ করায় এবং তারা একত্রে এ কাজ করায় তা কার্যত কমিটির রূপ লাভ করে । অইরিক ও কুঞ্জ বলেছেন, “Committees that are informal are organized without specific delegation of authority usually by some persons desiring group thinking or group decision on a particular problem.”35 অর্থাৎ কোনো সুনির্দিষ্ট সমস্যার ওপর দলীয় চিন্তা-চেতনা বা দলীয় সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার জন্য কতিপয় ব্যক্তির মাঝে কোনো প্রকার কর্তৃত্বার্পণ ব্যতীতই যে কমিটি গড়ে ওঠে তাকে অনানুষ্ঠানিক কমিটি বলে ।
গ) কর্তৃত্বের দৃষ্টিকোণ হতে শ্রেণীবিভাগ (Classification based on authority) :
১. রৈখিক কমিটি (Line committee) :
রৈখিক কমিটি বলতে সরলরৈখিক কর্তৃত্বসহযোগে গড়া কমিটিকে বুঝায় । এরূপ কমিটি অর্পিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে। ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন’ কমিটি বলতে মূলত রৈখিক কমিটিকেই বুঝায়। একে কার্যনির্বাহ ককড়কধ (Functional committee) নামেও অভিহিত করা হয়।
বহুসংখ্যক নির্বাহী কমিটি (Plural executive committee) বলতে যা বুঝায় তা রৈখিক কমিটি হিসেবে গণ্য । অইরিক ও কুঞ্জ বলেছেন, “A committee is line’ if its authority involves decision making affecting subordinates responsible to it. It is plural executive – a line committee that also carries out managerial functions. ” অর্থাৎ কোনো কমিটি সরলরৈখিক গণ্য হবে যদি তা অধস্তনদের দায়বদ্ধ করে এমন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী হয় ।
এতে একাধিক নির্বাহী থাকে এবং তারা ব্যবস্থাপকীয় কার্যাবলি সম্পাদন কচড় এমন ধরনের কমিটিতে সাধারণত প্রতিষ্ঠানের উচ্চ নির্বাহীগণ বা মালিক পক্ষের প্রতিনিধিগণ অন্তর্ভুক্ত থাকেন। প্রতিষ্ঠানের কার্যনির্বাহী কমিটি, কোম্পানির পরিচালকমণ্ডলী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভনিং বডি এর উদাহরণ ।
২. উপদেষ্টা কমিটি বা বিশেষজ্ঞ কমিটি (Advisory or Technical committee) :
শীর্ষ নির্বাহীকে প্রয়োজনীয় বিষয়ে পরামর্শ বা উপদেশ প্রদানের লক্ষ্যে যে কমিটি গঠন করা হয় তাকে উপদেষ্টা কমিটি বলে । সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ নির্বাহী বা নির্বাহী কমিটিকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। এরূপ কমিটির কাজ হয় প্রয়োজনীয় বিষয়ে বা উত্থাপিত শীর্ষ নির্বাহীকে উপদেশ বা পরামর্শ দেওয়া ।
এরূপ উপদেশ মানতে অবশ্য শীর্ষ নির্বাহী বাধ্য নয় তবে এ ধরনের পরামর্শ তাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথেষ্ট সহায়তা করে। কিছু যোগ্যতাসম্পন্ন, সামর্থ্যবান ও প্রতিষ্ঠানের ভালো চায় এমন ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে রাখার স্বার্থে ও বিশেষ কোনো বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের একটা নতুন মেশিন বসানোর ক্ষেত্রে যন্ত্র প্রকৌশলীদের নিয়ে একটা বিশেষজ্ঞ বা কারিগরি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। শিক্ষা বোর্ড কারিকুলাম তৈরি করতে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের জন্য অনেক সময় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে ।

৩. সহযোগী কমিটি (Associate committee) :
শীর্ষ নির্বাহীর কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দানের জন্য যে কমিটি গঠন করা হয় তাকে সহযোগী কমিটি বলে। এরূপ কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো কোনো বিশেষ কর্তৃত্ব থাকে না । তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃক যে কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় সেই বিষয়ে কমিটি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করে । কোনো চুক্তির বা প্রস্তাবনার খসড়া প্রণয়ন কমিটি, হিসাব নিরীক্ষণ কমিটি, সমন্বয় কমিটি, তদন্ত কমিটি, তথ্য সংগ্রাহক কমিটি, তত্ত্বাবধান কমিটি ইত্যাদি এরূপ কমিটির উদাহরণ । ক্ষেত্রবিশেষে এরূপ কমিটি কিছুটা কর্তৃত্ব ভোগ করে ।
একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে উপরোক্ত বিভিন্ন ধরনের কমিটি ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন নামে কাজ করে । অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এর প্রকৃতিভেদে বিভিন্ন নামে কমিটি লক্ষ্য করা যায় । যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মসজিদ কমিটি, পূজা কমিটি, এলাকা বিচারে জাতীয় কমিটি, বিভাগীয় কমিটি, জেলা কমিটি, থানা কমিটি, স্থানীয় কমিটি ইত্যাদি । অন্য যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন প্রকৃতি বিচারে এদেরকে উপরোক্ত তিনটি বিভাজনের কোনো না কোনো পর্যায়ে ফেলা যেতে পারে ।
