পরিকল্পনার ভূমিকা

পরিকল্পনার ভূমিকা নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিকল্পনা” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবস্থাপনার প্রথম ও মৌলিক কাজ হলো পরিকল্পনা । ভবিষ্যতে আমরা কী করতে চাই, কখন ও কীভাবে করতে চাই এগুলো পূর্বে নির্ধারণ করাকেই পরিকল্পনা বলে । এটি একটি চিন্তনীয় (Thinking) কাজ । কাজ শুরুর পূর্বে যদি সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা না হয় তবে কাজে নানান ধরনের সমস্যা দেখা দেয়া খুবই স্বাভাবিক ।

ধরা যাক, একজন কাঠমিস্ত্রিকে ১০টি দরজা তৈরির কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। এখন সে কতদিনে এ কাজটা সম্পাদন করবে, দরজার ডিজাইন কী হবে, এ কাজে কী মানের কী পরিমাণ কাঠ ও অন্যান্য উপকরণ লাগবে, কখন কোন উপকরণের প্রয়োজন হবে, কীভাবে এগুলো সংগ্রহ করা হবে পূর্ব হতেই এগুলো যদি ঠিক করা না হয়।

পরিকল্পনার ভূমিকা

 

পরিকল্পনার ভূমিকা | পরিকল্পনা | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

তবে কাজে গিয়ে নিশ্চিতভাবেই নানান ধরনের সমস্যার উদ্ভব হবে। কাজ করতে গিয়ে দেখা যাবে এটা নেই এটা নেই । সেগুলো বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহ করতে গিয়ে অযথা সময় ও অর্থ ব্যয় হবে বেশি, প্রচুর সময় নষ্ট হবে, ভালো উপকরণ পাওয়া যাবে না, এভাবে সমস্যার অন্ত থাকবে না । তাই পূর্ব হতেই যদি সবটা চিন্তা করে কাজ শুরু করা যায় তবে কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন সম্ভব । এভাবে ছোট-বড়ো সব কাজ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পাদনের জন্য কম-বেশি চিন্তার প্রয়োজন পড়ে, পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় ।

পরিকল্পনার ব্যাপ্তি অত্যন্ত ব্যাপক । কোনো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী হবে, এটা নির্ধারণ করাও যেমনি পরিকল্পনা, তেমনি এটা কীভাবে অর্জিত হবে, কে, কখন, কোন্ কাজ করবে, কত সময়ে করবে এভাবে একেবারে নিচের পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যেকটি করণীয় কাজ পূর্বে নির্ধারণ করে ফেলাও পরিকল্পনা।

একটি দেশের জাতীয় পরিকল্পনাও যেমনি পরিকল্পনা তেমনি একটা প্রতিষ্ঠানের আগামী তিন মাসের বিক্রয়ের পরিমাণ অগ্রিম নির্ধারণ করাও পরিকল্পনা । আবার একজন পরীক্ষার্থী আগামীকাল কী পড়বে তা ঠিক করাও পরিকল্পনা। বছরে একটা প্রতিষ্ঠান ১০,০০০ ইউনিট পণ্য প্রস্তুত করবে এটাও যেমনি পরিকল্পনা তেমনি একটা উৎপাদন ইউনিটে সপ্তাহে কত একক পণ্য উৎপাদন হবে এটা ঠিক করাও পরিকল্পনা ।

 

এভাবেই একটি প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন বিভাগ ও উপবিভাগে বিভিন্ন সময়ের জন্য বিশদ পরিকল্পনা প্রণীত হয়। তাই অধ্যাপক নিউম্যান পরিকল্পনাকে “Projected course of action’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। Bartol ও Martin বলেছেন, “Planning is the management function that involves setting goals and deciding how best to achieve them.”1 অর্থাৎ পরিকল্পনা হলো একটা ব্যবস্থাপনা কার্য যার সাথে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কত উত্তমভাবে তা অর্জন করা যায় এতদসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

পরিকল্পনা বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে । আমরা কোথায় আছি এবং কোথায় যেতে চাই, পরিকল্পনা প্রণয়নে তা বিশেষভাবে চিন্তায় আনা হয় বিধায় পরিকল্পনা একটি বুদ্ধিদীপ্ত প্রক্রিয়া, যা সচেতনতার সঙ্গে বাস্তব অবস্থার আলোকে কর্মপন্থা গ্রহণের পথ নির্দেশ করে। Terry ও Franklin তাই বলেছেন, “Planning answer the questions : Where are we now? Where do we want to go? How do we get there? How are we doing? অর্থাৎ আমরা এখন কোথায়? কোথায় যেতে চাই? কীভাবে আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারি বা তা পেতে পারি? আমরা কী করছি? পরিকল্পনা এ সকল প্রশ্নের উত্তর দেয় । একটা উৎপাদন ইউনিটে চলতি বছরে ১০০ একক পণ্য উৎপাদিত হয়েছে।

আগামী বছরে কর্তৃপক্ষ ১৫০ একক পণ্য উৎপাদন করতে চায় । তাহলে কীভাবে ৫০ একক পণ্য বেশি উৎপাদন করা যাবে, এক্ষেত্রে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে আর কী কী যোগ করতে হবে, বছর শেষে আমাদের সমস্যা কী ছিল-সেগুলো কীভাবে দূর হবে, এগুলো পরিকল্পনা প্রণয়নে অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হয়।

 

পরিকল্পনার ভূমিকা | পরিকল্পনা | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

এ জন্যই G. R. Terry বলেছেন, “পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবস্থাপকগণ সম্মুখের দিকে তাকাতে চেষ্টা করেন, ভবিষ্যত ঘটনাবলি সম্পর্কে পূর্বানুমান করেন, দৈব ঘটনা মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নেন, ভবিষ্যৎ কাজ-কর্মের পূর্বচিত্র অঙ্কন করেন এবং উদ্দেশ্যসমূহ অর্জনের জন্য সুবিন্যস্তভাবে কাজের ধারাবাহিকতা ঠিক করেন।

Leave a Comment