প্রতিষ্ঠানের বা ব্যবস্থাপনার উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারকারী পরিবেশের উপাদানসমূহ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিবেশ” বিষয়ক পাঠের অংশ। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে এরূপ উপাদানসমূহকে প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থাপকের ওপর প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়।
Table of Contents
প্রতিষ্ঠানের বা ব্যবস্থাপনার উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারকারী পরিবেশের উপাদানসমূহ
Stoner ও অন্যরা বলেছেন, “Direct action elements are those elements of the environment that directly influence an organization’s activities. 13. অর্থাৎ প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান হলো পরিবেশের সেই সকল উপাদান যা প্রতিষ্ঠানের কাজের ওপর প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্যে প্রতিষ্ঠানের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তারকারী পরিবেশের উপাদানসমূহ প্রদর্শিত হলো :

ক) অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহ ( Interal environments) :
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যক্ষ প্রভাব রাখে। নিম্নে এরূপ বিষয় বা উপাদানসমূহ আলোচনা করা হলো : ১. মালিক বা শেয়ারহোল্ডার (Owners or shareholders) : ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে কার্যত মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করে । তাই মালিকপক্ষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মাথায় রেখেই ব্যবস্থাপনাকে কার্য সম্পাদন করতে হয় । প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের ওপর এরূপ উপাদানের প্রভাব বেশি থাকে ।
২. পরিচালনা পর্ষদ (Board of directors) :
কোম্পানি সংগঠনে পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধি হিসেবে কোম্পানির মৌল নীতি নির্ধারণ, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় মৌল দিক-নির্দেশনা প্রদান ইত্যাদি কার্য সম্পাদন করে । তাই ব্যবস্থাপনার ওপর পরিচালনা পর্ষদেরও প্রত্যক্ষ প্রভাব সবসময়ই লক্ষণীয় ।
৩. শ্রমিক-কর্মী (Employee) :
শ্রমিক-কর্মী এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত সংঘ যেকোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মরত গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ । তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আগ্রহ-অনাগ্রহ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে । অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নয়নের স্বার্থে ব্যবস্থাপনা শ্রমিক-কর্মীদের মনোবল উন্নয়ন এবং শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালায় ।
৪. প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য ( Financial ability of the organization) :
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য -এর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবস্থাপনার ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে । নিজস্ব আর্থিক সামর্থ্য ভালো হলে প্রতিষ্ঠান যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে এগিয়ে যেতে পারে।
৫. প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত মান (Technological standard of the organization) :
প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির কারিগরি বা প্রযুক্তিগত মানও প্রতিষ্ঠানের বা ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যক্ষ প্রভাব রাখে । যদি যন্ত্রপাতির এরূপ মান আশাব্যঞ্জক না হয় তবে চাইলেও উৎপাদন বাড়ানো যায় না বা খরচ কমানো সম্ভব হয় না।
৬. ব্যবহৃত পদ্ধতি (Applied method) :
প্রতিষ্ঠানে যে উপায় বা পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় তাও ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যক্ষ প্রভাব সৃষ্টি করে । প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত পদ্ধতি ও কর্মকৌশল যদি আধুনিক ও দক্ষ হয় তবে সেখানে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। অন্যথায় শত চেষ্টা করেও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয় না |
৭. প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সংস্কৃতি (Organizational culture) :
দীর্ঘকালে কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কতকগুলো ধারণা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও নিয়ম-নীতি গড়ে ওঠে। যার আওতায় প্রতিষ্ঠানের জনশক্তির বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কার্যাকার্যে তা প্রভাব রাখে। ব্যবস্থাপনাকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই এরূপ উপাদানকে বিবেচনায় আনতে হয় ।
খ) বাহ্যিক উপাদানসমূহ (External environments) :
প্রতিষ্ঠানের বাইরের বিভিন্ন অবস্থা এবং পক্ষসমূহের কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণ প্রতিষ্ঠানের বা এর ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে । এরূপ উপাদানসমূহ নিম্নরূপ :
১. প্রতিযোগী (Competitors) :
বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় জগতে প্রতিযোগীদের কর্মকাণ্ড ও কর্মকৌশল কোনো প্রতিষ্ঠান বা এর ব্যবস্থাপনার ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে। প্রতিযোগীরা সব সময়ই ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট উপায়-উপকরণ নিয়ে কাড়াকাড়িতে লিপ্ত হয়। এক্ষেত্রে বাজার, প্রযুক্তি, পদ্ধতি, জনশক্তি ইত্যাদি মুখ্য।
২. ক্রেতা বা ভোক্তা (Customers) :
অর্থের বিনিময়ে যারা প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা ক্রয় করে তারা ব্যবস্থাপনার বাহ্যিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে এই ক্রেতা বা ভোক্তাসাধারণের ইচ্ছা ও আগ্রহের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য নির্ভর করে । তাই তাদের চাহিদা পূরণে ও আস্থা অর্জনে সব সময়ই ব্যবস্থাপনা সচেষ্ট থাকে ।
৩. সরবরাহকারী (Suppliers) :
কাঁচামাল বা পণ্য সরবরাহকারী ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বাহ্যিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান । এরূপ সরবরাহকারীদের সহযোগিতার ওপর ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভর করে। তাই সরবরাহকারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আগ্রহ-অনাগ্রহকেও মূল্য দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। অবশ্য ঋণ সরবরাহকারীদের আচরণও এক্ষেত্রে বিবেচ্য।
৪. মধ্যস্থ ব্যবসায়ী (Middlemen) :
কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি বাজারজাতকরণের (Direct marketing) নীতি গ্রহণ না করলে, ক্রেতা বা ভোক্তা সাধারণের নিকট পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেক্ষেত্রে মধ্যস্থ ব্যবসায়ীর সংখ্যা, তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও আচার-আচরণ প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব রাখে ।
৫. সরকার বা সরকারি সংস্থা (Govt. or Govt. agency) :
সরকার বা সরকারি সংস্থাসমূহের বিভিন্ন নীতি অনেকসময় প্রত্যক্ষভাবে ব্যবসায়কে প্রভাবিত করে। সরকারের করনীতি, শুল্কনীতি, শিল্পনীতি, বাণিজ্য নীতি ইত্যাদি অনেকসময় ব্যবসায়ের অনুকূল হয়; আবার কখনও তা প্রতিকূল হতে পারে । সেক্ষেত্রে এ ধরনের নীতিকে অবশ্যই বিবেচনায় এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে ।

৬. কৌশলগত মিত্র (Startegic allies) :
যেক্ষেত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালনায় মিত্রতার বন্ধন গড়ে ওঠে বা জোটের সৃষ্টি হয় সেক্ষেত্রে এরূপ মিত্রদের চিন্তা-ভাবনা এবং কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠান বা এর ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে । সেক্ষেত্রে তাও বিবেচনা করে চলতে হয় ।
