আজকের আলোচনার বিযয় বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা – যা কর্তৃত্বাপণ ও বিকেন্দ্রীকরণ এর অর্ন্তভুক্ত, প্রতিষ্ঠানে কতটুকু কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । ক্ষুদ্রায়তনের প্রতিষ্ঠানসমূহ বাদ দিলে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যত দেখা যায় না, যেখানে পূর্ণমাত্রায় কেন্দ্রীকরণ বা বিকেন্দ্রীকরণ বিদ্যমান ।
যে কারণে গ্রে ও স্ট্রেক বলেছেন, “Absolute centralization and decentralization is fictitious in practice, it is a matter of degree along a continuum.”31 অর্থাৎ সম্পূর্ণ কেন্দ্রীকরণ বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবপক্ষেই অসম্ভব; এটা মূলত উভয়ের সংমিশ্রণে একটি আপেক্ষিক মাত্রাগত বিষয় ।
Table of Contents
বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা

বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা কীভাবে পরিমাপ করা যায় এ সম্পর্কে R. M. Hodgetts চারটি বিষয় বিবেচনার কথা বলেছেন; যেমন-বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিমাণ (Quantity of decisions), সিদ্ধান্তের মান (Quality of decisions), সিদ্ধান্তের প্রভাব (Impact of decisions) ও নিয়ন্ত্রণের পরিমাণ (Amount of control) নানান বিচার-বিবেচনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রাকে নিম্নোক্ত চারভাগে ভাগ করা যায় :
১. কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা (Centralized management) :
যে সংগঠন কাঠামোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে কেন্দ্রীভূত রাখা হয় তাকেই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা বলে । ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ হতেই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা জন্ম নেয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সকল ভালো-মন্দের দায় ও মূল কর্তৃত্ব থাকে শীর্ষ নির্বাহীর ওপর । অধস্তন কর্মী বা নির্বাহীগণ কার্যক্ষেত্রে সীমিত কর্তৃত্ব লাভ করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাদের থাকে না। ফলে সামগ্রিক সংগঠনের ওপর উর্ধ্বতনদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে । ছোট ধরনের প্রতিষ্ঠানে এরূপ ব্যবস্থাপনা লক্ষণীয় ।
২. পরিমিত বিকেন্দ্রীকরণ (Limited decentralization) :
যে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ে সংরক্ষণ করে কম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার নিচের পর্যায়ের নির্বাহীদের হাতে অর্পণ করা হয় তাকে পরিমিত বিকেন্দ্রীকরণ বলে। এক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবেচনায় যে সকল সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে গ্রহণ করা হলে প্রতিষ্ঠান ও অধস্তনদের ওপর ঊর্ধ্বতনের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে সেই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে সংরক্ষণ করে কম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার নিচের নির্বাহীদের কাছে অর্পণ করা হয়ে থাকে ।
৩. বিশেষ কর্তৃত্ব অর্পণ (Delegation of special authority) :
যে বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সাধারণ নিয়মে সমপর্যায়ভুক্ত সকল নির্বাহীদেরকে একই মাত্রায় কর্তৃত্ব অর্পণ না করে শুধুমাত্র যোগ্য নির্বাহীদের ওপর বিশেষ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব অর্পণ করা হয় তাকে বিশেষ কর্তৃত্ব অর্পণ বলে । এর সুবিধা হলো বিকেন্দ্রীকরণের ফলে শীর্ষ নির্বাহীর কর্তৃত্ব যেভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এক্ষেত্রে তা হয় না ।
অধস্তন নির্বাহী যতক্ষণ পর্যন্ত তার যোগ্যতাবলে শীর্ষ নির্বাহীকে সন্তুষ্ট রাখতে পারেন, ততক্ষণ পর্যন্তই সে এরূপ কর্তৃত্ব ভোগ করেন। ফলে সমপর্যায়ের অন্যান্য নির্বাহীদের মধ্যেও যোগ্যতা অর্জনের আগ্রহ সৃষ্টি হয় । তবে এর বড় অসুবিধা হলো সমপর্যায়ে নিযুক্ত অন্য নির্বাহীরা এরূপ কর্তৃত্ব না পাওয়ায় এক্ষেত্রে তাদের মনোবলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে ।
৪. সর্বাত্মক বিকেন্দ্রীকরণ (Bottom-up administration) :
অধস্তন নির্বাহীদেরকে স্ব স্ব বিভাগের কাজের ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণসহ সকল ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব প্রদান করা হলে তাকে সর্বাত্মক বিকেন্দ্রীকরণ বলে । একে বিকেন্দ্রীকরণের সর্বোচ্চ মাত্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ বা শাখাকে তাদের বিভাগ-সম্পর্কিত বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ, নীতি নির্ধারণ, কর্মসূচি প্রণয়ন ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সকল ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হয় ।
ফলে শীর্ষ নির্বাহীর কাজ হয় অধস্তনদের কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা। কখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হলেই শুধুমাত্র শীর্ষ নির্বাহী সেখানে হস্তক্ষেপ করেন । ১৯২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেক সু কোম্পানি (Brake Shoe Company) -তে সর্বপ্রথম এ ধরনের ব্যবস্থাপনা সফলতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হয় ।

উপসংহারে বলা যায়, বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা কেমন হওয়া উচিত তা এক কথায় বলে দেয়া যায় না । এটা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থার ওপর। এর মধ্যে ব্যবসায়ের প্রকৃতি, ভৌগোলিক অবস্থা, অধস্তন নির্বাহীদের যোগ্যতা, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অপরিহার্যতা ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ । এসব বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেই প্রতিষ্ঠানে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা নির্ণীত হওয়া উচিত।
