ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার বাহ্যিক পরিবেশ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিবেশ” বিষয়ক পাঠের অংশ। প্রতিষ্ঠানের বাইরের বিভিন্ন অবস্থা এবং পক্ষসমূহের কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণ সমন্বয়ে যে পরিবেশ গড়ে ওঠে তাকে ব্যবস্থাপনার বাহ্যিক পরিবেশ বলে । এরূপ পরিবেশের উপাদানসমূহ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে । প্রভাবের মাত্রা বিবেচনায় এনে একে দু’ভাগে ভাগ করা হয়; যা নিম্নরূপ :
Table of Contents
ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার বাহ্যিক পরিবেশ

i) কার্যসংশ্লিষ্ট বাহ্যিক পরিবেশ (Task enviroment) :
বাইরের কোনো নির্দিষ্ট সংস্থা বা পক্ষ যারা প্রত্যক্ষভাবে ব্যবস্থাপনার কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে তাদের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানের বা এর ব্যবস্থাপনার কর্মসংশ্লিষ্ট বাহ্যিক পরিবেশ গড়ে ওঠে । এর আওতাধীন উপাদানসমূহ নিম্নরূপ :
১. প্রতিযোগী (Competitors) :
বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় জগতে প্রতিযোগীদের কর্মকাণ্ড ও কর্মকৌশল কোনো প্রতিষ্ঠান বা এর ব্যবস্থাপনার ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে। প্রতিযোগীরা সব সময়ই ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট উপায়-উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাড়াকাড়িতে লিপ্ত হয়। এক্ষেত্রে বাজার, প্রযুক্তি, পদ্ধতি, জনশক্তি ইত্যাদি মুখ্য । নব্য প্রতিযোগী, বিকল্প পণ্য ইত্যাদি নিয়েও এক্ষেত্রে। ভাবতে হয় ।
২. ক্রেতা বা ভোক্তা (Customers) :
অর্থের বিনিময়ে যারা পণ্য বা সেবা ক্রয় করে তারা ব্যবস্থাপনাঃ বাহ্যিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচ্য। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে এই ক্রেতা ব ভোক্তাসাধারণের ইচ্ছা ও আগ্রহের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য নির্ভর করে । তাই তাদের চাহিদা পূরণে, আস্থা অর্জনে এবং কাছাকাছি পৌঁছাতে সবসময়ই ব্যবস্থাপনা সচেষ্ট থাকে।
৩. সরবরাহকারী (Suppliers) :
কাঁচামাল বা পণ্য সরবরাহকারীগণ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট বাহ্যিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এরূপ সরবরাহকারীদের সহযোগিতার ওপর ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভ করে । তাই সরবরাহকারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আগ্রহ-অনাগ্রহকেও মূল্য দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। অবশ্য ঋণ সরবরাহকারীদের আচরণও এক্ষেত্রে বিবেচ্য।
৪. মধ্যস্থ ব্যবসায়ী (Middlemen) :
কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি বাজারজাতকরণের (Direct marketing) নীতি গ্রহণ না করলে, ক্রেতা বা ভোক্তা সাধারণের নিকট পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেক্ষেত্রে মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের সংখ্যা, তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা আচার-আচরণ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব রাখে।
৫. কৌশলগত মিত্র (Startegic allies) :
যেক্ষেত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালনায় মিত্রতার বন্ধন গড়ে ওঠে বা জোটের সৃষ্টি হয় সেক্ষেত্রে এরূপ মিত্রদের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠান বা এর ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে। বর্তমানকালে বৃহদায়তন বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই দেশে-বিদেশে এ ধরনের মিত্র গড়ে তোলে ।
৬. সরকারি সংস্থা (Govt. agency) :
সরকার যখন কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায় খাতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারি সংস্থার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে তখন এরূপ সংস্থার ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রতিষ্ঠান বা এর ব্যবস্থাপনার ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে। এ ছাড়া ব্যবসায়ের বিভিন্ন খাত সম্পর্কে সরকারের আগ্রহ-অনাগ্রহ ও সরকারি নিয়ম-নীতি ব্যবস্থাপনায় প্রভাব রাখে ।
ii) সাধারণ পরিবেশ (General environment) :
যে বাহ্যিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা প্রতিষ্ঠান বা এর ব্যবস্থাপনার কর্মকাণ্ডে পরোক্ষ হলেও বড়ো ধরনের ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে তাকে সাধারণ পরিবেশ বলে । দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যবস্থাপনাকে এরূপ পরিবেশ বিবেচনায় আনতে হয়। এরূপ পরিবেশের আওতাধীন উপাদানসমূহ নিম্নে আলোচিত হলো :
১. ভৌগোলিক উপাদান (Physical elements ) :
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও এর ব্যবস্থাপনার ওপর দেশের প্রাকৃতিক বা ভৌগোলিক উপাদান বা পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য। দেশের আয়তন, অবস্থান, ভূ- প্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত । প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী একেক দেশে একেক ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার লাভ করে। তাই এরূপ উপাদান ব্যবস্থাপনার সাধারণ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ।
২. অর্থনৈতিক উপাদান (Economic elements) :
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা কোনো প্রতিষ্ঠান ও এর ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি, মন্দাবস্থা, সুদের উচ্চ হার ইত্যাদি স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও বিক্রয়কে প্রভাবিত করে। ব্যবস্থাপনাকে এগুলো সবসময়ই বিবেচনায় এনে কাজ করতে হয়।
৩. প্রযুক্তিগত উপাদান (Technological elements) :
পণ্য বা সেবা উৎপাদন পদ্ধতির বিষয়টি কারিগরি উপাদানের সঙ্গে সম্পৃক্ত । যদিও সাধারণভাবে একটা প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতির কারিগরি মান অভ্যন্তরীণ পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিন্তু সামগ্রিকভাবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও এর প্রাপ্তব্যতার সঙ্গেও এটি সম্পর্কযুক্ত। কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনকার্যে রোবটের ব্যবহার ইত্যাদি স্বাভাবিকভাবেই ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে ।
৪. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান (Social and cultural elements) :
বাহ্যিক সাধারণ পরিবেশের মধ্যে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত । দেশের জনসংখ্যা, জনগণের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ইত্যাদি মিলে এরূপ উপাদান গড়ে ওঠে । এগুলোও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে ।
৫. রাজনৈতিক উপাদান (Political elements) :
রাজনৈতিক উপাদান বলতে কোনো দেশের সরকার ও সরকারি নীতিমালা, রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানসমূহ, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি বিষয়কে বুঝায় । দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যদি ভালো হয় তবে ব্যবস্থাপকদের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয় । অন্যথায় তা ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করে ।
৬. আইনগত উপাদান (Legal elements) :
ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এর সম্পর্কিত বিভিন্ন আইন-কানুন ব্যবস্থাপকদের মেনে চলতে হয়। এ জন্য দেশে বিদ্যমান আইনসমূহ মিলে আইনগত পরিবেশের জন্ম নেয় । যা বাহ্যিক সাধারণ উপাদানের আওতায় আসে। দেশের শিল্প সংক্রান্ত আইন, বাণিজ্য সংক্রান্ত আইন, পরিবহন বিষয়ক আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ইত্যাদি এরূপ পরিবেশের উপাদান হিসেবে গণ্য ।

৭. আন্তর্জাতিক উপাদান (International elements) :
আন্তর্জাতিক উপাদান বলতে দেশের সামগ্রিক ব্যবসায় পরিস্থিতি অন্য দেশের ব্যবসায় কর্মকাণ্ডের দ্বারা কতটা প্রভাবিত হচ্ছে তাকে বুঝায় । বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকেও দেশের বাজারে বিদেশী পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয় । কোনো দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সরকারগুলোর আমদানি ও রপ্তানি নীতি, বিশেষ সুযোগ- সুবিধা বা ছাড় ইত্যাদি এক্ষেত্রে বিবেচ্য।
