যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা

যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” সিদ্ধান্ত গ্রহণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা । ব্যবস্থাপকীয় সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপকগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কতকগুলো বাধার সম্মুখীন হন, যেগুলো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে ।19 এসব প্রতিবন্ধকতার কিছু পরিস্থিতিগত, কিছু সাংগঠনিক এবং কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আচরণগত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিম্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পথে সৃষ্ট প্রধান 1 প্রধান প্রতিবন্ধকতা বা সীমাবদ্ধতাসমূহ উল্লেখ করা হলো:

যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা

 

যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা | সিদ্ধান্ত গ্রহণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১.অপূর্ণাঙ্গ বা অসম্পূর্ণ তথ্য (Imperfect or incomplete information) :

সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য ব্যবস্থাপকেরা পায় না এবং সম্পূর্ণ তথ্যাদি সংগ্রহ করতে হলে পর্যাপ্ত সময় ও অর্থ মায়ের যে প্রয়োজন পড়ে তারও সুযোগ সর্বত্র থাকে না। ফলে অপূর্ণাঙ্গ বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এতে সিদ্ধান্ত সঠিকতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারে না ।

২. সমস্যা ও বিকল্পসমূহের অসঠিক শনাক্তকরণ (Inaccurate identification of problem or adernatives) :

অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপকগণ যথাযথভাবে সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারে না কিংবা কার্যকর বিকল্পসমূহের সন্ধান পান না । সমস্যার লক্ষণকেই সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করায় প্রকৃত সমস্যা অনাবিষ্কৃত থাকে । বার্ণ এন্ডারসন-এর মতে, “Finding the problem is just as important as making the decision. 20 অর্থাৎ প্রকৃত সমস্যা নিরূপণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভুল বা অসঠিক সমস্যার চিহ্নিতকরণ থেকে সঠিক সমাধান পাওয়া সম্ভব নয় ।

৩. পক্ষপাতমূলক ঝোঁক (Biases) :

সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় নিজস্ব পক্ষপাতমূলক ঝোঁকের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং নিজস্ব ধ্যান ধারণার প্রতিফলন ঘটিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় । এতে সিদ্ধান্ত সঠিক ও কার্যকর হয় না।

৪. সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনীহা (Timidity) :

অনেক নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিচ্ছুক থাকেন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অনীহা প্রকাশ করেন। এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও যেনতেনভাবে নেয়া হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।

৫. সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি, মাপকাঠি ও উদ্দেশ্য নির্ণয়ে ব্যর্থতা (Failure to define conditions, criteria and objectives) :

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো সিদ্ধান্তের পরিস্থিতি, মূল্যায়নের আদর্শ পরিমাপক ও সিদ্ধান্ত উদ্দেশ্য সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপক বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এ তিনটি বিষয় চিহ্নিতকরণে ব্যর্থ হন। ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়।

 

৬. তথ্যের অনির্ভরযোগ্য উৎস (Unreliable sources of information)

সঠিক সিদ্ধান্ত- গ্রহণের জন্য সঠিক, নির্ভুল, বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যের প্রয়োজন । কিন্তু অনেক সময় নির্বাহীগণ অনির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কিংবা অন্যের মতামত বা অসমর্থিত তথ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ত্রুটিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিমূলক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । যা বাস্তবায়নে সুফল পাওয়া যায় না ।

৭. সুসংবদ্ধ পদ্ধতির অনুপস্থিতি (Absence of systematic method) :

সিদ্ধান্ত সম্পর্কিত তথ্য ও উপাত্ত নিজস্ব অনুমান নির্ভর পদ্ধতিতে তথ্যাদির বিচার-বিশ্লেষণ করে। ফলে সিদ্ধান্ত তথ্যনির্ভর না হয়ে সিদ্ধান্তকারীর বিশ্লেষণে সুসংবদ্ধ পদ্ধতির প্রয়োগ করা আবশ্যক। অধিকাংশ সিদ্ধান্ত -গ্রহণকারী বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে ধারণা নির্ভর হতে বাধ্য হয় । বিচার ক্ষমতাকে অবদমিত করে । Carl Anderson বলেছেন, “সমস্যা যখন অপ্রত্যাশিতভাবে আবির্ভূত হয় 

৮. আবেগের প্রভাব (Effect of emotion) :

সিদ্ধান্ত -গ্রহণকারীর ব্যক্তিগত আবেগ অনেক সময় যুক্তিনির্ভর তখন আবেগ মাথাচাড়া দেয় ও যৌক্তিকতা বিতাড়িত হয়।” (Problems crop up, however when emotions ke over and drive out the rational aspects. 21 তাই প্রথমেই আবেগকে বর্জন করে যৌক্তিক হওয়া আবশ্যক। এজন্য সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে না করলে পুনরায় সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্রসর হতে হয়।

৯. বাস্তবায়নে ব্যর্থতা (Failure to implement) :

সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর তা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেয়া হয় না। অধিকাংশ সিদ্ধান্ত- গ্রহণকারী মনে করেন সিদ্ধান্ত- গ্রহণ করাটাই বুঝি তাদের কাজ। বস্তুত এটি সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার সূচনাপর্ব মাত্র। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও তাদের কাজ এ বোধের অভাবে তারা বাস্তবায়নে অমনোযোগী থাকে ।

১০. উপকরণের অপ্রতুলতা (Inadequacy of input factors) :

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সম্পদ, মানবীয় সম্পদ ও ভৌত সম্পদের অভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর্যায়ে উপনীত হতে পারে না । প্রয়োজনীয় মূলধন, জনশক্তি ও অন্যান্য উপকরণের অপর্যাপ্ততাই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ার প্রধান কারণ ।

১১. পরামর্শ গ্রহণে অনীহা (Reluctance to take suggestions) :

অনেক নির্বাহীর অহমবোধ, নিরাপত্তাবোধ, দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার আশংকা ইত্যাদি কারণে তারা অন্যের পরামর্শ গ্রহণে অনিচ্ছুক হন । অথ্য অন্যের সৃজনশীল কিংবা সহযোগিতামূলক পরামর্শ অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীকরণের সহায়ক হয় । কিন্তু অনিচ্ছুক সিদ্ধান্তকারী এ জাতীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং এতে সিদ্ধান্ত অকার্যকর হয়।

 

যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা | সিদ্ধান্ত গ্রহণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১২. সহযেগিতার অভাব (Lack of co-operation) :

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনেক ক্ষেত্রেই অধস্তনরা ঊর্ধ্বতনদের সহযোগিতা করে না । অনেক ক্ষেত্রেই পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা ইত্যাদির অভাবেই সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হয় না । তাই অধস্তনদের সহযোগিতার অভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে । উপরোক্ত কারণগুলো ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত- গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানের কার্য পরিবেশ ও সাংগঠনিক সংস্কৃতির ও উন্নতি সাধন করতে পারলে এরূপ অধিকাংশ প্রতিবন্ধকতাই অপসারণ করা সম্ভব ।

Leave a Comment