আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় শ্রমিক টেকনিশিয়ান এবং নির্বাহীদের প্রশিক্ষণের পদ্ধতিসম।
Table of Contents
শ্রমিক টেকনিশিয়ান এবং নির্বাহীদের প্রশিক্ষণের পদ্ধতিসমূহ

সাম্প্রতিককালে কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের বিভিন্ন প্রকার পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। কর্মীকে কোন পদ্ধতিতে ট্রেনিং প্রদান করা হবে তা নির্ভর করে কার্যের প্রকৃতি, কর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, নির্বাহীর দক্ষতা প্রভৃতির উপর। একটি প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের শ্রমিক-কর্মী, কর্মকর্তা কর্মরত থাকে। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে। টেকনিশিয়ান, নির্বাহী ও সাধারণ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ভিন্নরূপ। উদ্দেশ্যভেদেও প্রশিক্ষণের কৌশল বা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে ও বাইরে বিভিন্ন হয়। নিম্নে আলোচনার সুবিধার প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্মিলিতভাবে বর্ণনা করা হল ঃ
১। কার্যের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ ঃ
কর্মীকে তার কার্যক্ষেত্রে হাতে কলমে কার্য সম্পাদন পদ্ধতি ও কলাকৌশল শিক্ষা দেয়াকে “On the job” ট্রেনিং বা কার্য অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ বলে। নতুন কর্মী বা ব্যবস্থাপক কার্যে যোগ দিলে অথবা অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে তাকে এ ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে কর্মীকে একটি নিয়মিত চাকরিতে নিয়োগ করা হয়। তারপর তাকে একজন যোগ্য কর্মী বা নির্দেশকের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে হয়। প্রাথমিক জ্ঞান দান করার জন্য এটি একটি উত্তম পদ্ধতি। কর্মী বা নির্বাহী যখন কাজ শিখে যায় তখন তাকে কার্যক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
২। আরোহ প্রশিক্ষণ ঃ
নিয়োগের পর কর্মীকে যে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় তাই আরোহ প্রশিক্ষণ। কার্যের কার্যের পরিবেশের সাথে কর্মীর পরিচয় ঘটানোই এ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য। এ ব্যবস্থায় কোম্পানির সামগ্রিক নীতি ও উদ্দেশ্যাবলি সম্পর্কে কর্মীদেরকে জ্ঞান দান করা হয়।
৩। শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণ ঃ
ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রাফটস্ এবং অন্যান্য মাধ্যমে কর্মীকে তাত্ত্বিক জ্ঞানসহ বা ছাড়া একজন প্রশিক্ষক বা সুপারভাইজারের অধীনে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণ গ্রহণকালীন সময়ে কর্মীকে কম হারে বেতন প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণদাতা বক্তৃতা ও কার্যক্ষেত্রে হাতেকলমে কার্য সম্পাদনের কৌশল দেখিয়ে দিয়ে ট্রেনিং প্রদান করেন। পেশাগত শিক্ষাক্ষেত্রে এ প্রশিক্ষণ খুবই উপযোগী। দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার জন্য এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। শিক্ষানবিশ হিসেবে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় কর্মীগণ কার্য পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়ার সুযোগ লাভ করে।
৪। পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ঃ
এটি শিক্ষানবিশি প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সাথে অনেকখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ গ্রহীতাকে একজন অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ নির্বাহী এবং তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নিয়োগ করা হয়। তারা প্রশিক্ষণদাতার কষ দেখে ও তারা নির্দেশ ও পরামর্শ মোতাবেক চলে কাজ শিখে থাকে। প্রশিক্ষক কর্মকর্তা কাজ শিখানোর জন্য অতীব যত্নসহকারে নির্দেশনা, পরামর্শ ও উপদেশ দেন এবং সক্রিয়ভাবে কর্মীকে সহযোগিতা করেন। পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি টেকনিশিয়ান, নির্বাহী ও অন্যান্য পদস্থ কর্মীর প্রশিক্ষণ দানের জন্য অধিক উপযোগী।
৫। নাট্যাভিনয় কৌশল ঃ
মরোনো’ নামক জনৈক বিশেষজ্ঞ মানসিক বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিবর্গের চিকিৎসা করার জন্য ভূমিকা অভিনয় পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। কারবারি ও শিল্পজগতে মানবীয় সম্পর্ক ও নেতৃত্বের উন্নয়ন সাধন করার জন্য। পদ্ধতি বিশেষ ফলপ্রদ। এ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় কার্য সম্পাদন কিংবা কোন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে মঞ্চে অভিনয় করে কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এতে কার্যের সমস্যা সমাধানের উপযোগী করে মঞ্চ তৈরি করা হয় এবং কর্মীগণ বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করে বাস্তব শিক্ষা লাভ করে। এতে তাদের মধ্য হতে কেউ ব্যবস্থাপক, কেউ কেরানি, কেউ পিয়ন, কেউ বা পদপ্রার্থীর ভূমিকায় অভিনয় করে। প্রশিক্ষণদাতা তাদের ভুলত্রুটি সংশোধন করে প্রকৃত শিক্ষা প্রদান করেন। বাকি প্রশিক্ষণ গ্রহীতারা নাট্যাভিনয় দেখে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করে। এভাবে পর্যায়ক্রমে সকল প্রশিক্ষণ গ্রহীতাকে অভিনয়ে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
৬। ঘটনা—সমীক্ষা পদ্ধতি ঃ
নাট্যাভিনয় পদ্ধতির সাথে এর যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। সাধারণত নির্বা কর্মকর্তাদের এ পদ্ধতিতে ট্রেনিং প্রদান করা হয়। এ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ গ্রহীতাগণকে বিশেষ কোন সমস্যা সমাধাে অর্পণ করা হয়। তারা নিজেদের ভিতর আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার সমাধান বের করে। অনেক সময় এ পদ্ধতি প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে একটি কল্পিত সমস্যা সম্বলিত কতকগুলো ঘটনা প্রস্তুত করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে দিপিত আকারে সরবরাহ করা হয়। তখন তারা সমস্যার প্রকৃতি অনুধাবন করার চেষ্টা করেন, সমস্যাটি যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয় এবং সমাধানের বিভিন্ন উপায় বের করা হয়। শিক্ষার্থীগণ যাতে তাদের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চিন্তাশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যা শনাক্ত ও সমাধানে সক্ষম হন, সে উদ্দেশ্যেই এ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
৭। ফ্লায়িং স্কোয়াড্রন পদ্ধতি ঃ
এ পদ্ধতিতে ট্রেনিং গ্রহীতাগণকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল বা স্কোয়াড্রনে বিভক্ত করে বিভিন্ন কার্য সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণের পর তাদেরকে উপযুক্ত স্থানে নিয়োগ করা হয়। কোম্পানির বিভিন্ন কার্যের জন্য অধিক সংখ্যক কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হলে এ ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়। এ ব্যবস্থায় এক দলের প্রশিক্ষণ শেষ হলে অন্য দলকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
৮। কোচিং ঃ
এ পদ্ধতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে Luthans and Mortinko বলেন যে, “সুপারভাইজারগণ তার কার্য সম্পাদন বিষয়ে প্রতিদিন কর্মচারীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে যে প্রশিক্ষণ দেন, তাই কোচিং। —চারী ও টেকনিশিয়ানদের ব্যবহারিক জ্ঞান দানের জন্য এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এ পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থী মচারীগণ একজন কোচের অধীনে কাজ করে থাকে। কোচ তার অধীন শিক্ষানবিশদিগকে কাজের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে থাকে। প্রয়োজনবোধে তিনি কর্মচারীর অতি নিকটে থেকে সূক্ষ্মভাবে কাজ করার পদ্ধতি, কীভাবে কোন কাজ করতে হবে তা শিখিয়ে দেন । কার্যে অগ্রগতি সাধনের উপায়ও তিনি বলে দেন।
৯। বক্তৃতা পদ্ধতি ঃ
নির্বাহী নতুন কর্মী ও উচ্চস্তরের শ্রমিকবৃন্দের নৈপুণ্য বৃদ্ধিকল্পে এ জাতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর মৌলিক উদ্দেশ্য প্রশিক্ষণ প্রার্থীকে সাধারণ ও নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক বিষয়ে জ্ঞান দান করা। সাধারণত এ জাতীয় প্রশিক্ষণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠানে দেয়া হয়। এটি কারিগরি ও আচরণিক নৈপুণ্য লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ।
১০। প্রবেশিকা শিক্ষাগৃহ প্রশিক্ষণ ঃ
বৃহদায়তন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে যখন অধিক সংখ্যক ব্যক্তিকে ট্রেনিং প্রদানের দরকার হয় তখন এ ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়। এ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানে কিছুসংখ্যক বিশেষজ্ঞ নির্দেশক বা শিক্ষক নিয়ে পৃথক প্রশিক্ষণ কক্ষ বা কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়। কার্যে যোগদানের পূর্বে মনোনীত প্রার্থীদিগকে প্রতিষ্ঠানে স্বল্পকালীন ট্রেনিং নিতে হয়। নির্দেশক বা শিক্ষকগণ প্রশিক্ষণ গ্রহীতাদের সাথে ক্লাসের ব্যবস্থা করে তাদেরকে তত্ত্বমূলক জ্ঞান দান করেন এবং প্রদর্শন পদ্ধতি অবলম্বন করে তাদেরকে হাতে কলমে কাজ শিখিয়ে থাকেন । প্রশিক্ষণ কোর্স সমাপ্তির পর তাদেরকে কার্যে বহাল করা হয়। এর জন্য পৃথক প্রশিক্ষণ কক্ষ ও শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হয় এবং প্রশিক্ষণ গ্রহীতাদেরকে বাস্তব জ্ঞান দানের জন্য ট্রেনিং কেন্দ্রে পৃথকভাবে কলকব্জা বসাতে হয়। এ ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ প্রদান অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
১১। প্রশিক্ষণ স্কুল ঃ
অনেক বৃহদায়তন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য পৃথক প্রশিক্ষণ স্কুলের ব্যবস্থা রাখে। এখানে প্রয়োজনানুযায়ী নতুন ও পুরাতন কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এ প্রশিক্ষণ প্রদান পদ্ধতি প্রবেশিকা শিক্ষাগৃহ ট্রেনিং প্রদান পদ্ধতির মতো।
১২। কমিটির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ঃ
এ পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত নির্বাহীদের বিভিন্ন কমিটি বা উপ-কমিটির সদস্য করা হয়। ফলে উক্ত নির্বাহী কমিটিতে নিয়োজিত পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকদের সাহায্য লাভ, আলাপ-আলোচনা ইত্যাদি হতে নির্বাহীরা প্রশিক্ষণ লাভের সুযোগ পায় ।
১৩। সেমিনার ও ওয়ার্কশপ ঃ
এ ধরনের পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বা বাইরে অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরের নির্বাহীদের নিয়ে বৎসরের বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা পেশ করা হয় এবং তা পর্যালোচনা করা হয়। যা শ্রবণ করে উপস্থিত সদস্যরা প্রশিক্ষণ লাভ করে। ওয়ার্কশপে একটু দীর্ঘ সময়ে ব্যবহারিক জ্ঞানের তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদানের চেষ্টা করা হয়।

