অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের সুবিধা নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। Advantages of Informal Organization আনুষ্ঠানিক সংগঠনের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সংগঠন কতটা যুক্তিযুক্ত বা অনানুষ্ঠানিক সংগঠন, আনুষ্ঠানিক সংগঠনের জন্য কতটা সহায়ক বা অসুবিধার কারণ হতে পারে এ নিয়ে বিতর্ক চলেছে অনেকদিন ধরে।
Table of Contents
অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের সুবিধা

গতানুগতিক মানসিকতার ব্যবস্থাপকগণ এরূপ সংগঠনকে সহজভাবে মেনে নিতে রাজি নন । তারা ভাবেন এরূপ সংগঠন ক্ষেত্রবিশেষে আনুষ্ঠানিক সংগঠনের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে । অবশ্য আধুনিক ব্যবস্থাপকগণ এরূপ ধারণা মানতে নারাজ । তারা মনে করেন কর্মীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যাপক অমিল হলে বা তাদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হলেই মাত্র কর্মীরা অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের অধীনে সংঘবদ্ধ হয়ে নিজ প্রতিক্রিয়া প্রকাশের চেষ্টা করে ।
তাই কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে যদি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট থাকে এবং এটা অধস্তনদের কাছে সুস্পষ্ট থাকে তবে তারা কখনই অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের মাধ্যমে ভিন্নরূপ আচরণে আগ্রহী হয় না । অনানুষ্ঠানিক সংগঠন থেকে যে সকল সুবিধা লাভ সম্ভব বলে আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিশারদগণ মনে করেন তা নিম্নে তুলে ধরা হলো :
১. সামগ্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন (Development of total system) :
কথায় বলে আইন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না । প্রতিষ্ঠানে যে সকল নিয়ম-নীতি থাকে তা দিয়েও এখানে উদ্ভূত সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় । কারণ এ সকল নিয়ম-নীতির বেশিরভাগই অনমনীয়তার দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে।
সেদিক বিচারে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক নমনীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়। Naney Foy অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের গুরুত্ব বলতে গিয়ে এ বিষয়েরই প্রতিধ্বনি করেছেন এভাবে, “Most important is that they (Informal organizations) blend with formal system to make an effective total system. “27 অর্থাৎ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এরূপ সংগঠন আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার সাথে মিলে একটা সফল সামগ্রিক ব্যবস্থার জন্ম দেয় ।
২. ব্যবস্থাপনার সামর্থ্যের শূন্যতা পূরণ (Filling gaps in management abilities) :
একজন ব্যবস্থাপক সকল বিষয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন হবেন এটা সব সময় প্রত্যাশা করা যায় না। আনুষ্ঠানিক সংগঠনে তিনি অন্যদের সাহায্য নেবেন এটাও কঠোর নিয়ম-কানুনের কারণে সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের ফলে আনুষ্ঠানিক সংগঠনে সবার মাঝে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠায় অধস্তনরা স্বেচ্ছায় ঊর্ধ্বতনের সাহায্যে এগিয়ে আসে। ফলে ব্যবস্থাপকের সামর্থ্যের শূন্যতা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া কোনো বিষয়ে স্তনদের রাজি করানো প্রয়োজন হলে অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে সবটা করা যায় না। অন্যনুষ্ঠানিক সংগঠনের সহযোগিতা নিয়ে বা অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের প্রয়োগ ঘটিয়ে সেক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তার উদ্দেশ্য সফল করতে পারে।
৩. ব্যবস্থাপনার কর্মভার লাঘবে সহায়তাদান (Reducing management workload) :
প্রতিষ্ঠানের অভ্যান্তরে যে সকল অনানুষ্ঠানিক সংগঠন গড়ে ওঠে তার সঙ্গে যদি ঊর্ধ্বতনের ভালো সম্পর্ক বজায় থাকে তবে ঊর্ধ্বতন কার্যক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও আনুগত্য লাভে সক্ষম হন। সেক্ষেত্রে তিনি কর্তৃত্বাপণ ও বিকেন্দ্রীকরণেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন । কম তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন হয় । ফলে ঊর্ধ্বতন অন্যান্য কাজে বেশি নজর দিতে পারেন । বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একজন প্রফেসর যখন বুঝেন তাঁর ছাত্ররা নিজেরা মিলেমিশে অর্পিত দলীয় কর্ম সঠিকভাবে সম্পাদন করবে তখন তার এ সংক্রান্ত ভাবনা ও কাজের চাপ উভয়ই হ্রাস পায়।
৪. উন্নততর ব্যবস্থাপনা কর্মে সহায়তা দান (Encouraging improved management practice) :
প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক সংগঠনের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সংগঠন থাকলে তা ক্ষেত্রবিশেষে ভারসাম্যাবস্থার (Check and balance) সৃষ্টি করে। একজন ঊর্ধ্বতন যদি বুঝেন কোনো দুর্বল পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের সদস্যদের দ্বারা সমালোচিত হতে পারে তবে তিনি তা গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করবেন এবং প্রয়োজনে তাদের কারও কারও পরামর্শ নেবেন।
এতে ব্যবস্থাপনার কর্মে অধিক সাফল্য লাভের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। Newstorm ও Keith Davis এ সম্পর্কেই বলেছেন, “ A benifit of informal organization that is seldom recognized is that its presence encourages managers to plan and act more carefully than they would otherwise. “28 অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের একটা সুবিধা যা প্রায়শই স্বীকৃতি পায় না- তা হলো এর উপস্থিতি ব্যবস্থাপকদের আরো সতর্কতার সাথে পরিকল্পনা গ্রহণে ও কাজ করতে উৎসাহিত করে যা অন্য কোনোভাবে হয়তো সম্ভব হতো না ।
৫. আবেগ নিরাময়ের সহজ ব্যবস্থা হিসেবে ভূমিকা পালন (Act as a safety value for emotion):
প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে বা সহযোগীদের সঙ্গে কখনও কোনো বিষয়ে মনোমালিন্য ঘটতে পারে । উর্ধ্বতনের বা অন্যদের আচরণে মনে দুঃখবোধ বা হতাশার জন্ম হতে পারে । উদ্বিগ্নতাও কোনো কর্মীকে পেয়ে বসতে পারে ।
এ সকল আবেগ-উদ্বিগ্নতা থেকে কর্মীকে সহজে রক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে অনানুষ্ঠানিক সংগঠন বা সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । যখন ঐ কর্মী নিজস্ব পরিসরে অন্যদের সঙ্গে মিশে তখন তার দুঃখবোধ অনেকটা লাঘব হয় । সহযোগীদেরকে সে নিজের মনের কথা বলে অনেকটা হালকা হতে পারে । অন্যরাও তাকে হতাশা ও উদ্বিগ্নতা কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্নভাবে সহায়তা করে । এতে ব্যক্তি সুস্থ মন নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করতে সক্ষম হয়।
৬. কার্যসন্তুষ্টি ও সহযোগিতা বৃদ্ধি (Increasing job satisfaction & co-operation) :
অনানুষ্ঠানিক সংগঠন কর্মীদের কর্মসন্তুষ্টি বৃদ্ধি করে । প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সে যখন কিছু বন্ধু পেয়ে যায় বা সমস্বার্থ চিন্তার এক মনের লোকদের সাহচর্য লাভ করে তখন প্রতিষ্ঠানের প্রতিও তার উৎসাহ বৃদ্ধি পায়। একটা দলের লোকদের মধ্যে যখন আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের বাইরেও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করে তখন কার্য পরিবেশ ও উৎপাদনশীলতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এতে কর্মীদের মনোবল উন্নত হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়। এজন্য Newstorm ও Keith Davis বলেছেন, “A significant venifit of informal organization is that it gives satisfaction and stability to work groups. It is the means by which workers feel a sense of belonging and security, and so satisfaction is increased and turnover reduced 29 অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সুবিধা হলো যে-এতে দলায় কাছে সন্তুষ্টি ও স্থিতিশীলতা আসে । এটি একটি উপায় যারা দ্বারা কর্মীরা অন্তর্ভুক্তি ও নিরাপত্তা বোধের অনুভূতি পার এবং তার দরুন সন্তুষ্টি বাড়ে ও কর্মী ঘূর্ণায়মানতা হ্রাস পায় ।

৭. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন (Improving communication) :
প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক সংগঠন কাঠামোতে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে তা অনেক সময় ধীরগতিসম্পন্ন ও জটিল হয় । অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ।
প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিজি বিভাগীয় প্রধানদের মধ্যে মেলামেশার একটা অনানুষ্ঠানিক সংগঠন গড়ে উঠলে সেখানেও আলাপ-আলোচনার ফাঁকে প্রতিষ্ঠান বা নিজেদের বিভাগ সম্পর্কে একে অপরের কাছে মতবিনিময় করতে পারে । প্রয়োজনে কোনো বিষয়ে তথ্য জানাতে বা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের বাইরেও যোগাযোগ স্থাপন করে কাজকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে ।
কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে তা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধা করে নেওয়া যায়। এরূপ সম্পর্কের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়ন ঘটায় নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমে যায় ।
