সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়নে বিবেচ্য বিষয়সমূহ

সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়নে বিবেচ্য বিষয়সমূহ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন” বিষয়ক পাঠের অংশ। একটি সহজ, শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ সংগঠন কাঠামো প্রতিষ্ঠানের কাজকে স্বাভাবিক, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও গতিশীল রাখতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রদান করে। এ ধরনের একটি সংগঠন কাঠামো প্রস্তুত করতে হলে কতকগুলো নিয়ম-নীতি বা বিবেচ্য বিষয়াদি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়। এরূপ নীতি বা বিবেচ্য বিষয়সমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো :

সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়নে বিবেচ্য বিষয়সমূহ

 

সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়নে বিবেচ্য বিষয়সমূহ | সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১. উদ্দেশ্য ও নীতি নির্ধারণ (Determination of objectives and policies) :

সংগঠন কাঠামো প্রণয়ন করার পূর্বে প্রতিষ্ঠানকে তার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হয় এবং কী নীতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে তা স্থির করার প্রয়োজন পড়ে । একটি ক্লাবের সংগঠন কাঠামো তার উদ্দেশ্যের কারণেই এক ধরনের হয় । উৎপাদনধর্মী প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামোও উদ্দেশ্য বিবেচনায় ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে । 

২. দক্ষতা (Efficiency) :

সংগঠন কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা আবশ্যক যাতে ন্যূনতম সামর্থ্য ও অর্থ ব্যয়ে পূর্ব পরিকল্পিত লক্ষ্যসমূহ অর্জন করা যায়। এক্ষেত্রে প্রতিটি উপাদান যাতে দক্ষতার সাথে কার্য সম্পাদন করতে পারে সংগঠন কাঠামো প্রণয়নে তা নিশ্চিত করারও প্রয়োজন পড়ে। R. M. Hodgets বলেছেন, “Efficiency means ‘doing things right’. It is often measured by the equation “output/input. 10 অর্থাৎ সঠিক কাজটা করতে পারাটাই দক্ষতা। কী পরিমাণ উপকরণ ব্যবহার করে কী পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে তা বিবেচনা করেই এটা পরিমাপ করা যায় ।

৩. নির্দিষ্টতা (Specification) :

সংগঠনের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কর্মচারীর স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। এ ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কতটুকু তাও স্পষ্ট থাকতে হবে। এজন্য প্রত্যেকটি বিভাগ, উপবিভাগ ও ব্যক্তির কাজকে সঠিকভাবে নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। প্রত্যেকের দায়িত্ব-কর্তৃত্বও সঠিকভাবে চিহ্নিত করা দরকার । সংগঠন কাঠামো প্রণয়নের সময় এ বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে রাখা একজন সংগঠকের কর্তব্য। 

৪. বিশেষজ্ঞতা (Specialization) :

সংগঠন কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা উচিত যাতে এর প্রত্যেক ব্যক্তি, বিভাগ ও উপবিভাগ বিশেষজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়। এ জন্য কার্যাদি এমনভাবে ভাগ করা প্রয়োজন যাতে একজন কর্মীকে একটিমাত্র কাজই করতে হয় বা একটি বিভাগ একই ধরনের কার্য সম্পাদন করে । আর এটা সম্ভব হলে ব্যক্তি বা বিভাগের পক্ষে ঐ কাজে বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব হয়ে থাকে ।

৫. ভারসাম্য (Balancing) :

সংগঠনের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানের সকল বিভাগ ও উপবিভাগের কার্যাবলির মধ্যে যতদূর সম্ভব সমতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত । কোনো বিভাগের কাজ বেশি হলে সেখানে বেশি জনশক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন । আবার কাজের পরিমাণ কম হলে জনশক্তিও কম রাখা দরকার । এমন যেনো না হয় যে কোনো বিভাগ বা এর কর্মীদের কাজ নেই আবার কোনো বিভাগের কর্মীরা কার্যভারগ্রস্ত ।

৬. দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সমতা (Consistency in authority and responsibility) :

কর্মীকে কর্তৃত্বের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেয়া প্রয়োজন । ক্ষমতা ব্যতীত দায়িত্ব বা কর্তব্য পালন করা সম্ভব নয় । কাউকে যদি হিসাব নিরীক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয় তবে তাকে হিসাবের খাতাপত্র তলব করার বা দেখার ক্ষমতা দেয়াও দরকার । দায়িত্ব যত বেশি হবে কর্তৃত্বের পরিমাণও ততই বেশি হওয়া আবশ্যক । 

 

৭. ব্যবস্থাপনার পরিসর ( Span of management) :

ব্যবস্থাপনা পরিসর বা তত্ত্বাবধান পরিসর নির্ণয় সংগঠন কাঠামো প্রণয়নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। R.M. Hodgetts বলেন, “Span of control (Spam of নির্বাহীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ঐ পরিমাণ অধস্তন নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন যাতে নির্বাহী যোগ্যতা সহকারে তাদের management), which refers to the number of people who report directly to a manager.” কাজ তত্ত্বাবধান করতে পারে। একজন নির্বাহীর তত্ত্বাবধান পরিসর কাম্য না হলে তা কার্যক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে |

৮. জোড়া-মই-শিকল (Scalar principle) :

জোড়া-মাই-শিকলের নীতি প্রতিষ্ঠা বলতে প্রতিষ্ঠানের ওপর হতে নিচ পর্যন্ত নিয়োজিত সকল ব্যক্তি, বিভাগ ও উপবিভাগকে শিকলের ন্যায় পরস্পর সম্পর্কযুক্ত করার কাজকে বুঝায় । শিকলের একপ্রান্ত ধরে টান দিলে অন্য প্রান্তেও যেমনি টান পড়ে সংগঠনেও যেনো প্রয়োজনীয় খবর, নির্দেশ সহজেই এক দিক হতে অন্যদিকে পৌঁছাতে পারে তা নিশ্চিত করা হয় ।

Griffin-এর ,”Scalar principle, suggests that there must be a clear and unbroken line of authority that extends from the lowest to the highest position in the organization. ” 12 অর্থাৎ জোড়া-মাই-শিকল নীতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানে একটি সুস্পষ্ট ও অভগ্ন কর্তৃত্ব রেখা অবশ্যই থাকবে যা প্রতিষ্ঠানের সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পদ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

৯. নমনীয়তা (Flexibility) :

সংগঠন কাঠামো এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত যাতে প্রয়োজনবোধে এটি পরিবর্তন করা যায় । Bartol ও Martin-এর মতে, “Flexibility in organization, just as organizations must be flexible to respond rapidly to changing enviroments. “13 অর্থাৎ সংগঠনে নমনীয়তা বলতে বুঝায়, সংগঠন এতটুকু নমনীয় হবে যাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম হয় । ধরা যাক, একজন সুপারভাইজার ৫ জন ফোরম্যানের কাজ সুষ্ঠুভাবে তত্ত্বাবধান করতে পারে। সংগঠন কাঠামোতে যদি ৪ জন ফোরম্যানের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাকে দেয়া হয় তবে প্রতিষ্ঠানে কাজ বাড়লে প্রয়োজনে ফোরম্যানের সংখ্যা একজন বাড়িয়ে এরূপ জায়গায় কাজের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা যায় ।

১০. সরলতা (Simplicity) :

প্রত্যেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে যথাসম্ভব সহজ সংগঠন কাঠামো তৈরি করা উচিত । সংগঠন কাঠামো যদি জটিল হয়, কার্যাদিকে যদি অনেক ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা হয় তবে সেক্ষেত্রে নির্দেশদান, তত্ত্বাবধান, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় । এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োজিত বিভিন্ন ব্যক্তি, বিভাগ ও উপবিভাগ তাদের কাজ, দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না ।

১১. ব্যয় সংকোচ (Reduction of cost) :

সংগঠনের কাঠামো এমন হওয়া উচিত যেন এর প্রত্যেক স্তরে ব্যয় সংকোচ করা সম্ভব হয় । প্রতিষ্ঠানের কোন পর্যায়ে কী পরিমাণ জনবলের প্রয়োজন হবে সংগঠন কাঠামো তা নির্দেশ করে । সঠিকভাবে কার্যবিন্যাস করে সুচিন্তিতভাবে যদি এ কাজ করা যায় তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানে জনবলের সংখ্যার সাথে ব্যয় হ্রাস পায় । এছাড়া প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও মুনাফার পরিমাণও বাড়ে ।

 

সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়নে বিবেচ্য বিষয়সমূহ | সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১২. আদেশের ঐক্য (Unity of command) :

সংগঠন কাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন একজন কর্মীকে একাধিক বসের নির্দেশ পালন করতে না হয় । Griffin-এর মতে, “Unity of command, suggests that each person within an organization must have a clear reporting relationship to one and only one boss”.14 একজন ব্যক্তি যদি একাধিক বসের অধীনে কাজ করে তবে দ্বৈত অধীনতার সৃষ্টি হয় আর সেক্ষেত্রে কর্মী কোন্ বসের নির্দেশ মানবে এ নিয়ে তার নিজের কাছেই প্রশ্ন দেখা দেয়। ফলে সে কারো সঠিকভাবে পালন করতে পারে না। 

নির্দেশই উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে উপসংহারে আমরা বলতে পারি যে, উপরের নীতি বা বিষয়গুলো বিবেচন করে সংগঠন কাঠামো তৈরি করলে সহজেই প্রতিষ্ঠানের সফলতা আসতে পারে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানের কারে বিশৃঙ্খলা এবং কর্মীদের মাঝে দায়িত্ব পালনে অনীহার সৃষ্টি হয়। যে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কখনোই তার লক্ষ্য অর্জন। করতে পারে না ।

Leave a Comment