ব্যবস্থাপনার সামাজিক দায়িত্ব পালনের পক্ষে যুক্তি

ব্যবস্থাপনার সামাজিক দায়িত্ব পালনের পক্ষে যুক্তি নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনার পরিচিতি” বিষয়ক পাঠের অংশ। দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য তথা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা আজ বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। শিল্প বিপ্লবের পূর্বকাল পর্যন্ত ব্যবসায়-বাণিজ্য ছিল ক্ষুদ্র প্রকৃতির । তাই বাজার ও উৎপাদন উভয়ই ছিল সীমাবদ্ধ ।

ব্যবস্থাপনার সামাজিক দায়িত্ব পালনের পক্ষে যুক্তি

 

ব্যবস্থাপনার সামাজিক দায়িত্ব পালনের পক্ষে যুক্তি | ব্যবস্থাপনার পরিচিতি | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

ব্যবসায়ীরা একান্তই ব্যক্তিক উন্নয়নের চিন্তা-ভাবনার মধ্যেই সীমিত থাকতেন। কিন্তু বর্তমানকালে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে । ব্যবস্থাপনাকে ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক সমাজের বিভিন্ন পক্ষের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে । ব্যবস্থাপনার এরূপ দায়িত্ব পালনের পিছনে যে সকল যুক্তি বিদ্যমান তা নিম্নে তুলে ধরা হলো :

১. প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সামর্থ্য বৃদ্ধি (Enhancing the organizational ability) :

বর্তমান বিশ্বজোড়া বাজারে সকল দেশেই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহদায়তন রূপ পরিগ্রহ করেছে । ফলে এ সকল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্যও বৃদ্ধি পেয়েছে । ফলে সমাজের বিভিন্ন পক্ষের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং সমাজকল্যাণধর্মী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ এ সকল প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বর্তমানে সম্ভব । তাই সামর্থ্যের যথাযথ সদ্ব্যবহারে এরূপ দায়িত্ব পালন সময়েরই দাবি ।

২. ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক গুরুত্ব বৃদ্ধি (Increasing the social importance of business organization) :

বর্তমানকালে পৃথিবীর সকল দেশেই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও এর ব্যবস্থাপকদের সামাজিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে । ব্যবসায়ীগণ শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতিই নিয়ন্ত্রণ করে না দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা- সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়েও তাদের পদচারণা খুবই লক্ষণীয় । এরূপ গুরুত্ব তাদেরকে সামাজিক দায়িত্ব পালনের মানসিকতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এরূপ গুরুত্ব বজায় রাখার স্বার্থেও ব্যবস্থাপনার এরূপ দায়িত্ব পালন করা উচিত।

৩. প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ (Competitive environment) :

বর্তমানকালে বিশ্বজোড়া বাজারে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান । তাই বাজারে টিকে থাকতে হলে ক্রেতাসাধারণের রুচি, পছন্দ ও চাওয়া-পাওয়ার প্রতি ব্যবস্থাপনার নজর না দিয়ে উপায় নেই । বাজারে নিজস্ব ইমেজ প্রতিষ্ঠা ও তা ধরে রাখার স্বার্থেও সমাজের বিভিন্ন পক্ষের প্রতি ব্যবস্থাপনাকে দায়িত্ব পালন করতে হয় । 

 

৪. ক্রেতা বা ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি (Increasing buyers or consumers awarness) :

প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সাধারণভাবেই ক্রেতা বা ভোক্তাগণ বাড়তি সুবিধা ভোগ করে । তদুপরি বর্তমানকালে শিক্ষার প্রসার ও সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও বাজারজাতকরণ প্রসার কার্যক্রমের ফলে ক্রেতা বা ভোক্তাসাধারণ অনেক বেশি সচেতন । তাই ব্যবস্থাপনাকে ক্রেতা বা ভোক্তাসাধারণের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজন পড়ে ।

৫. কর্মী সচেতনতা বৃদ্ধি (Increasing employee awarness) :

প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মীরা আজকের দিনে খুবই সচেতন । শ্রমিক সংঘ করার সুযোগ ও বিভিন্ন আইনগত উন্নয়নের কারণে অধিকার আদায়ে তারা অনেক বেশি সোচ্চার। প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কর্মী সহজে যোগাড় করাও ঝামেলাপূর্ণ । ফলে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মীদের প্রতি ব্যবস্থাপনাকে অধিক দায়িত্বশীল ও মনোযোগী হতে হয় ।

৬. পরিবেশবাদীদের উত্থান (Emergence of environmentalist) :

সকল দেশেই পরিবেশবাদীরা বর্তমানকালে অত্যন্ত সক্রিয় । কোন শিল্প বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর তার প্রতি তারা সজাগ দৃষ্টি রাখেন । এ ছাড়াও পরিবেশ রক্ষায় সকল দেশেই রয়েছে আইনের বিধান । তাই যত্রতত্র শিল্প- কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তোলা এখন আর সম্ভব নয় । তাই পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ।

৭. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আবশ্যকতা (Necessity of Govt. sponsorships ) :

দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নয়ন অপরিহার্য। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা ছাড়া ব্যবসায়-বাণিজ্যের এরূপ উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারের শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নীতি এক্ষেত্রে উদার হওয়া প্রয়োজন । এজন্য দরকার সহমর্মী, শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান সরকার। এ লক্ষ্যে সরকারের প্রতি ব্যবস্থাপনাকে দায়িত্বশীল হতে হয় ।

৮. ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রতি গুরুত্বারোপ (Giving importance to united efforts) :

বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে অশুভ প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থেকে নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ব্যবসায়ী মহল যথেষ্ট সচেতন। বাইরের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে মোকাবিলা এবং প্রয়োজনীয় দর কষাকষির ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যকার ঐক্য সবাই প্রত্যাশা করে। এজন্য সমশ্রেণীর ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের প্রয়োজন পড়ে ।

৯. আইনগত কড়াকড়ি আরোপ (Imposing legal bindings) :

আগেকার দিনে সরকার ব্যবসা- বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতো না। শিল্প বিপ্লবের পর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ নীতির অশুভ পরিণামে বিভিন্ন দেশে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয় ও ভোক্তা স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে। সরকারি রাজস্ব ও কর আদায়েও কড়াকড়ি আরোপ করা হয় । ফলে আইনগত কারণেও ব্যবস্থাপনার পক্ষে সমাজ সচেতন না হয়ে উপায় নেই ।

 

ব্যবস্থাপনার সামাজিক দায়িত্ব পালনের পক্ষে যুক্তি | ব্যবস্থাপনার পরিচিতি | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১০. প্রভাব-প্রতিপত্তি সৃষ্টির প্রয়াস (Endeavour of creating influence) :

বর্তমানকালে ব্যবসায়িক সুনাম ও প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনে অধিক কার্যকর বিবেচিত হয়। এ কারণে বিভিন্ন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুনাম ও প্রভাব-প্রতিপত্তি সৃষ্টির প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। এ কারণেই বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকগণ বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করে। এতেও সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটা প্রবণতা তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়।

উপসংহারে বলা যায়, উপরোক্ত বিভিন্ন কারণে বা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আধুনিক ব্যবস্থাপনা সামাজিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষের সন্তুষ্টি অর্জন এবং তার মধ্য দিয়ে নিজস্ব উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা চালায়। আর এভাবেই ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ব্যবসায় পরিচালনায় ব্যবস্থাপনার এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে মার্কিন ব্যবস্থাপনা বিশারদ L. Urwick বলেছেন, “Profit can be no more the objective of a business than eating is the objective of living. “76 অর্থাৎ জীবনের উদ্দেশ্য যেমন শুধুমাত্র খাওয়া নয়। তেমনি মুনাফা অর্জন শুধুমাত্র ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য হতে পারে না ।

Leave a Comment