আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকারভেদ। এই পাঠটি “ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্টে” বিষয়ের “তত্ত্বাবধান” বিভাগের একটি পাঠ।
Table of Contents
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকারভেদ

সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকারভেদ (Types of Decision Making) : প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে ব্যবস্থাপনা বা শীর্ষস্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা সোপানের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত নির্বাহীদের বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। নিম্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকারভেদ সংক্ষেপে সচিত্র আলোচনা করা হল-
(ক) গুরুত্বের ভিত্তিতে (On the basis of importance)
(i) প্রধান বা মুখ্য সিদ্ধান্ত (Major or primary decision) :
যে সমস্ত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যধারায় ব্যাপক পরিবর্তন সূচীত করে বা প্রভাব ফেলে সেগুলোকে প্রধান বা মুখ্য সিদ্ধান্ত বলে। যেমন- নতুন কারখানার গৃহনির্মাণ, জায়গা ক্রয়, যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রভৃতি ।
(ii) অপ্রধান বা গৌণ সিদ্ধান্ত ( Minor or secondary decision) :
অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহকে অপ্রধান বা গৌণ সিদ্ধান্ত বলে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যবস্থাপনার যে কোন স্তরে গ্রহণ করা যায়। যেমন- স্টেশনারি দ্রব্য ক্রয়, অভ্যাগতদের আপ্যায়ন প্রভৃতি ।
(খ) উপলক্ষের ভিত্তিতে (On the basis of purpose) :
(i) নিয়মমাফিক সিদ্ধান্ত (Routine decision) :
প্রতিষ্ঠানের সাধারণ বা প্রাত্যহিক কর্মধারার সাথে সম্পৃক্ত সিদ্ধান্তকে নিয়মমাফিক (রুটিন) সিদ্ধান্ত বলে। পুনরাবৃত্তিকর বা পৌনঃপুনিক ধরনের ঘটনার উপর এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যেমন- দেনাদারকে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই চিঠি দেয়া, কাঁচামাল ক্রয় ইত্যাদি ।
(ii) কৌশলগত সিদ্ধান্ত (Strategic decision) :
প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে অথবা কাঠামো বা উদ্দেশ্য ইত্যাদি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত বলে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত বাহ্যিক পরিবেশ বা অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন— শাখা অফিস খোলার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়িক জোট গঠন ইত্যাদি ।
(গ) প্রকৃতির ভিত্তিতে (On the basis of nature) :
(i) পলিসি (Policy) ঃ
পলিসি বা কার্যনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ব্যবস্থাপনার উচ্চ স্তরে গ্রহণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। যেমন- নির্ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের বোনাস হিসাবে লভ্যাংশ প্রদানের সিদ্ধান্ত ।
(ii) কার্যগত সিদ্ধান্ত (Operative decision) :
প্রতিষ্ঠানের জন্য যে পলিসি নির্ধারণ করা হয় সেগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত করার সিদ্ধান্তকে কার্যগত সিদ্ধান্ত বলে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যাবলি পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন- পণ্যের মান অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে মান বজায় রাখার সিদ্ধান্ত।
(iii) প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত (Administrative decision) :
প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন সংক্রান্ত কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তাকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে । এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে গ্রহণ করা হয়। যেমন- বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম ও বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু নির্ধারণ
(ঘ) কার্যক্রমের ভিত্তিতে (On the basis of programme) :
(i) কার্যসূচিভিত্তিক সিদ্ধান্ত (Programmed decision) ঃ
নির্দিষ্ট কার্যসূচির ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তাকে কার্যসূচিভিত্তিক সিদ্ধান্ত বলে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রকৃতিগত দিক থেকে রুটিন সিদ্ধান্তের মতো। ব্যবস্থাপনার নিম্নস্তরে এ ধরনের সিদ্ধান্ত অধিক কার্যকর হয়। যেমন- কর্মচারীদের ছুটি মঞ্জুর করা, প্রতিষ্ঠানের জন্য দৈনন্দিন কেনাকাটা করা প্রভৃতি ।
(ii) কার্যসূচির বাইরে সিদ্ধান্ত (None programmed decision) :
যে সমস্ত সিদ্ধান্ত পৌনঃপুনিক নয় বা নিয়মিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না, সেগুলোকে কার্যসূচির বাইরে সিদ্ধান্ত বলে। বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব বা প্রয়োজন দেখা দিলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যেমন- বিক্রয় তালিকায় নতুন পণ্য সংযোজন, নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রভৃতি।
(ঙ) উৎসের ভিত্তিতে (On the basis of sources):
(i) একক বা ব্যক্তি সিদ্ধান্ত (Individual decision):
যখন নির্বাহী কর্মকর্তা কোন বিষয়ে বা সমস্যা সমাধানে সম্পূর্ণ এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন সেটিকে একক বা ব্যক্তি সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করা হয়। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কর্তৃত্ব যা ক্ষমতা যাবার প্রতিষ্ঠানের কার্যনির্বাহী কর্মকর্তার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। যেমন- বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানে কোন বিশেষ বিষয়ে কোন ব্যক্তিকে এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া।
(ii) দলগত সিদ্ধান্ত (Group decision) :
কোন বিষয়ে বা সমস্যা সমাধানে নির্বাহী কর্মকর্তা অধস্তনদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও মতামত বিনিময় করে সম্মিলিতভাবে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাকে যৌথ বা দলগত সিদ্ধান্ত বলে এক্ষেত্রে ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব বিকেন্দ্রীভূত থাকে। পরিচালকমণ্ডলীর সিদ্ধান্ত, কমিটির সিদ্ধান্ত প্রভৃতি এরূপ সিদ্ধান্তের অন্তর্গত।
(চ) সিদ্ধান্ত মডেলের ভিত্তিতে (On the basis of decision model):
(i) ক্ষেত্রগত সীমাবদ্ধতায় সিদ্ধান্ত (Close type decision) :
এ ধরনের সিদ্ধান্ত মডেল অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর সম্মুখে অনেকগুলো বিকল্প থাকে এবং সেগুলোর কোনটি গ্রহণ করলে সম্ভাব্য ফলাফল কিরূপ হবে তাও জানা-শোনার মধে থাকে। এক্ষেত্রে যে বিকল্পটি অধিক যৌক্তিক ও ফলপ্রদ মনে হয় সেটি সিদ্ধান্ত আকারে গ্রহণ করা হয়।
(ii) খোলামেলা অবস্থায় সিদ্ধান্ত (Open type decision) :
এরূপ সিদ্ধান্ত মডেল অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কোন বিষয়ে চূড়ান্তভাবে বা অনড় অবস্থানে থাকার মানসিকতা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী যাকে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে সংগতি বিধান করে উত্তম কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে সেজন্য নমনীয়তা গ্রহণ ক পরিবর্তনশীলতার সুযোগ রাখা হয়। এ সিদ্ধান্ত মডেলকে খাপ খাওয়ানো মডেল বা শিক্ষণীয় মডেল নামেও অভিহিত করা হয়।
উপরোক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি ও অবস্থাভেদে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিভিন্ন প্রকার হতে পারে।

